আজ কাতার বিশ্বকাপ ২০২২-এর শেষ রাত। আর কয়েক ঘণ্টার ভেতরেই জানা যাবে ম্যারাডোনার উত্তরসূরি মেসির হাতেও কি বিশ্ব দেখবে বিশ্বকাপ? সে অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ম্যারাডোনার জীবনের শেষ পর্বে, যেখানে আছে সব পাওয়ার পূর্ণতা, আছে সব হারানোর হাহাকার। আবার ফুটবলের রাজ্য ছেড়ে সাময়িকভাবে পালিয়ে যাওয়া এক রাজপুত্রের মুকুট মাথায় প্রত্যাবর্তন।
না, বোকার কোচ মাঠের প্রতিশোধ মাঠের বাইরে নিলেন না। কার্নেখোর মলিন মুখ দেখে বরং হেসে উঠলেন জোরে। বললেন, ‘তুমি যা করেছ, সে জন্য তোমার অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্য। কিন্তু আমি তোমার নামে কোনো অভিযোগ করব না। কারণ, আমি চাই না তোমার জন্য ডিয়েগো শাস্তি পাক। তবে এমন কাজ আর কখনো কোরো না।’
কার্নেখো হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। আর ম্যারাডোনা পেলেন প্রশ্রয়। শান্ত বা গুডবয় ম্যারাডোনা কখনোই ছিলেন না; বরং ম্যারাডোনা বরাবরই ছিলেন ক্লাসের দুষ্টু, দুরন্ত সেই ছেলে, যাঁর দুষ্টুমির যন্ত্রণা সীমা ছাড়িয়ে যেত ঠিকই, কিন্তু পরীক্ষা শেষে ফলাফলের দিন দেখা যেত, সেই দুষ্টু ছেলেই হয়ে গেছে ফার্স্ট। কাজেই, এই ভালো ছাত্র হওয়ার সুবিধা ম্যারাডোনা সব সময়ই নিয়েছেন। তাঁর একের পর এক দুষ্টুমিকেও কোচরা দেখেছেন প্রশ্রয়ের চোখে।

মিছরির ছুরি কথাটার সঙ্গে কার্নেখো পরিচিত ছিলেন কি না, জানি না। সুদূর আর্জেন্টিনার মানুষ তিনি, বাংলা মুলুকের এই প্রবাদের কথা তাঁর জানার কথা নয়। অথচ সেই মিছরির ছুরিতেই কার্নেখো কেটে গেলেন। টুর্নামেন্টের নাম আর্জেন্টাইন ইউথ কাপ। পুরো আর্জেন্টিনার জুনিয়র লেভেলের টিম লড়াই করে এ টুর্নামেন্টে। বছর ঘুরে আসা এ টুর্নামেন্ট কার্নেখো জিতে গেলেন। দলে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে নিয়ে পুরো আর্জেন্টিনার ভেতর ক্লাবকে করলেন চ্যাম্পিয়ন। এ ম্যাচই ছিল কার্নেখোর অধীন ম্যারাডোনার শেষ ম্যাচ।
ফাইনাল দেখতে অনেক রথী-মহারথীর সঙ্গে সঙ্গে ক্লাব প্রেসিডেন্টও ছিলেন গ্যালারিতে। ম্যারাডোনার খেলা দেখে ক্লাব প্রেসিডেন্ট বুঝলেন, এই ছেলেকে কার্নেখোর হাতে ফেলে রাখার কোনো মানে হয় না; বরং একে যত দ্রুত সম্ভব মূল দলে অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া যায়, ততই ভালো। কার্নেখো অনেক চেষ্টা করলেন বোঝাতে। পারলেন না। উল্টো ক্লাব প্রেসিডেন্টের ধমক খেয়ে একা একাই ফিরে এলেন সেবোলিতা ক্লাবে। এত দিন ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা হিরের টুকরাকে রেখে আসতে হলো। সঙ্গে করে আর আনতে পারলেন না। সাত বছরের পরিশ্রম করে সেই ফসল তুলে দিয়ে দিলেন অন্য কারও হাতে। এই আফসোস কি কার্নেখো কোনো দিন ভুলতে পেরেছিলেন? জানি না।
ভিসা দেল পার্কের ফ্ল্যাটে (ম্যারাডোনার বাড়িতে) সেদিন আনন্দের বন্যা। অবশেষে শেষ হলো ভিসা ফিওরিতোর সেই দুঃস্বপ্নের দিনরাত্রিগুলো। অবশেষে শেষ হলো দিনবদলের অপেক্ষা। ঘিঞ্জি একটা পরিবেশ থেকে ম্যারাডোনা পরিবার উঠে এল বিশাল একটা ফ্ল্যাটে। শুধু নতুন চুক্তি করেই ক্লাব প্রেসিডেন্ট ক্ষান্ত হলেন না; বরং তিনি ম্যারাডোনার জন্য একটা ফ্ল্যাটেরও ব্যবস্থা করে দিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই ম্যারাডোনা কাঁধে তুলে নিলেন পরিবারের দায়িত্ব, যে দায়িত্ব তিনি সারাটা জীবন পালন করেছেন হাসিমুখে। মা আর মাতৃভূমিকে আর্জেন্টাইনরা পাগলের মতোই ভালোবাসে, এর বড় প্রমাণ ম্যারাডোনা ছাড়া আর কে ছিলেন?
