গভীরভাবে প্রেমেও কিছু সীমারেখা থাকা জরুরি
গভীরভাবে প্রেমেও কিছু সীমারেখা থাকা জরুরি

যে ৩ বাউন্ডারি আমার সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে

একাধিকবার মন ভাঙার পর একটি সম্পর্কে কীভাবে থিতু হলেন, তা–ই নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন ‘ভ্যারাইটি’ ম্যাগাজিনের ক্যালিগ্রাফার ও ডিজাইনার এরিকা টি। সেখানে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে তিনটি বিষয়ে সীমারেখা টানার কথা বলেছেন তিনি। তারেক হাসান সরকার–এর সংক্ষিপ্ত অনুবাদে সেগুলো জেনে নিই চলুন।

গভীরভাবে কারও প্রেমে পড়ে গেলে সম্পর্কের মধ্যে সীমারেখা (বাউন্ডারি) টানাটা হয়তো অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। বরং মনে হবে, ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে যত বেশি সময় কাটানো যায়, ততই ভালো। কিন্তু নতুন একটি সম্পর্ককে সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী করতে কখনো কখনো একটু দূরত্ব, ব্যক্তিগত সময় এবং সচেতন কিছু নিয়মই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

এক বন্ধুর নতুন বাড়িতে ওঠার পার্টিতে পলের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। শুরুতেই তার উজ্জ্বল নীল চোখ আমার নজর কাড়ে। পার্টির বেশির ভাগ সময় স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও মনের অজান্তেই তাকে খুঁজছিলাম। পার্টির শেষ দিকে সবাই যখন চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, দেখলাম পল বাইরে একা বসে আছে। বন্ধুদের বললাম, তোরা চলে যা, আমি পরে আসছি। পলের সঙ্গে কথা না বলে সেদিন কেন যেন চলে যেতে পারিনি।

কথা শুরু করার পর কখন যে এক ঘণ্টা কেটে গেল, বুঝতেই পারিনি। তখনই মনে হলো, খুব সহজেই এই মানুষটির প্রেমে পড়ে যেতে পারি। কারণ, প্রেমে পড়ে যাওয়া আমার জন্য নতুন কিছু নয়। সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়—আগের প্রতিটি সম্পর্কের শুরুতে খুব দ্রুত ও তীব্রভাবে জড়িয়ে পড়ি, তারপর ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। পলের সঙ্গে একটা পাকাপোক্ত সম্পর্ক গড়তে চেয়েছি। যে কারণে এবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরতে চাইনি।

সুস্থ সম্পর্কের জন্য সীমারেখা আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ

পলের সঙ্গে প্রথম ডেটেই আমরা নিজেদের পুরোনো সম্পর্কগুলোর ভুলগুলো নিয়ে কথা বললাম। দুজনেই চাইছিলাম, সম্পর্কটা টিকুক। তাই ধীরে–সুস্থে শক্ত ভিত্তির ওপর সম্পর্কটি গড়তে চেয়েছি। সেই আলোচনা থেকেই এল ‘সীমারেখা’ টানার প্রসঙ্গ।

আগে শব্দটি আমার কাছে কিছুটা কঠিন মনে হলেও পরে বুঝলাম, সুস্থ সম্পর্কের জন্য সীমারেখা আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিখ্যাত থেরাপিস্ট জ্যাক ব্রিটলের ভাষায়, সীমারেখা একটি সম্পর্ককে ‘নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা’ দেয়। সেই ধারণা থেকেই আমরা নিজেদের সম্পর্কের জন্য তিনটি সীমারেখা ঠিক করেছিলাম।

১. গভীর রাত পর্যন্ত ফোনে কথা নয়

অনেক রাত জেগে ফোনকল বা ভিডিওতে আড্ডা দিলে তার প্রভাব পড়বে পরের দিনের কাজে

সম্পর্কের শুরুতে আমরা প্রায় প্রতিদিন দিবাগত রাত একটা পর্যন্ত ফোনে কথা বলতাম। একে অপরকে জানার আগ্রহ থেকেই এত দীর্ঘ কথোপকথন। কিন্তু এর প্রভাব আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হতো, ব্যায়াম ও অন্যান্য নিয়মিত কাজ বাদ পড়ে যেত, কর্মক্ষেত্রেও ক্লান্ত লাগত। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, দীর্ঘ সময় ফোনে কথা হবে সপ্তাহে এক দিন এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর ফোন রেখে দিতে হবে। এতে কথা বলা কমেনি; বরং যখন কথা বলি, সময়টুকু আরও উপভোগ করি।

২. সপ্তাহে কতবার দেখা করব, তা–ও সীমিত রাখা

বেশি বেশি দেখা করলেই সম্পর্ক শক্তিশালী হবে ভাবা ঠিক না

আগের সম্পর্কগুলোয় প্রেমিকের সঙ্গে যতটা সম্ভব বেশি সময় কাটাতে চাইতাম। মনে হতো, সম্পর্কটি হয়তো বেশি দিন টিকবে না, তাই সুযোগ থাকতেই সবটুকু সময় একসঙ্গে কাটিয়ে নেওয়া দরকার। কিন্তু অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা শেষ পর্যন্ত সম্পর্ককে পলকা করে তুলত। এবার আমরা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিন দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এতে নিজেদের কাজ, বন্ধুবান্ধব ও ব্যক্তিগত সময়েরও সুযোগ থাকল। ফলে যখন আমরা একসঙ্গে থাকি, তখন সেই সময়টুকু আরও মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করতে পারি।

৩. শুধু দেখা নয়, পরিকল্পনা করে ডেটে যাওয়া

দুজনেই কর্মজীবী হওয়ায় অবসর সময়ে ক্লান্ত থাকতাম। তাই সহজেই বলা হতো, এসো, একসঙ্গে বসে থাকি। কিন্তু এতে কাঙ্ক্ষিত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছিল না।
তাই আমরা দেখা করার সময়টাকে আরও অর্থবহ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আগে থেকেই ডেটের পরিকল্পনা করতাম—নতুন কোথাও যাওয়া, নতুন কিছু করা কিংবা একসঙ্গে ভালো সময় কাটানো। এতে শুধু সময় কাটানো নয়, বরং একে অপরকে জানা এবং নতুন অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।

শেষ পর্যন্ত বুঝেছি, ভালোবাসার সম্পর্কে সীমারেখা মানে দূরত্ব তৈরি করা নয়; বরং এটি ব্যক্তিগত জীবন, সময় ও স্বাধীনতাকে সম্মান করার পাশাপাশি সম্পর্কটিকেও সুস্থ রাখার একটি উপায়।

সম্পর্ক তখনই সুন্দর হয়, যখন সেটি আমাদের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে না নিয়ে বরং নিজেদের সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করে। তাই কখনো কখনো ভালোবাসাকে শক্ত করে ধরে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তাকে একটু জায়গা দেওয়া।

সুত্র: ভ্যারাইটি অনলাইন