মাত্র ১২ ডলারে গুগল ডটকম কিনেছিলেন এক তরুণ, কীভাবে এমন ভুল করেছিল গুগল

কেউ যদি গুগলের মূল ডোমেইন গুগল ডটকম (google.com) পানির দরে কিনে নেয়, তবে কেমন হবে? ২০১৫ সালের এক রাতে ঠিক এমন এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছিলেন সন্ময় বেদ। মাত্র ১২ ডলারে (সে সময় বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৩৫ টাকার কম) কিনে ফেলেছিলেন google.com ডোমেইন। কে এই সন্ময় বেদ এবং গুগল কী ভুল করেছিল? আর তারপরের ঘটনাও আপনাকে চমকে দেবে।

মাত্র ১২ ডলারে গুগলের ডোমেইন কিনে নিয়েছিলেন সন্ময় বেদ
মাত্র ১২ ডলারে গুগলের ডোমেইন কিনে নিয়েছিলেন সন্ময় বেদ

সন্ময় বেদ ভারতের গুজরাটের মান্ডবি শহরের ছেলে। মজার ব্যাপার হলো, সন্ময় আগে গুগলেই চাকরি করতেন। ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ব্যাবসন কলেজে এমবিএ পড়ছিলেন। পড়াশোনার ফাঁকে প্রযুক্তি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা ছিল তাঁর স্বভাব।

২০১৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের সময় তখন রাত ১টা ২০ মিনিট। সন্ময় গুগলেরই ডোমেইন কেনার ওয়েবসাইট গুগল ডোমেইনসে ঢুঁ মারছিলেন। হঠাৎ কী মনে করে সার্চ বারে লেখেন—google.com।

সন্ময় ভেবেছিলেন, আর দশটা জনপ্রিয় সাইটের মতো এটিও নিশ্চয়ই ‘বিক্রির জন্য নয়’ দেখাবে। কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে পর্দায় ভেসে উঠল সবুজ রঙের টিকচিহ্ন! অর্থাৎ গুগল ডটকম বিক্রি হবে!

সন্ময় রীতিমতো আকাশ থেকে পড়লেন। ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোথাও কোনো গ্লিচ বা ভুল হচ্ছে। চোখের সামনে ‘অ্যাড টু কার্ট’ অপশন দেখে কৌতূহল সামলাতে পারলেন না। ডোমেইনটি কার্টে যোগ করে নিজের ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ১২ ডলার চুকিয়েও দিলেন।

ভাবছিলাম, পেমেন্ট করার সময় হয়তো কোনো এরর দেখাবে এবং ট্রানজেকশন বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, পেমেন্ট সফল হলো এবং আমার কার্ড থেকে সত্যিই টাকা কেটে নেওয়া হলো!
সন্ময় দেব, গুগলের ডোমেইন কেনার পরের অভিজ্ঞতা

পেমেন্ট সফল হওয়ার পরপরই সন্ময় গুগলের ওয়েবমাস্টার টুলের অ্যাকসেস পেয়ে যান। মানে, ওই মুহূর্তের জন্য তিনি সত্যিই গুগল ডটকমের মালিক হয়ে গিয়েছিলেন!

গুগলের অভ্যন্তরীণ নানা তথ্য সন্ময়ের সামনে আসতে শুরু করে। তবে গুগলের এই মালিকানা তাঁর কাছে ছিল মাত্র এক মিনিটের জন্য।

গুগল ডোমেইনস গুগল ডটকম কিনে নেওয়ার সাক্ষী এই স্ক্রিনশট

গুগল ডোমেইনস যেহেতু গুগলেরই নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম, তাই তারা দ্রুত নিজেদের এই মারাত্মক ত্রুটি ধরতে পারে এবং সঙ্গে সঙ্গে ট্রানজেকশনটি বাতিল করে দেয়। সন্ময়ের ১২ ডলারও তাঁর অ্যাকাউন্টে ফেরত চলে আসে।

আসল চমক

গল্পটি এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু আসল চমক তখনো বাকি। গুগলের মতো এত বড় টেক জায়ান্টের সিস্টেমে এমন একটা ফাঁকফোকর ধরিয়ে দেওয়ার জন্য গুগলের সিকিউরিটি টিম সন্ময়কে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সন্ময় অবশ্য শুরুতে বলেছিলেন, এমন কাজের জন্য তাঁর কোনো টাকার দরকার নেই। সাইবার নিরাপত্তার ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া সব সময় টাকার জন্য হওয়া উচিত নয়।

তবু গুগল সন্ময়কে ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে দেয় ৬ হাজার ৬ দশমিক ১৩ ডলার। টাকার অঙ্ক একটু অদ্ভুত লাগছে, না? এর পেছনে একটা দারুণ গাণিতিক রসিকতা আছে।

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ইংরেজিতে 6006.13 সংখ্যাটি দেখতে অনেকটা ‘GOOGLE’–এর মতো লাগে। মানে, G=6, O=0, O=0, G=6, L=1, E=3।

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ইংরেজিতে 6006.13 সংখ্যাটি দেখতে অনেকটা ‘GOOGLE’–এর মতো লাগে

গুগলের এই রসবোধ সন্ময়ের বেশ ভালো লেগেছিল। গুগল অবশ্য চাইলে সংখ্যার মাঝে দশমিকটা না দিয়ে ৬ লাখ ৬ হাজার ১৩ ডলারও দিতে পারত!

তবে সন্ময় এই টাকার এক কানাকড়িও নিজের পকেটে পোরেননি। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা তাঁর কাছে সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। তাই তিনি ঠিক করেন, পুরো টাকা তিনি দাতব্য সংস্থায় দান করে দেবেন।

ভারতের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করা দ্য আর্ট অব লিভিং ইন্ডিয়া নামের একটি সংস্থায় সন্ময় এই টাকা দিয়ে দেন। সংস্থাটি ভারতের ১৮টি রাজ্যে ৪০৪টি অবৈতনিক স্কুল চালায়, যেখানে প্রায় ৩৯ হাজার ২০০ শিশু বিনা মূল্যে পড়াশোনা করে।

ভুল থেকে শিশুর মুখে হাসি

সন্ময়ের এই মহৎ উদ্যোগের কথা জানতে পেরে গুগল অবাক হয়। তারা শুধু প্রশংসাই করেনি, সন্ময় যেহেতু টাকা মহৎ কাজে দান করেছেন, তাই গুগল পুরস্কারের অঙ্কটা সরাসরি দ্বিগুণ করে দেয়। অর্থাৎ গুগলের ভুলে পাওয়া ১২ ডলারের ডোমেইনের ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত হাজারো সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মুখে হাসি ফুটিয়েছিল।

সন্ময় বেদ এখন কী করছেন

এমবিএ শেষ করার পর সন্ময় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ–দুনিয়ায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন

এমবিএ শেষ করার পর সন্ময় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ–দুনিয়ায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। গুগল ছেড়ে আসার পর ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও টেকনোলজির সমন্বয়ে গড়া বিভিন্ন প্রজেক্টে প্রোডাক্ট লিডার হিসেবে কাজ করেছেন।

সূত্র: বিবিসি ও এনডিটিভি ডটকম