বাবার হোর্হে মেসির সঙ্গে লিওনেল মেসি
বাবার হোর্হে মেসির সঙ্গে লিওনেল মেসি

মেসির বাবার কাছ থেকে অভিভাবকদের যে বিষয়গুলো শেখার আছে

আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসির বাবা হোর্হে মেসি ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর আজ ৮ আগস্ট আর্জেন্টিনার রোজারিওতে তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন মেসির এজেন্টের দায়িত্বও পালন করেছেন হোর্হে। মেসির ক্যারিয়ারের শুরু থেকে গুরুত্বপূর্ণ নানা সময়ে ছেলের পাশে ছিলেন তিনি।

হোর্হে মেসি শুধু বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের বাবা ছিলেন না। মেসির ক্যারিয়ার গড়ে ওঠার পেছনেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। রোজারিওর একটি ইস্পাত কারখানায় কাজ করতেন হোর্হে। পাশাপাশি শখের ফুটবল কোচও ছিলেন। ছেলের জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে নিজের দেশ, পরিবার ও স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে বিদেশে ছেলের পাশে থেকেছেন। তাঁর জীবন থেকে অভিভাবকদের শেখার মতো অনেক কিছু আছে। রইল এমন কয়েকটি বিষয়।

সন্তানের ওপর বিশ্বাস রাখুন

১১ বছর বয়সে মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। চিকিৎসকেরা তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন, এই সমস্যা মেসির শারীরিক বৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও ছিল বেশ ব্যয়বহুল। পরিবারের পক্ষে সেই খরচ চালানো সহজ ছিল না। ক্লাবগুলোর পক্ষেও দীর্ঘদিনের চিকিৎসার খরচ বহন করা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু এসব বাধার পরও হোর্হে ছেলের ওপর বিশ্বাস হারাননি। মেসির চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি ছেলের ফুটবল প্রতিভাকেও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সন্তানের সামনে কোনো দরজা বন্ধ হয়ে গেলে হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু হোর্হে মেসির গল্প থেকে অভিভাবকদের শিক্ষা হলো—একটি দরজা বন্ধ হয়ে গেলে চেষ্টা থামানো যাবে না। সন্তানের পাশে থাকতে হবে এবং নতুন দরজায় কড়া নাড়তে হবে।

নিজের ত্যাগের কথা সন্তানকে বারবার বলবেন না

১৩ বছর বয়সী মেসিকে সঙ্গে নিয়ে হোর্হে স্পেনে যান। ছেলের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মেসি যাতে বার্সেলোনায় যোগ দিতে পারেন, সেই পথও তৈরি করেন তিনি। মেসির জীবনের সেই কঠিন সময়ে বার্সেলোনায় ছেলের সঙ্গে থেকে যান হোর্হে। পরিবারের অন্য সদস্যরা ফিরে যান রোসারিওতে।

ছেলের জন্য নিজের জীবনেও বড় পরিবর্তন এনেছিলেন হোর্হে। কিন্তু সেই ত্যাগের কথা বলে মেসিকে কখনো চাপে রাখেননি। বছরের পর বছর নীরবে ছেলের পাশে থেকেছেন।

সন্তানের জন্য মা-বাবার ত্যাগ থাকবেই। কিন্তু সেই ত্যাগের কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এতে একসময় সন্তানের কাছে সেই ভালোবাসাও বোঝা মনে হতে পারে।

মেসির জীবনের কঠিন সময়ে বার্সেলোনায় ছেলের সঙ্গে থেকে যান হোর্হে

কখন পথ দেখাবেন, কখন সরে দাঁড়াবেন—তা বুঝুন

ছোটবেলায় স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলিতে মেসিকে প্রশিক্ষণ দিতেন হোর্হে। পরে তিনি ছেলের এজেন্টের দায়িত্ব নেন। মেসির চুক্তি ও ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ নানা সিদ্ধান্তেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

মেসির বয়স ও প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে বাবার ভূমিকাও বদলেছে। ছোটবেলায় তিনি ছিলেন কোচ। পরে হয়েছেন পরামর্শদাতা ও এজেন্ট।
অভিভাবকত্বের একটি কঠিন দিক হলো এই ভারসাম্য বোঝা। কখন সন্তানের হাত ধরে পথ দেখাতে হবে, আর কখন তাকে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিতে দিতে হবে, তা বুঝতে হবে।

সন্তানের পাশে থাকুন, পথ দেখান। তবে তার হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেবেন না।

নিঃশর্ত সমর্থন কী, তা সন্তানকে বুঝতে দিন

হোর্হে মেসি শুধু মেসির বাবা ছিলেন না। ছেলের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষও ছিলেন। মেসির সাফল্যের পেছনে তাঁর দীর্ঘদিনের সমর্থন ছিল।
তিনি নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের জন্য ছেলেকে ব্যবহার করেননি। আবার ছেলের কাছ থেকে ফল পাওয়ার জন্য নিজের ত্যাগের হিসাবও করেননি। বরং মেসি কী করতে পারেন, সেই সম্ভাবনার ওপরই বিশ্বাস রেখেছেন।
মেসি সফল হয়েছেন। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন। সেই পথচলায় হোর্হে ছিলেন একজন নীরব সঙ্গী। সাফল্যের সময়ে যেমন পাশে ছিলেন, কঠিন সময়েও সরে যাননি।
সন্তানকে সফল করার চেয়ে তার সামর্থ্যের ওপর বিশ্বাস রাখা অনেক সময় বেশি জরুরি।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া