আজকাল অনেকে প্রেমের ঝামেলা, তর্ক, এমনকি ব্রেকআপ মেসেজ লেখার জন্যও এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছেন। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এতে কঠিন সামাজিক পরিস্থিতি সামলানোর যে ক্ষমতা মানুষের আছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেননা এআইয়ের অ্যাপলিকেশন এমনভাবে তৈরি, যেন তা সহজেই ব্যবহারকারীর কথাকেই সমর্থন করে।
এখানে সিকোফ্যান্টিক বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন এআই, যা—
ব্যবহারকারীর সঙ্গে অতিরিক্ত একমত হয়।
ভুল হলেও সরাসরি বলে না।
ব্যবহারকারীর দৃষ্টিভঙ্গিকেই ‘ঠিক’ মনে করায়, ব্যবহারকারীর দৃষ্টিভঙ্গি বা মতামতের পক্ষে যুক্তি দেয়।
অস্বস্তিকর সত্য এড়িয়ে যায়।
এক কথায় এআই এমন এক ডিজিটাল সঙ্গী, যে সব সময় বলে, ‘তুমিই সঠিক।’
গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী সম্পর্কের সমস্যা মেটাতে; তর্কে কী উত্তর দেবে, তা জানতে; ক্ষমা চাওয়ার বার্তা লিখতে; এমনকি ব্রেকআপ টেক্সট লিখতেও এআই ব্যবহার করছে।
এতে এআই শুধু টুল নয়, বরং তৃতীয় একজনের মতোই সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠছে। অনেকে আবার একপাক্ষিক তথ্য দিয়ে এআইয়ের কাছে জানতে চাইছে, সম্পর্ক রাখা উচিত কি না; যা আদতে মানব সম্পর্কের জন্য হুমকি।
১১টি সবচেয়ে জনপ্রিয়, বড় এআই মডেল পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেছেন—
মানব পরামর্শদাতাদের তুলনায় এআই প্রায় ৪৯ শতাংশ বেশি ব্যবহারকারীকে সমর্থন করেছে, যা অনেক সময় ব্যক্তির ভুল আচরণকেই পরোক্ষ সমর্থন জুগিয়েছে।
প্রতারণা, মিথ্যা বলা বা ক্ষতিকর আচরণ–সম্পর্কিত প্রশ্নেও প্রায় ৪৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সমর্থনমূলক উত্তর দিয়েছে। এককথায়, ‘ভুলভাবে’ বিচার করেছে।
অর্থাৎ অনেক সম্পর্ক ভাঙার ক্ষেত্রে এআইয়ের পরোক্ষ ভূমিকা আছে। এআই অনেক সময় মানুষকে সংশোধন না করে উল্টো যুক্তি দিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
১. আত্মসমালোচনা কমে যায়
এআই আপনার ভুল ধরিয়ে দেয় না। আবার সব ভুল ধরিয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এআই আপনার কাছ থেকে পায় না। কেননা মানুষ খুব কমই নিজের ভুল দেখতে পায়। ফলে এআই সব সময় ব্যবহারকারীর পক্ষ নেয়। এতে নিজের ভুল দেখা, অনুধাবন করা বা সংশোধন করা কঠিন হয়ে যায়।
২. সম্পর্ক মেরামতের ইচ্ছা কম
গবেষণায় দেখা গেছে, সিকোফ্যান্টিক এআই ব্যবহারকারীদের বিরোধ মেটাতে কম আগ্রহী। বরং বিচ্ছেদই ছিল এআইয়ের ‘সহজ ও সঠিক সমাধান’।
৩. বাস্তব সামাজিক দক্ষতা দুর্বল হতে পারে
বাস্তবের মানবসঙ্গী সবসময় একমত হয় না। মতভেদ, সমালোচনা, সুন্দর করে নিজের যুক্তি উপস্থাপন, ক্ষমা চাওয়া—এসব থেকেই সামাজিক পরিপক্বতা তৈরি হয়।
কারণ, মানুষ নিজের পক্ষে সমর্থন চায়। এটাই পছন্দের অন্যতম কারণ। এ ছাড়া এআই ব্যবহারকারীকে ‘জাজ’ করে না। দ্রুত উত্তর দেয়। ব্যবহারকারীকে ‘বোঝে’, এমন ধারণা দেয়। সবসময় পাশে আছে বলে মনে হয়।
মানুষ সহজেই এআইকে বিশ্বাস করে। তাই অনেকেই সঙ্গীর সঙ্গে কঠিন কথোপকথন এড়িয়ে নিরাপদ শর্টকাট হিসেবে এআইয়ের কাছে সাহায্য চায়।
এআই অবশ্যই ব্যবহার করা যাবে। তবে সহকারী হিসেবে, বিচারক হিসেবে নয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এআই কাজে লাগতে পারে—
কথার ভাষা নরম করতে
বার্তা গুছিয়ে লিখতে
ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি চাইতে
আবেগ সামলে ভাবতে
কিন্তু সম্পর্কের সিদ্ধান্ত, ক্ষমা, ব্রেকআপ বা পুনর্মিলন—এসব বিচারবোধে মানুষই ভালো। কেননা একজন ব্যক্তি যেভাবে হৃদয় দিয়ে সম্পর্কের জটিল দিকগুলো নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করতে পারে, এআই তা পারে না। এআই কখনোই আপনাকে নৈতিকভাবে ভালো বা আদর্শ মানুষ বানাতে পারে না।
এআই আপনাকে মেসেজ লিখে দিতে পারে, কিন্তু মানুষ হওয়া শেখাতে পারে না। কঠিন কথোপকথন, মতভেদ, ক্ষমা চাওয়া, সত্য বলা—এসবই সম্পর্ককে গভীর করে। সব সময় ‘তুমি ঠিক’ শুনতে ভালো লাগলেও, তা আমাদের ভালো মানুষ বা ভালো পেশাদার বানায় না।
বরং সেসবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় আমাদের দরকার হয় এমন কাউকে, যে সত্যটা বলে। ব্যবহারকারী নয়, বরং উদারতার সঙ্গে সত্যের পক্ষে যুক্তি দেয়।
সূত্র: সায়েন্স ফোকাস