ক্লাব থেকে নতুন ফ্ল্যাট এল। আসতে শুরু করল টাকাও। এ কারণে চিতোরে কারখানার কাজ ছেড়ে দিলেন ম্যারাডোনা। মা তোতার খুশিও আর ধরে না। ছেলের এমন অর্জনে পৃথিবীর কোন মা খুশি হবে না? নতুন এলাকা। নতুন পরিবেশ। তোতা এদিকে-ওদিকে যান। ঘোরাঘুরি করেন। পাশেই একটা সুপারমার্কেট। কী মনে করে তোতা ঢুকে গেলেন সুপারমার্কেটে। ইচ্ছেমতো কেনাকাটা করলেন। কিন্তু ঝামেলা বাধল টাকা দেওয়ার সময়। বিল যা হয়েছে, তোতার কাছে এত টাকা নেই। আবার এত সাধের জিনিস, এগুলো ফেলে রেখে যেতেও তো ইচ্ছা করে না। এখন উপায়? তোতার এই বিব্রতকর অবস্থা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন মিষ্টি একটা মেয়ে। ক্লাউদিয়া। এগিয়ে এসে মিষ্টি হেসে বলল, ‘আমার কাছে টাকা আছে। আপনি আমার থেকে নিন। আমি আপনার পাশের বাসাতেই থাকি। একসময় আমাকে ফেরত দিলেই হবে।’
ম্যারাডোনার মা তোতা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। ক্লডিয়ার থেকে নিয়ে টাকা শোধ করলেন। বারবার ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় নিলেন। কিন্তু শুধু ধন্যবাদ দিলে তো আর হবে না। টাকাগুলো ফেরত দিতে হবে। এবার ডাক পড়ল ম্যারাডোনার। টাকা ফেরত দিয়ে আসতে হবে পাশের বাড়িতে। ছেলে যত বড় ফুটবলারই হোক, মায়ের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তো ছেলেই, নাকি? তাই মায়ের টুকটাক কাজ করে দিতে হতো ম্যারাডোনাকেও। মায়ের এই টাকা ফেরতের কাজটা করে দিতে গেয়েই ম্যারাডোনা নিজের সর্বনাশ দেখে ফেলবেন, তাই-বা কে জানত? টাকা ফেরত দিতে গিয়ে ম্যারাডোনা ক্লডিয়ার হাতে শুধু টাকাই নয়, দিয়ে এলেন নিজের হৃদয়টাকেও! হ্যাঁ, কিশোর ম্যারাডোনা এবার প্রেমে পড়ে গেলেন।
যদিও কিশোর বয়সের প্রেমকে কেউ ভুল বলেন, কেউবা আবার বলেন পাগলামি। তবে ম্যারাডোনার এই প্রেম শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। সুপারশপে তোতাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করা সেই ক্লডিয়া ভিলাফানেই হয়েছিলেন ম্যারাডোনার প্রথম, শেষ এবং সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের জীবনসঙ্গী।
কিশোরবেলার এই প্রেম পরিণতি পায় ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে। বিয়েটা টিকে ছিল ২০০৪ সাল পর্যন্ত। দীর্ঘ ২০ বছর। এরপর তারা আলাদা হলেও ম্যারাডোনা পরবর্তী সময়ে আর কাউকেই বিয়ে করেননি। ম্যারাডোনার জীবনে প্রেম বা নারী কম আসেনি। বরং ফুটবলের মতোই নারী ছিল তাঁর জীবনের আরও একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এত এত নারীর মধ্যে থেকেও ক্লডিয়া ভিলাফানের নাম আমাদের আলাদা করে মনে রাখতেই হবে।
এর পরের গল্পটা রূপকথার মতোই সুন্দর। একের পর এক ক্লাব সাইনিং, আর্জেন্টিনার দুই বিখ্যাত ক্লাব বোকা জুনিয়র্স আর রিভারপ্লেটের টানাটানিতে ম্যারাডোনা টাকার জোয়ারে ভাসতে শুরু করলেন। বুয়েনস এইরেসে কিনে ফেললেন প্রাসাদসম বাড়ি। সেবেলিতা দলের হয়ে করলেন টানা ১৪০ ম্যাচ জেতার রেকর্ড। আর্জেন্টিনা যুব দলের হয়ে জিতলেন বিশ্বকাপ।
