দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফুলের বাজার ঘুরে যা দেখলাম

ঢাকায় ফুলের বাজার মানেই এত দিন শাহবাগ আর আগারগাঁওয়ের নাম সামনে আসত। নতুন করে যোগ হয়েছে গাবতলীর নাম। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ‘বাজার অবকাঠামো উন্নয়ন ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে গাবতলী বেড়িবাঁধে স্থায়ীভাবে নির্মিত হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ফুলের পাইকারি বাজার। গত ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়েছে এই বাজারের কার্যক্রম।

সপ্তাহের প্রতিদিনই বিক্রি হচ্ছে ফুল
গাবতলী ফুলের বাজার

৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালে রওনা দিই নতুন এই ফুলবাজারের উদ্দেশ্যে। বাসে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নেমে একটু সামনে এগোলেই গাবতলী পুলিশ বক্স মোড়। সেই মোড় থেকে হাতের বাঁয়ে অটোরিকশায় ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে চলে আসা যায় পাইকারি ফুলের বাজারে।

ঝুলছে গাঁদা ফুলের মালা

তুরাগ নদের পাড়ে গাবতলী বেড়িবাঁধের এই অংশে ফুলের বাজারের একটাই বহুতল ভবন, বাকি সব ইট, পাথর আর বালু বিক্রির দোকান। দেশের নানা প্রান্ত থেকে বয়ে আনা পাথর ট্রাক থেকে নামানো হচ্ছে এখানে সেখানে।

এসবের মাঝ দিয়ে হেঁটে হেঁটে চলে এলাম লাল ভবনের ফুলবাজারের সামনে। ভেতরে প্রবেশ করতে চোখে পড়ল বিশাল পার্কিং স্পেস। বাঁয়ে পাকা বেদির ওপর ফুলের দোকান। ওপর থেকে ঝুলছে গাঁদা ফুলের মালা। নিচে গোলাপের পাপড়ি, রজনীগন্ধা, জারবেরাসহ আরও অনেক ফুল।

কী আছে এই ফুলের বাজারে

এখানে আছে দুটি তিনতলা ভবন। ভবন দুটির তিনটি ফ্লোর জুড়ে আছে সাড়ে তিন শর বেশি ফুলের দোকান বসানোর সক্ষমতা। এর মধ্যে ১৫০টি দোকানের বরাদ্দ চূড়ান্ত হয়েছে। এই বাজারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, ফুল সংরক্ষণের জন্য আছে ৫টি কুলিং স্টোরেজ, যার প্রতিটির ধারণক্ষমতা ২০ টন। দিন শেষে থেকে যাওয়া অবিক্রীত ফুল এসব কুলিং স্টোরেজে সংরক্ষণ করা যাচ্ছে। এভাবে ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত ফুল তরতাজা রাখা সম্ভব।

গাবতলী বেড়িবাঁধের এই অংশে ফুলের বাজারের একটাই বহুতল ভবন

আছে ফুল প্যাকেজিংয়ের আধুনিক যন্ত্রপাতি, দুটি লিফট এবং বাজার থেকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ফুল পরিবহনের জন্য ৭টি বিশেষায়িত গাড়ি। ফলে ফুল কাটা থেকে শুরু করে, প্যাকেজিং, পরিবহন ও সংরক্ষণ—পুরো প্রক্রিয়ার জন্যই প্রস্তুত এই ফুলবাজার।

বাজারে কথা হলো ১৯৯২ সাল থেকে ফুল–ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নড়াইলের ব্যবসায়ী, শেরেবাংলা নগর ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ক্যাশিয়ার এস কে আহমেদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি ঘুরে ঘুরে দেখালেন ফুলবাজারের এক মাথা থেকে আরেক মাথা।

