
দুজন ব্যক্তির মধ্যে মতবিরোধ হতেই পারে। তবে পরস্পরকে ভালোবাসলেও যদি প্রায়ই ঝগড়া হয়, তাহলে সম্পর্ক হারায় মাধুর্য। কলহের জেরে বিচ্ছেদও হতে পারে। জাপানি দম্পতিরা বিরোধের সময় নিজেদের শান্ত রাখতে একটি বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করেন। জাপানি ভাষায় এই পদ্ধতির নাম ‘মা’। এটি আদতে কী ধরনের জীবনপদ্ধতি? চাইলেই কি আপনি তা নিজের জীবনে কাজে লাগাতে পারবেন? এ প্রসঙ্গে জানালেন শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যার সহকারী অধ্যাপক এবং যুক্তরাজ্যের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল ফেলো ডা. টুম্পা ইন্দ্রানী ঘোষ। তাঁর সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন রাফিয়া আলম।
`মা’ পদ্ধতিতে আপনাকে নির্দিষ্ট সময়ে একটা ছোট বিরতি নিতে হবে। এই বিরতিতে নিজের আবেগকে সুন্দরভাবে প্রকাশ করার জন্য আপনি নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে পারবেন। এই বিরতি হলো কথোপকথনের মধ্যে একটা শান্ত, নীরব সময়।
আরেকটু বিস্তারিত বলা যাক। ধরুন, আপনি এবং আপনার সঙ্গী এমন বিষয়ে কথা বলছেন, যা নিয়ে আপনাদের দুজনের মত আলাদা। আলাপচারিতার সময় আকস্মিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই নিজের যুক্তি দিয়ে তর্ক চালিয়ে না গিয়ে যদি চুপ করে যান, তা হলো ‘মা’ পদ্ধতির প্রয়োগ।
উত্তেজনার মুহূর্তে কিছুটা সময় নীরব থাকার উপকারিতা সম্পর্কে হয়তো অনেকেই জানেন। তবে হুট করে চুপ করে যাওয়া অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও ভারী করে তোলে। এখানেই ‘মা’ পদ্ধতি ‘কেবল চুপ করে থাকা’র চেয়ে আলাদা।
‘মা’ পদ্ধতির বিশেষত্ব এই যে এই নীরবতা দুজনের কারও মানসিক চাপ বাড়ায় না। বরং তা উত্তেজনা প্রশমন করে। দুজনের মনই শান্ত হয়ে আসে। একই সঙ্গে শান্ত হয় শরীরও।
রাগের মাথায় অনেক সময় এমন কথা বলা হয়ে যায়, যা অপর পক্ষকে কষ্ট দেয়। কথাটা বিঁধে যায় তাঁর অন্তরে। যিনি বললেন, তিনিও পরে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে গিয়ে নিজের কথার জন্য আফসোস করেন। তাই উত্তেজনার মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া দেখাতে সময় নেওয়া উচিত দুজনেরই।
এই বিরতিটুকু নিলে তারপর নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রিতভাবে প্রকাশ করা যায়। নীরবতার পর কণ্ঠও থাকে তুলনামূলক শান্ত। নিজের কষ্টের জায়গাটা নির্দিষ্টভাবে বোঝানো যায়।
নিজের অবুঝ অভিমানকেও সামলানো যায়। যে বিষয়টা নিয়ে অভিমান বা রাগ হয়েছে আপনার, সেটার পেছনে যে অপর পক্ষের কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে, তা ভেবে দেখার সুযোগ পান আপনি। আর দুজনই যখন একটা শান্তিপূর্ণ নীরবতার মধ্যে থাকেন, তখন দুজনের কাছেই নীরবে এই বার্তা পৌঁছে যায়—আপনারা দুজনই শান্তি চান। বোঝা যায়, যুক্তিতর্ক করে জিতে যাওয়ার চেয়ে আপনাদের কাছে পারস্পরিক সম্মান এবং ভালোবাসা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।কথার মধ্যে কথা না বলে শান্তভাবে অপরের কথা শুনলেও তিনি এটুকু উপলব্ধি করেন যে আপনি তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। অর্থাৎ বোঝার চেষ্টা করছেন তাঁর অনুভূতিটাকে।
তবে ‘মা’ পদ্ধতি চর্চা করতে গিয়ে আপনি ঝগড়ার সময় চট করে চুপ হয়ে যাওয়ায় অস্বস্তিকর নীরবতা সৃষ্টি হতে পারে। এটিও আপনার সঙ্গীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আপনার চুপ থাকাটাকেই করে তুলতে হবে অর্থবহ। এমনটা যেন মনে না হয় যে আপনি আপনার সঙ্গীকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য চুপ করে থাকছেন।
নীরবতার মুহূর্তে শরীরী ভাষা এবং মুখের ভঙ্গি ইতিবাচক রাখুন। ভ্রু কুঁচকে থাকবেন না। চেহারায় বিরক্তি ফুটিয়ে রাখবেন না। চুপ থেকেও যদি আপনি কোনো কিছু ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতো নেতিবাচক কাজ করেন তাহলেও কিন্তু মুশকিল।
চুপ করে থাকার সময়টায় নিজেদের সুন্দর কোনো মায়াবী মুহূর্তের কথা মনে করতে পারেন। দেহ অনেকটা শিথিল হয়ে আসতে পারে এভাবে। ভেবে দেখুন, আপনি কার সঙ্গে তর্ক করছেন। তিনিই আপনার ভালোবাসার মানুষ।
সুখে-দুঃখে তিনিই আপনার সঙ্গী। যুক্তি দিয়ে জেতার জন্য তর্ক না করে এই মানুষটার কাছে নিজের অনুভূতি কীভাবে প্রকাশ করবেন, সেটা ভেবে নিন ওই অল্প সময়ের বিরতিতে। এরপর কথা শুরু করার সময় স্বর কোমল রাখুন। আর চুপ করে থাকার মুহূর্তে সঙ্গী অসহিষ্ণু হয়ে পড়লে তাঁর কাছে এই সময়টুকু চেয়ে নিন। ধীরে ধীরে এই চর্চায় আপনার সঙ্গীও অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। তাতে সংঘাত এড়ানো অনেক বেশি সহজ হবে। জোরালো হবে বোঝাপড়া।