ফুল, লতাপাতা দেখা যায় যশোরের নকশিকাঁথায়
ফুল, লতাপাতা দেখা যায় যশোরের নকশিকাঁথায়

যশোরের নারীদের জন্য সেলাই ‘থেরাপিউটিক’ও বটে

চিত্রা নদীর পাড়ে খাজুরা বাজার, আমার দাদাবাড়ি। বাজার পার হলেই মথুরাপুর গ্রাম। বাজার আর গ্রামের বাড়ির ভেতর দিয়ে কাঁচা-পাকা রাস্তা আর ফসলের মাঠ। ষাটোর্ধ্ব রমিজ চাচা আর তাঁর স্ত্রী জয়নব চাচি বাবার জমি দেখাশোনা করেন।

রমিজ চাচাদের বাড়ি গিয়ে দেখি, মাটির ঘরের দেউড়িতে বসে একটা রুমালে ফুল সেলাই করছেন চাচি। আসবাব বলতে দুই ঘরে দুটি তক্তার চৌকি, ট্রাংক, টেবিল। ট্রাংকটি যে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, সেখানেও কালো জমিনে হলুদ, গোলাপি আর কলাপাতারঙা সুতায় সুন্দর ফুল-পাতা নকশা আঁকা।

ট্রাংক খুলে চাচি দুটি কাঁথা দেখালেন। তাঁর একান্ত সম্পদ বলতে ওই দুই নকশিকাঁথা। তিনি জানালেন, ৪০ বছর ধরে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করেন। কাঁথা সেলাইয়ের টাকায় দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েদের বিয়েতেও উপহার দিয়েছেন নকশিকাঁথা।

তিন ছেলে বিয়ে করে বউ-বাচ্চা নিয়ে আলাদা থাকেন। এখন তিনি আর চাচা আছেন, সংসারে হাঁস-মুরগি আছে, আর আছে নকশিকাঁথা। বললেন, ‘সংসারে কত লোক আইসলো-গেল, এই সিলাই-ই আমার থাইকে গেল।’

যশোর অঞ্চলে কাঁথা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজার দশেক নারী

মজার ব্যাপার হলো, নকশিকাঁথাকে কেন্দ্র করে জয়নব চাচির জীবনের গল্প যশোর অঞ্চলের হাজারো নারীর সঙ্গে মিলে যায়। মালতী রানীদের বাসা যশোর সদরে, ঘোপে—আমাদের বাসা থেকে কয়েক পা এগোলেই।

তাঁর একমাত্র ছেলে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠবে। ৯ বছর হলো তাঁর স্বামী অন্য এক জায়গায় বিয়ে করে থিতু হয়েছেন, না স্ত্রী-সন্তানের খোঁজ নেন, না টাকাপয়সা দেন! মালতী তাঁর মায়ের জমির ভাগে পাওয়া সামান্য অংশে একটু একটু করে ঘর তুলছেন।

আর অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সেলাইয়ের টাকায় তিনি বাড়ি করছেন! আগে মালতীর মা-ও সেলাই করতেন। এখন বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই, চোখে বিশেষ দেখেন না। আমার মা-খালারাও মালতীকে দিয়ে বেশ কয়েকটি কাঁথা সেলাই করিয়েছেন।

বছর দুই হলো আমি কয়েকজন উদ্যোক্তা, কাঁথা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছি। তাঁদের কাছ থেকে নিয়মিত কাজ পান মালতী। এখন মালতী একা এত ‘অর্ডার’ সামলাতে পারেন না বলে আশপাশে আরও তিন-চারজনের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেন।

পোশাকের নকশায় যশোরের স্টিচ

প্রথমবার সাতটা কাঁথা সেলাইয়ের জমানো টাকা দিয়ে দুটি ছাগল কিনেছিলেন। এখন পর্যন্ত পাঁচটি ছাগলের বাচ্চা বিক্রি করেছেন। এখন আছে চারটি ছাগল। ছাগল আর কাঁথা বিক্রি করে একটু একটু করে পাকা ঘর ওঠানোর কাজ করছেন। বৃদ্ধ মা, পুত্র নিয়ে বেশ আছেন!