নিচতলায় বিক্রির জন্য পাকা করা মঞ্চ, পাঁচটি কুলিং স্টোরেজ—কোনোটা ফাঁকা, কোনোটায় রাখা হয়েছে রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা। বালতিতে বসানো খোলা ফুল যেমন আছে, আছে বাক্সবন্দী ফুলও। পাশের ঘরে ফুল প্যাকেজিং করার যন্ত্রপাতি আর স্তূপ করে রাখা কাগজের প্যাকেট।

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতেই চোখে পড়ে খোলা মেঝেতে লাল কালিতে দাগ কাটা ঘর, ঘরের মধ্যে নম্বর উল্লেখ করা। একেকটি ঘর একেকটা দোকানের জন্য বরাদ্দ করা। ৭০-৮০ বর্গফুটের একেকটি দোকানের ভাড়া পড়ছে প্রতি বর্গফুট ২৫ টাকা হিসেবে।

একতলা থেকে অন্য তলায় যেতে সিঁড়ির পাশাপাশি আছে লিফট, আছে ট্রলি নামানোর র‍্যাম্প বা ঢালু পথ। দোতলার সেই ঢালু পথ ধরে এক ভবন থেকে অন্য ভবনে যেতেই হাতের বাঁয়ে পড়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশাল এক কক্ষ। সেখানে ঠাঁই পাচ্ছে ২৫০ থেকে ২৯৯ নম্বর পর্যন্ত স্টল।

এস কে আহমেদ হোসেন আঙুল দিয়ে দেখালেন তাঁর স্টল নম্বর ২৫৩। অনেক স্টল আবার ইস্পাতের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা এবং স্টলের নাম ও নম্বর ঝুলছে প্ল্যাকার্ডে। মাহরীনস গার্ডেন, এমএমএস অ্যাগ্রো, কিউ অ্যাগ্রো, আমিনস অ্যাগ্রো, বিউটি জারবেরা, জয়নব জারবেরা তেমনই কয়েকটি স্টলের নাম।

৭০-৮০ বর্গফুটের একেকটি দোকানের ভাড়া পড়ছে প্রতি বর্গফুট ২৫ টাকা হিসেবে

প্রতিদিনের ফুল বিপণন

সপ্তাহের প্রতিদিনই বিক্রি হচ্ছে নানা জাতের বর্ণিল সব ফুল। তালিকায় আছে গোলাপ, জারবেরা, রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস, গাঁদাসহ আরও অনেক প্রজাতির ফুল। ঢাকার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এখান থেকেই ফুল সংগ্রহ করতে পারছেন।

ভ্যালেন্টাইস ডে বা ভালোবাসা দিবস সামনে রেখে ফুলের বাড়তি চাহিদার কথা ভেবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ফুল সংগ্রহের জন্য আসছেন ফুল ব্যবসায়ীরা। মো. জসিম হাওলাদার যেমন এসেছেন ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে।

সেখানে তাঁর ফাতেহা রোজ গার্ডেন, বসুন্ধরা রোজ গার্ডেন, ফ্লাওয়ার ইভেন্ট ও জসিম ফুল বিতান নামে চারটি ফুলের দোকান আছে। আসন্ন ১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে তিনি এই বাজার থেকে কিনলেন বাক্সবন্দী ১ হাজার জারবেরা ও ৭৫০টি গোলাপ।

মো. জসিম হাওলাদার বলেন, ‘ভালোবাসা দিবস সামনে রেখে সব সময়ই ফুলের চাহিদা বাড়ে। আগে আগারগাঁও থেকে ফুল নিতাম। এখানে বাজার গড়ে ওঠায় প্রথমবারের মতো আজ এসেছি। সরাসরি ফুলচাষিদের থেকে তরতাজা ফুল আসে এখানে, দামও তুলনামূলক কম। আবার কুলিং স্টোরেজ থাকার কারণে ফুলের মান নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা নেই।’