১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ সামনে রেখে আর্জেন্টিনা তখন ফুটবল-জ্বরে কাঁপছে থরথর করে। ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ জেতা দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ম্যারাডোনা নামের এক ফুটবল-জাদুকর। এবার আর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জেতা ঠেকায় কে? বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচ। প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি। ম্যারাডোনার পায়ের জাদু দেখতে উদ্গ্রীব সবাই। কিন্তু ম্যারাডোনা পারলেন না। লোথার ম্যাথাউসের কাছে বারবার হারাতে লাগলেন বল। সব সময় ম্যারাডোনার জাদু দেখে অভ্যস্ত লোকজন এবার দুয়ো দিতে শুরু করল। হতবাক ম্যারাডোনা অবাক চোখে দেখলেন, এত দিনের ভালো খেলা, এত দিনের আনন্দ, এত দিনের সাফল্য মানুষ ভুলে গেল এক ম্যাচে। ক্রমাগত দুয়োর ঠেলায় ম্যারাডোনাকে তুলে নেওয়া হলো মাঠ থেকেই!
সারা জীবন মানুষের ভালোবাসা পেয়ে আসা ম্যারাডোনা এবার দেখলেন মুদ্রার উল্টো পিঠটাও। বুঝলেন, মানুষের ভালোবাসা জিনিসটাও আসলে ওই পদ্মপাতার জলের মতোই একটা ব্যাপার। তীব্রতা যতটা বেশি, স্থায়িত্ব ততটাই কম। পরের ম্যাচে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করল। ম্যাচটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে। এ ম্যাচেও ঠিক আগেরটার মতোই ব্যর্থ হলেন ম্যারাডোনা। তবে এবারের গ্যালারি আরও বেশি কুৎসিত, আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে ম্যারাডোনার সামনে হাজির হলো। ভেসে এল কুৎসিত সব কথা। কেউ বলল, ম্যারাডোনা মুটিয়ে গেছেন, কেউ বলল আরও প্র্যাকটিস দরকার, কেউ আবার ব্যঙ্গ করতে শুরু করল বুয়েনস এইরেসে বানানো ম্যারাডোনার সেই প্রাসাদসম বাড়ি নিয়েও। এরপর গালিগালাজ করা শুরু হলো ম্যারাডোনার মা–বাবাকে নিয়ে। বাদ গেলেন না বান্ধবীও। এবার আর ম্যারাডোনা সহ্য করতে পারলেন না। মারামারিতে জড়িয়ে পড়লেন দর্শকদের সঙ্গে। এত দিনের নায়ক এবার হয়ে গেলেন খলনায়ক। আর্জেন্টিনাজুড়ে তখন একটাই দাবি, ডিয়েগো ম্যারাডোনার শাস্তি চাই।
চলে গেলেন এসকিনোতে। এসকিনো পাহাড়ি এলাকা এবং এটা ছিল ম্যারাডোনার পৈতৃক ভিটা। এত দিন সবার চোখের মণি হয়ে থাকা ম্যারাডোনা এবার বাজে সময়ে বেছে নিলেন নিজের পিতৃভূমিকে। পিতৃভূমি জিনিসটা সম্ভবত এমনই, পিতার মতো ছায়া দেয়, চুষে নেয় সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অবসাদ।
দর্শকদের এ আচরণ ম্যারাডোনাকে এতটাই কষ্ট দিয়েছিল যে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনার হয়ে আর খেলবেনই না কোনো দিন।