ফুফুর বাসায় বেড়াতে গিয়ে যশোরের ফুফাতো বোন রানীকে দেখলাম বস্তার ওপর গুজরাটি সেলাই করছে। আমি তো অবাক, বস্তায় কে সেলাই করে! বলল, সেলাই শেষে সেলাইয়ের অংশটুকু কেটে পাপোশের ওপর লাগানো হবে। এত সুন্দর নকশা থাকবে পায়ের নিচে! শৌখিনতা এই অঞ্চলে অন্য স্তরে পৌঁছে গেছে।

যশোর অঞ্চলে কাঁথা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাজার দশেক নারী। আর কি গ্রাম কি শহর, ধর্ম-বর্ণ-আর্থিক অবস্থানির্বিশেষে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যশোরের ঘরের নারীরা কমবেশি সবাই সেলাইয়ের কাজ করেন।

এখন অবশ্য কর্মজীবী নারী বেড়ে যাওয়ায় ঘরে বসে সেলাই করা নারীর সংখ্যা কমেছে। তবে যাঁরা সেলাই করছেন না, তাঁরা অন্তত কিনে নকশিপণ্য ব্যবহার করছেন। সেলাই না পারলেও কদরের কমতি নেই! তাই যশোরে কারও বাসায় ঢুকলে ঘরের ভেতর ইতিউতি তাকালে এই লোকশিল্পের টুকরো টুকরো শিল্পকর্ম অতিথির মনোযোগ কাড়তে বাধ্য।

করসেট, শাড়ির পাড় থেকে মাথার ব্যান্ড—সবখানেই নকশির নকশা

কাঁথা সেলাইয়ের মাধ্যমে সম্পর্কও যেন বোনা হয়, জোড়া হয় কাঁথার ফোঁড়ে ফোঁড়ে। সেলাই যে কেবল এই এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক অবলম্বন বা অবসরের সঙ্গী, তা-ই নয়, সেলাই এই নারীদের জন্য ‘থেরাপিউটিক’ও বটে!

কেবল নকশি সেলাই-ই নয়, যশোরে এখন ব্যাক সেলাই, চেইন সেলাই, বকুল ফুল, জিগজ্যাগ সেলাই, ভরাট—প্রায় সব ধরনের সেলাই চলে। কাঁথা ছাড়াও ফুল, লতাপাতা, হাতি, পাখি ফুটে ওঠে কামিজ, ওড়না, শাড়ি, কুশন পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, বিছানার চাদর, বালিশের কভার, কোলবালিশের খোল, বাচ্চাদের জামাকাপড়, চাদর বা ডাইনিং টেবিলের কাপড়ের ম্যাট ও শৌখিন ছোটখাটো নানা কিছুতে।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পান্থপাড়া গ্রামটির নামই হয়ে গেছে ‘নকশিকাঁথার গ্রাম’। আগে পুরোনো ব্যবহৃত শাড়ির পাড়ের সুতা তুলে সেই সুতা দিয়ে তৈরি হতো নকশিকাঁথার ফুল-পাতা। সেই চল এখনো যশোরের কোথাও কোথাও আছে।

তবে নতুন রঙিন সুতা বা সিল্কের সুতা কিনেই সেলাই করা হয় বেশি। যশোর সদরের বড় বাজারের কাপুড়িয়াপট্টিতে একটা গলিজুড়ে কেবল সুই-সুতা, চুমকি-পুঁতি, উল-বোতামের দোকান। পাড়ার মোড়ের দোকান বা গ্রামের রাস্তার মাথার মুদিখানার দোকানেও মিলবে সুই-সুতা।

ভরাট নকশায় সেলাই করা কাঁথা

সতীশ চন্দ্র মিত্র তাঁর ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, মূলত পাঠান আমলে, অর্থাৎ ১৪০০ থেকে ১৬০০ সালে যশোরের বস্ত্রশিল্পের সমৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে। তবে ৭০০ বছর আগে, অর্থাৎ চতুর্দশ শতাব্দীতেও (১৩০০ সালে) এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ বস্ত্রে ও সুতার কারুকাজের ইতিহাস মেলে। ঐতিহাসিকদের মতে, যশোরে উৎকৃষ্ট মানের তুলা উৎপাদনের কারণে সেলাইয়ে সমৃদ্ধি অর্জন সহজ হয়েছে।

যশোরের নারীরা কয়েক শ বছর আগে থেকেই কাঁথা ও শিকা (খাবার ঝুলিয়ে রাখার আধার) তৈরি করে দেশে–বিদেশে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। পাড়ের সুতা, বিলেতি সুতা দিয়ে নারীরা মনের ভেতরের নকশাকে কাঁথায় ফুটিয়ে তুলতেন। এভাবেই মূলত এ অঞ্চলের নারীদের রঙিন নকশিকাঁথার মতো ফুল তোলা রঙিন স্বপ্ন দেখার শুরু।

দুই দশক ধরেই বিশ্বের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে যশোরের নারীদের হাতে তৈরি নকশিকাঁথা। মহামারিকালের পর অনলাইনে নকশিকাঁথা ও এই শিল্পের নানা অনুষঙ্গের ‘মার্কেটপ্লেস’ তৈরি হলো। এর পর থেকে এ অঞ্চলের নারীরা বছরে গড়ে ১ লাখ নকশিপণ্য তৈরি করেন, আর চার বছর ধরে সেগুলোর বাজারমূল্য ১৫০ কোটি টাকার কম নয়!