দরদাম কেমন

যেহেতু পাইকারি ফুলের বাজার, তাই ফুল কেনা যায় এখানে পাইকারি দরে। বিভিন্ন ধরনের গোলাপের মধ্যে লিংকন গোলাপের দাম প্রতিটি ৭ টাকা, চায়না গোলাপ ৫ টাকা থেকে ২০ টাকা। জারবেরা ৫ টাকা থেকে ৭ টাকা।

গ্ল্যাডিওলাস ৫ টাকা থেকে ২০ টাকা। রজনীগন্ধা ৭ টাকা প্রতি স্টিক। গাঁদা প্রতি ঝোপা ৩০০ টাকা। গাঁদা ফুলের একেকটি ঝোপায় থাকে ২০টি সিঙ্গেল মালা বা ১০টি ডাবল মালা। আর প্রতি ঝোপায় ফুল থাকে ৮০০ থেকে ১ হাজারটি।

তবে ফুলের বাজারে ফুলের দাম অনেকটা কাঁচাবাজারের মতোই পরিবর্তনশীল। ভালোবাসা দিবস কিংবা শহীদ দিবসের মতো জাতীয় দিবসে ফুলের দাম বেড়ে হতে পারে কয়েক গুণ।

ফুল কেনা যায় এখানে পাইকারি দরে

বিবর্ণ ফুলও ফেলনা নয়

কুলিং স্টোরেজে সংরক্ষণের পরও সময়ের সঙ্গে কিছু ফুল বিবর্ণ হয়ে আসে। তবে সেসব ফুলও একেবারে ফেলনা নয়। বিবর্ণ ফুলের পাপড়ি ব্যবহার করে তৈরি করা হয় প্রাকৃতিক রং। এই রং দিয়ে কাপড় রাঙানোর কাজ হচ্ছে দেশের ফুল চাষের আঁতুড়ঘর হিসেবে পরিচিত যশোরের গদখালী অঞ্চলের পানিসারা গ্রামে। সেখানেই গড়ে উঠেছে এমন প্রাকৃতিক রঙের কাপড়ের কারবার।

গদখালীর ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ী, গাবতলী স্থায়ী ফুলের পাইকারি বাজার সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আবদুর রহিম বলেন, ‘আগে যেসব ফুল বিক্রি হতো না, সেসব ফেলে দিতে হতো। এখন সেই ফুলের পাপড়ি দিয়ে আমরা কাপড়ের রং বানাচ্ছি। এতে একদিকে ফুলের অপচয় কমছে, অন্যদিকে যোগ হচ্ছে বাড়তি কিছু আয়।’

আবদুর রহিম জানান, এসব ফুলের রং ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে শাড়ি, থ্রি–পিস, টি-শার্ট ও পাঞ্জাবি। কৃত্রিম রঙের তুলনায় ফুলের রঙে তৈরি কাপড়ে নরম ভাব ও স্বাভাবিক সৌন্দর্য অটুট থাকে, যা বাজারে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।

বাজারের পেছনের অংশে দেখা গেল রং বানানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে ১ হাজারটি গোলাপের পাপড়ি। কালো পলিথিনের ওপর ছড়িয়ে রাখা আছে সেসব পাপড়ি।

কুলিং স্টোরেজ থাকার কারণে ফুলের মান নিয়ে বাড়তি দুশ্চিন্তা নেই

যাঁদের জন্য এই বাজার

শাহবাগ ও আগারগাঁওয়ে যেসব পাইকারি ফুল ব্যবসায়ী আছেন, তাঁদের জন্য স্থায়ী ঠিকানা হতে পারে এই পাইকারি ফুলের বাজার। সাড়ে তিন শ স্টলের মধ্যে মাত্র ১৫০টি স্টল বরাদ্দ হয়েছে। বাকি স্টলগুলো যত দ্রুত পূর্ণ হবে, তত দ্রুতই জমজমাট হয়ে উঠবে নতুন এই ফুলবাজার। আগ্রহী ফুলচাষি ও ফুল ব্যবসায়ীরা সরাসরি গিয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।