ম্যারাডোনাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সংবাদটা আর্জেন্টিনায় ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত পত্রিকা ক্লারিনের সাংবাদিক গিয়েরমো ব্লাঙ্কো শেষমেশ খুঁজে খুঁজে চলে গেলেন এসকিনোতে। ম্যারাডোনা তখন ফুটবলের মাঠ থেকে বহু দূরে। নির্জন দ্বীপে ঘোরেন, ঘুমান আর নৌকায় করে মাছ ধরেন। শরীরে বইতে থাকা বাবার উপজাতি রক্ত ম্যারাডোনাকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসতে উৎসাহিত করেছিল, সেটা না বললেও চলে। গিয়েরমো ম্যারাডোনাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি ফুটবল খেলবে কবে?’ ম্যারাডোনার সোজাসাপটা উত্তর, ‘খেলব না। যে খেলার জন্য আমার মা বাবাকে গালি শুনতে হয়, সেই খেলা খেলতে আমার বয়েই গেছে।’
গিয়েরমো পড়লেন বিপদে। সারা দেশ ম্যারাডোনার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। সামনে বিশ্বকাপ। এই সময় তো আর এসব লেখা যাবে না। বললেন, ‘তুমি কিছু একটা বলো। আমাকে তো লিখতে হবে, নাকি?’ ম্যারাডোনা বললেন, ‘লিখে দাও, আমার মা–বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা–বাবা এবং আমি তাদের অনেক অনেক ভালোবাসি।’
না, ম্যারাডোনা নির্জন দ্বীপে থেকে যাননি, ফুটবল থেকেও অবসর নেননি। বরং আর্জেন্টিনা দলে ম্যারাডোনা আবারও ফিরেছিলেন। বীরের বেশে বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। যে আর্জেন্টাইনরা তাকে দুয়ো দিয়েছিল, সেই আর্জেন্টাইনরাই আবার তাঁকে মাথায় তুলে নেচেছিল। উপাধি দিয়েছিল ফুটবল-ঈশ্বরের। কিন্তু ম্যারাডোনা ফুটবলের চেয়েও যে নিজের মা–বাবাকে বেশি ভালোবাসতেন, এই কথা কি ওপরের ঘটনা থেকেই প্রমাণিত হয়ে যায় না? ফুটবলার ম্যারাডোনার চেয়েও মানুষ ম্যারাডোনা কি আমাদের কাছে বড় হয়ে ধরা দেন না? শুধু মা–বাবাই কেন? ফিলিস্তিন বা মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের প্রতি ম্যারাডোনা এই ভালোবাসার কথা বারবারই বলেছেন। সারা জীবন কথা বলেছেন অত্যাচারিত–নিপীড়িত মানুষের হয়ে।
ওই গল্পগুলোও আমরা শুনব অন্য কোনো দিন, অন্য কোথাও। আপাতত আমাদের তিন পর্বের ম্যারাডোনা জীবনের ইতি এখানেই টানতে হলো। মহাসাগরের মতো বিশাল যাঁর জীবন, সেই সাগর থেকে এক আঁজলা জলই শুধু তোলা গেল, সাগর আর ছোঁয়া হলো কই? কিন্তু যতটুকু জানা হলো, ততটুকু ম্যারাডোনাকে যেন আমরা মনে রাখি চিরদিন। ফুটবলার ম্যারাডোনার ছায়ায় আমরা যেন মানুষ ম্যারাডোনার কথা ভুলে না যাই। ম্যারাডোনা এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর ফুটবলটা খেলতে পারতেন, কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যেন ভুলে না যাই, ম্যারাডোনা সুন্দর করে ভালোওবাসতে পারতেন। তাই এই পৃথিবীতে এত এত ফুটবল–সম্রাট থাকলেও মানুষের ভালোবাসার রাজমুকুটটা ওই এক ম্যারাডোনার জন্যই তোলা ছিল, আছে এবং থাকবে সব সময়ই।