‘অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি’—ছোটবেলা থেকেই আমরা এই প্রবাদবাক্য শুনে আসছি। কিন্তু সব সততা কি সম্পর্কে ভালো পরিণতি ডেকে আনে? সম্প্রতি ‘টাইম ম্যাগাজিন’-এর অনলাইন সংস্করণের এক প্রতিবেদনে তোলা হয়েছে প্রশ্নটি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ‘সাইকোলজি টুডে’, ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস’, ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’, ‘মিডিয়াম’সহ বিশ্বের প্রথম সারির নানা গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে।
সম্পর্কে অপ্রস্তুত বা নির্মম সততা অনেক সময় উপকারের চেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে সেই সততায় যখন সহানুভূতি, প্রেক্ষাপট বা অপর পক্ষের অনুভূতির প্রতি যত্নের অভাব থাকে।
এমন ধারণার পেছনে আছে বেশ কিছু গবেষণা ও কেস স্টাডি। বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি সততা, এ কথা অস্বীকারের কোনো উপায় নেই।
কিন্তু সততা যখন সমালোচনা, নিয়ন্ত্রণ বা আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা সম্পর্কের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।
১. আঘাত করার জন্য ‘সত্য’ ব্যবহার
তর্কের সময় একটা কঠিন বা নেতিবাচক উদাহরণ টেনে ‘আমি তো শুধু সত্যটাই বলেছি’ ধরনের কথা বলা আদতে আবেগে আঘাত করা বা তর্কে জেতার একটি কৌশল। সহজভাবে বুঝতে গেলে, সম্পর্কে তর্ক বা ঝগড়ার সময় আপনি যে সময় সত্য উদাহরণ বা সমীক্ষা টেনে অপর পক্ষকে ধরাশায়ী করতে চান, সেসব আদতে সম্পর্কের জন্য ধ্বংসাত্মক।
২. অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা
সেটা হতে পারে সঙ্গীর চেহারা, বুদ্ধিমত্তা বা রান্না নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য। অনেক সময় সমালোচনা গঠনমূলক না হয়ে অপর পক্ষকে হীন করা বা ছোট করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে। আদতে মূল বিষয়টা হলো, সততাকে আপনি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন। আরেকজনকে ছোট করার জন্য হলে তা মোটেও কাম্য নয়।
৩. অসময়ে বা ভুল সময়ে সততা
সম্পর্কে এমন অনেক মোড় আসে, যখন একজন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, শোকাহত বা ক্লান্ত থাকেন। এককথায় সঙ্গী সে সময় নতুন করে কিছু নেওয়ার মতো অবস্থায় থাকেন না। সে সময় কঠিন সত্য বলে কষ্ট বা মনের বোঝা বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন আছে কি? যে সততা সঙ্গীর মানসিক চাপ ও মন্দ লাগা কমাচ্ছে না বরং বাড়াচ্ছে, সেটি নাহয় এড়িয়ে চলুন।
৪. অতীতের অতিরিক্ত তথ্য
আগের সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিত বললে সম্পর্কে নিরাপত্তাহীনতা, হিংসা বা তুলনার অনুভূতি তৈরি হতে পারে। কী দরকার নতুন সম্পর্কে ঢুকে সেখানে প্রতিনিয়ত পুরোনো সম্পর্কের চর্চা করার? বরং নিজেদের সম্পর্ককে কীভাবে আরও স্বাস্থ্যকর ও মজবুতভাবে গড়া যায়, সেদিকে মনোযোগ রাখুন।
৫. সহানুভূতির অভাব
যখন লক্ষ্য থাকে শুধু সত্য বলা, তখন সে সত্য মাঝেমধ্যেই সঙ্গীর কষ্টের কারণ হতে পারে। সত্যটি বলার আগে ভাবুন, এটার মাধ্যমে আপনার সঙ্গী কীভাবে উপকৃত হচ্ছেন। যদি সেটা কোনো কাজের না হয়, নিছকই একটা সত্য, তা বলে কার কী লাভ? সহানুভূতিহীন সত্য একপাশে সরিয়ে রাখুন।
৬. ‘ব্রুটাল অনেস্টি’ বা নির্মম সততার ফাঁদ
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেক সময় এ ধরনের ‘নির্মম সততা’ আদতে বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। এটি একটি রেড ফ্ল্যাগ। সততা বা সত্য তথ্য অনেক সময় সম্পর্কে অবমূল্যায়ন, তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা মানসিকভাবে আঘাত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এর পেছনে থাকে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বা নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ। তখন সঙ্গীকে সম্মান করা, সম্পর্ক উন্নত করার ইচ্ছাগুলো সেই ‘বিষাক্ত সততা’র আড়ালে চাপা পড়ে যায়।
যখন বিষয়টি শুধুই ব্যক্তিগত মতামত: যেমন ‘তোমার নতুন হেয়ার কাটটা বিশ্রী হয়েছে’, ‘এই ড্রেসে তোমাকে ফালতু লাগছে’ না বলাই ভালো।
যখন উদ্দেশ্য আঘাত করা, ছোট করা: যদি রাগ বা কষ্ট থেকে সত্য শেয়ার করে হালকা হতে ইচ্ছা করে, তাহলে আগে নিজেকে শান্ত হওয়ায় সময় দিন। সঙ্গীর কাছ থেকে যে বিষয়ে কথা বলতে চান, সেটি জানিয়ে অনুমতি নিন।
যখন সত্য কেবল নিজের অপরাধবোধ কমানোর জন্য বলা হয়: যদি সত্য বলা আপনাকে স্বস্তি দেয় কিন্তু সঙ্গীর শান্তি নষ্ট করে, তাহলে সেই সত্য বলার আগে একবার ভাবুন। আবার ভাবুন।
মনের প্রতিটি সত্য কথা বলতেই হবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং প্রয়োজন বুঝে সচেতন সততার আশ্রয় নিন। পরিণত আচরণ করুন। মিথ্যা যেমন সম্পর্কে বিশ্বাস নষ্ট করে, তেমনি নির্মম সততা সম্পর্কের নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি ও প্রাণশক্তি নষ্ট করতে পারে। তাই সত্য বলার ক্ষেত্রেও সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতার ভারসাম্য রাখাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইম