মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক কার্ল ডাইজেরথ
মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক কার্ল ডাইজেরথ

মানবজাতির যাত্রাপথ চিরতরে বদলে যাবে, বলছেন নোবেলজয়ী চিকিৎসক

এ বছর চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পেয়েছেন মার্কিন স্নায়ুবিজ্ঞানী ও চিকিৎসক কার্ল ডাইজেরথ। পড়ুন তাঁর কথামালা।

প্রখর স্মৃতিশক্তি

সব মানুষের মস্তিষ্কেরই কিছু অসাধারণ দিক থাকে। আমার বেলায় বেশ কয়েকবারই সেটা স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। শব্দের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক আছে। খুব দ্রুত কোনো লেখা পড়ে সেটা মনে রাখতে পারি। মনে আছে, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় একটা কবিতা মুখস্থ করার জন্য আমাদের প্রায় ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হাত তুলে আমি বলেছিলাম, ‘হয়ে গেছে।’ সামনে গিয়ে যখন কবিতাটি আবৃত্তি করলাম, শিক্ষক চমকে গিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই ভাবছিলেন, ‘এটা কীভাবে সম্ভব! ও নিশ্চয়ই কবিতাটা আগে থেকেই জানত।’ তাই পরীক্ষা করার জন্য তিনি আমাকে অন্য একটা কবিতা দিলেন। সেটাও আমি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মুখস্থ করে ফেলেছিলাম।

আদতে শব্দগুলোকে আমি একটা গুচ্ছ আকারে দেখার চেষ্টা করি। অনেকে যেমন একপলকে একটি শব্দ বা বাক্য পড়ে ফেলতে পারে, আমি একপলকেই একগুচ্ছ বড় লেখা পড়ে ফেলতে পারি। তবে শব্দ নিয়ে আমার অনুভূতির গভীরতাও এখানে সাহায্য করে। অনুভূতি হলো স্মৃতির একটা অংশ, আর স্মৃতি হলো অনুভূতির অংশ। কোনো কিছু যদি মনে কোনো অনুভূতি সৃষ্টি না করে, তবে তা মনে রাখার কোনো কারণ নেই। আমার মনে হয়, এ অনুভূতিই শব্দগুলোকে মনে রাখতে সাহায্য করে।

আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম, মানুষের ভেতরে অনুভূতির জন্ম কোথা থেকে হয়। মানুষ হিসেবে এটাই বোধ হয় আমাদের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর একটি—মস্তিষ্ক বস্তুটির ভেতর কীভাবে অনুভূতি তৈরি হয়? উত্তর না পাওয়া সে প্রশ্নটিই হয়তো আজও আমাকে পরিচালিত করছে।

সাহিত্যে আগ্রহ

ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করতাম। রাইটিং ক্লাবে যোগও দিয়েছিলাম। কলেজে পড়ার সময় লেখালেখির কোর্স করেছি। সে সময়ও ভাবতাম, হয়তো বড় হয়ে লেখক হব। এমনকি গ্র্যাজুয়েট স্কুলেও পড়ালেখার পাশাপাশি স্থানীয় একটি কমিউনিটি কলেজে গিয়ে লেখালেখির ক্লাস করেছি। লেখালেখি আমার পুরো জীবনের একটা অংশ। আগ্রহের জায়গা। জীবনজুড়ে এত ব্যস্ততা, এসবের মধ্যে লেখালেখির জন্য সময় বের করতে হলে আদতেই একে ভালোবাসতে হয়।

আমার মনে হয়, আমাদের মস্তিষ্ক বিজ্ঞান ও শিল্পের মধ্যে একটা বিশেষ যোগসূত্র তৈরি করে। একটা সুন্দর শব্দ যেমন আমাদের মনে বিশেষ অনুভূতি জাগায়। এ সবই কোষের মাধ্যমে ঘটে। মস্তিষ্ক কোনোভাবে শিল্প ও শব্দকে অনুভূতিতে রূপান্তর করে। এক অর্থে, এটাই স্নায়ুবিজ্ঞানের মূল কথা। আবার এটাই শিল্পেরও মূল কথা।

মানুষের ভেতরে অনুভূতির জন্ম কোথা থেকে হয়, দীর্ঘ দিন ধরে এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছেন কার্ল

ইউরেকা মুহূর্ত

সবচেয়ে পরিষ্কার ‘ইউরেকা’ মুহূর্তটি এসেছিল ২০০৭ সালে। ইঁদুরের মস্তিষ্কের যে অংশটি ওর হাঁটাচলা নিয়ন্ত্রণ করে, সেই অংশ নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করছিল আমার এক পিএইচডি শিক্ষার্থী। এক সময় দেখা গেল, আমরা আলো জ্বাললেই ইঁদুরটি নড়াচড়া করছে। আবার আলো বন্ধ করলেই থেমে যাচ্ছে। সে এক অবিশ্বাস্য মুহূর্ত। আলো ও উদ্ভিদের ডিএনএ ব্যবহার করে আমরা যে শুধু স্তন্যপায়ী প্রাণীর আচরণ সূক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলাম, তা নয়; বরং এই একটি পরীক্ষাই এক ধাক্কায় অনেক প্রশ্ন ও দ্বিধার জবাব দিয়ে দিয়েছিল।

আদতে বিজ্ঞান হলো সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস, আইন—যেকোনো কিছু আরও গভীরভাবে বোঝার মূল চাবিকাঠি। স্নায়ুবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটা আরও বেশি সত্য। আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নায়ুবিজ্ঞান কী গভীর প্রভাব ফেলছে। এই যে ডিপ লার্নিং ও মেশিন লার্নিং রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলছে, এর মূল কিন্তু ওই স্নায়ুবিজ্ঞানেই। এটা আমাদের চারপাশের জীবন বদলে দিচ্ছে।

তরুণদের জন্য পরামর্শ

মানুষের মস্তিষ্ক ও ভবিষ্যতের নিউরোসায়েন্স নিয়ে যদি তরুণেরা কাজ করতে চান, করতে পারেন। তবে আমি তাঁদের আরও বেশি ঝুঁকি নিতে বলব। আপনি যদি এমন কোনো কাজ করেন, যেটাতে বড় ধরনের ঝুঁকি আছে, সেটা আপনাকে একধরনের মুক্তিও দেয়। কারণ, সে ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ফলাফল বা নির্দিষ্ট সময়ে সাফল্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশা থাকে না। এমন প্রত্যাশা না থাকলে কাজটা সহজ হয়। এক অর্থে, আপনি যদি চিরাচরিত পথেই হাঁটেন, সে ক্ষেত্রে চাপ আরও বেশি। কারণ, তখন কাজটা শেষ করতে না পারলে একে বড় ব্যর্থতা বলে মনে হয়।

আমি বলব, মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া, অতিরিক্ত কাজ না করা এবং নিজেকে চাঙা রাখা খুব জরুরি। গভীরভাবে ভাবার জন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় রাখুন। আমাদের সবার জীবনেই নানা জরুরি কাজ আসে। কিন্তু প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সময় আলাদা করে রাখা উচিত, যখন আপনি কোনো বিষয়ের একদম গভীরে পৌঁছাতে চেষ্টা করবেন। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা একটা অনন্য সময়ে বাস করছি। আমরা পৃথিবী সম্পর্কে, নিজেদের সম্পর্কে এমন সব গভীর বিষয় আবিষ্কার করতে যাচ্ছি, যে আবিষ্কার পৃথিবীর ইতিহাসে কেবল একবারই হবে। আমি মনে করি, প্রত্যেক মানুষেরই এই আবিষ্কার নিয়ে রোমাঞ্চিত হওয়া উচিত। কারণ, এর মধ্য দিয়ে মানবজাতির যাত্রাপথ চিরতরে বদলে যাবে। আমাদের সবারই এর পেছনের আনন্দ ও সৌন্দর্যকে উপভোগ করা উচিত।

সূত্র: আলোকচিত্রী হারলিন্ডে কোলবেলের ফ্যাসিনেশন অব সায়েন্স বইয়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার