সবাই যাকে পছন্দ করে, দিন শেষে সে-ই কেন সবচেয়ে বেশি একা

বাইরে সবাই আপনাকে ভালোবাসে। আপনাকে ছাড়া বন্ধুদের আড্ডা জমেই না। কিন্তু দিন শেষে বাড়ি ফেরার পর আপনি কি খেয়াল করেছেন, ফোনটা চুপচাপ। কেউ সত্যি করে জিজ্ঞেস করে না, ‘কেমন আছ?’ আপনার কি তখন নিঃসঙ্গ লাগে? এই বৈপরীত্যটাই আজকের বিষয়।

মনোবিজ্ঞান বলে, অনেক ব্যক্তি এমন এক দক্ষতা রপ্ত করে ফেলে, যাতে সবাই তাদের পছন্দ করে
ছবি: প্রথম আলো

‘লাইকেবল’ হওয়া একটা পারফরম্যান্স

মনোবিজ্ঞান বলে, অনেক ব্যক্তি এমন এক দক্ষতা রপ্ত করে ফেলে, যাতে সবাই তাদের পছন্দ করে। কিন্তু এই ব্যক্তিরা কাউকে সত্যিকারভাবে নিজের ভেতরটা দেখায় না। তারা জানে কীভাবে কথা বলতে হয়, কোথায় কী বলা নিরাপদ আর কোন অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখতে হয়। ফলে তারা সবার প্রিয় ব্যক্তি হয়। কিন্তু কারও ‘নিজের মানুষ’ হয় না। এই অবস্থাকে বলে ‘লাইকড বাট নট নোন’।

কেন এই ব্যক্তিরা একা হয়ে যায়

১. তারা নিজেদের ‘এডিট’ করে

সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে এই ব্যক্তিরা নিজের মতামত প্রকাশ কমিয়ে দেয়। নিজের কষ্ট ও অন্যান্য অনুভূতি লুকিয়ে রাখে। কেবল বাহ্যিকভাবে ‘আমি ভালো আছি’ মোডে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে তারা নিজের আসল সত্তাটাকেই আড়াল করে ফেলে।

২. তারা দেয়, কিন্তু নেয় না

এই ব্যক্তিরা সাধারণত অন্যদের কথা শোনে, সাহায্য করে, অন্যের পাশে থাকে। কিন্তু তারা কখনো বলে না ‘আমারও সাহায্য দরকার।’ ফলে অন্যরা ধরে নেয় ‘ও তো সব সময় ঠিক আছে।’

৩. ভেতরের মানুষটা হারিয়ে যায়

বাইরের মানুষটা মজার, স্মার্ট, সাহায্যকারী। কিন্তু ভেতরের মানুষটা ক্লান্ত, চিন্তিত আর একা। এই দুই সত্তার মাঝখানের দূরত্বটাই আসল নিঃসঙ্গতা।

৪. জনপ্রিয়তা মানে ভালো সম্পর্ক নয়

অনেক মানুষ আপনাকে পছন্দ করতে পারে। কিন্তু খুব কম মানুষই আপনাকে জানে। কারণ, পরিচিতি (রিকগনিশন) আর গভীর সম্পর্ক (কানেকশন) এক জিনিস নয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অনেকের কাছে জনপ্রিয় কিন্তু ঘনিষ্ঠ বন্ধু কম, তারা একাকিত্বে বেশি ভোগে।

অনেক মানুষ আপনাকে পছন্দ করতে পারে। কিন্তু খুব কম মানুষই আপনাকে জানে

কেন নিজেকে প্রকাশ করা এত কঠিন

এই ব্যক্তিরা নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী নয়। তাদের ভেতর একটা দ্বিধা কাজ করে, ‘আমি যদি আসলটা দেখাই, মানুষ কি দূরে চলে যাবে?’ ‘আমি যদি দুর্বল হই, তারা কি আমাকে কম পছন্দ করবে?’ এই ভয় থেকেই তারা নিজেদের একটা ‘সেফ ভার্সন’ তৈরি করে ফেলে। যেটা সবাই পছন্দ করে। কিন্তু সেটা তার আসল ব্যক্তিত্ব নয়।

ক্লান্তিকর এই অভিনয়

সবাইকে খুশি রাখা মানে সব সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। প্রতিটা কথায় হিসাব রাখা। কার সামনে কী বলা যাবে, সেটা ভাবা। এটা একটা চলমান মানসিক পরিশ্রম, যা ধীরে ধীরে মানুষকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়।

সমাধান কোথায়

এই একাকিত্ব থেকে বের হতে যা মনে রাখা দরকার—

১. একটু ‘অস্বস্তিকর’ হওয়া মন্দ নয়

সব সময় অন্যের কাছে ভালো লাগার ব্যক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা না করে নিজের সত্যটা সামনে রাখাই ভালো। নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব গড়ুন, যাতে সেটা অন্যের সামনে রাখতে আপনার ভেতরে কোনো দ্বিধা কাজ না করে। কেননা সত্যিকারের মুক্তি হলো নিজেকে নিজের মতো করে মেনে নেওয়া।

২. ছোট করে সত্যিটা বলুন

সব সময় ‘ভালো আছি’ বা মানুষকে খুশি করা কথাবার্তা না বলে বরং সুন্দর করে, নরমভাবে, উদারতার সঙ্গে সত্যিটা বলুন।

সব সময় অন্যের কাছে ভালো লাগার ব্যক্তি হয়ে ওঠার চেষ্টা না করে নিজের সত্যটা সামনে রাখাই ভালো

৩. সাহায্য চান

সম্পর্ক একতরফা হলে সেটা আদতে কোনো সম্পর্কই না। সেটা লেনদেন।

৪. যারা আপনার, তাদের চিনে নিন

যারা আপনার সত্যিকারের ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করে, আপনার ভালো চায়, তাদেরকেই জীবনপথের সঙ্গী করে নিন। সেই ব্যক্তিদের সংখ্যা হতে পারে দুজন বা তিনজন, মন্দ কী? সবাইকে খুশি করে বাঁচতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মান হয় না।

সূত্র: স্পেস ডেইলি