বাবা দিবসে লিখেছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দীকা

জন্মের সময় বাবা ছিলেন মিশনে। তাই ছোট কাকুর কোলে, তাঁর আদরে বড় হতে হতে শিশুমনে বাবার যে ছবি তৈরি হয়েছিল, বাস্তবের বাবার সঙ্গে তার কোনো মিল ছিল না।
মিশন শেষে উমরাহ করে বাড়ি ফিরলেন বাবা। গায়ে ইয়া লম্বা সাদা আলখাল্লা-জোব্বা। ছোট্ট আমি তাঁকে প্রথম দেখেই ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিলাম। এমনকি সেই ভয় এতটাই প্রবল ছিল যে জ্বর চলে এসেছিল।
তারপর থেকে বাবা ছুটিতে বাড়ি এলেই তাঁকে এড়িয়ে চলতাম। দূর থেকে দেখতাম, কাছে যেতাম না। ঘরের এক প্রান্তে বাবা থাকলে আমি থাকতাম অন্য প্রান্তে। সবাই বলত, আমি নাকি বাবাকে খুব ভয় পাই। কিন্তু বড় হতে হতে বুঝেছি, ওটা আসলে ভয় না; এক অদ্ভুত দ্বিধা, অচেনা একজন মানুষকে আপন করে নিতে না পারার সংকোচ।
তখন আমার বয়স ৪ কি ৫। আবার ছুটিতে বাড়ি এলেন বাবা। সারাক্ষণ তাঁর আশপাশে ঘুরঘুর করতাম, কিন্তু কাছে যেতাম না। দূরত্ব বজায় রেখেই তাঁকে দেখতাম। তবে প্রতিদিন একটা ব্যাপারে অধীর অপেক্ষা থাকত। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই বসে থাকতাম, কখন সেই ‘জুজু’ বাইরে থেকে ফিরবে আর পকেট থেকে বের করবে মিল্ক ক্যান্ডি। ক্যান্ডির প্রতি ভালোবাসা আর বাবার প্রতি কৌতূহল—দুটোই তখন সমানতালে বাড়ছিল।
এরপর এল বাবার ছুটি শেষ হওয়ার দিন। সেদিন দুপুর থেকে বাবাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছিলাম না। ঘরের এদিক-ওদিক খুঁজে না পেয়ে দাদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জুজু লোকটা কোথায়?’ আমার কথা শুনে বাড়িসুদ্ধ মানুষ হেসে উঠল। দাদি হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাবার কোলে তো যাস না, এত খোঁজ করছিস কেন?’ শুনেছি, তখন খুব গম্ভীর মুখে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘কোলে যাব না। কিন্তু সামনে থাকবে, আমি দেখব।’
আজ এত বছর পর মনে হয়, বাবা মানে আমার কাছে প্রথম যে অনুভূতিটা জন্মেছিল, তার নাম ভালোবাসা নয়, ভয়ও নয়; অভ্যাস। যে মানুষটাকে আমি একদিন ‘জুজু’ ভেবে ভয় পেয়েছিলাম, অজান্তেই তাঁর উপস্থিতি আমার কাছে নিরাপত্তা হয়ে উঠেছে।
সেই ছেলেবেলার মতো বাবার প্রতি ভালোবাসাটা আজও অনেকটা অন্তরালেই রয়ে গেছে। মুখ ফুটে ভালোবাসি বলা হয় না।
বাবা নামক অনুভব যাঁর কাছে প্রথম পেয়েছি, সেই ছোট কাকুও আজ আর নেই। তাঁর চলে যাওয়ার পর ‘আম্মাজি’ ডাকটা আর শোনা হয় না। ঈদের আগে চকচকে নতুন নোট জমিয়ে রেখে আমাকে চমকে দেওয়ার মানুষটাও নেই। কাকুর শেষ সময়ে আমি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের মিম ডাক্তার হবে, তখন আমার ট্রিটমেন্ট করবে।’ ডাক্তার হওয়া হয়নি, কিংবা সেই সুযোগ আসার আগেই তিনি চলে গিয়েছিলেন—কোনটা বেশি কষ্টের, আজও বুঝে উঠতে পারিনি।
জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসাগুলো বোধ হয় আমরা অনেক সময় বলেই উঠতে পারি না। তবু প্রতি মোনাজাতে যখন পড়ি—‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা’—তখন আমার দুই বাবার মুখই ভেসে ওঠে। একজন পৃথিবীতে আছেন, আরেকজন চলে গেছেন। আল্লাহ আমার দুই বাবাকেই তাঁর অশেষ রহমত ও মাগফিরাতের ছায়ায় রাখুন।