
ঘুমানোর আগে ‘আর মাত্র পাঁচ মিনিট’ ভেবে ইনস্টাগ্রাম বা টিকটক খুলেছিলেন। কখন যে এক ঘণ্টা কেটে গেছে, টেরই পাননি। এর মধ্যে দেখেছেন অন্যের বিদেশভ্রমণ, বিলাসী জীবন, নিখুঁত ছবি, সফলতার গল্প। ফোনটা নামিয়ে রাখার পর হঠাৎ নিজের জীবনটাই যেন একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এমন অনুভূতি কি কেবল আপনার? নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, না। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো অ্যালগরিদমনির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানসিক সুস্থতার ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬–এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও মানুষের সুখ–সন্তুষ্টির সম্পর্ক নিয়ে কয়েকটি গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সেখানে দেখা গেছে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া প্ল্যাটফর্ম, যেমন হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক ব্যবহারকারীদের জীবনে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও এক্সের (সাবেক টুইটার) মতো অ্যালগরিদমনির্ভর প্ল্যাটফর্ম বেশি ব্যবহার করলে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টি বাড়ার ঝুঁকি দেখা যায়।
গবেষকদের মতে, মূল পার্থক্যটি প্ল্যাটফর্মের ধরনে। হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে মানুষ সাধারণত পরিচিত মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, পরিবার–বন্ধুদের খবর নেয় বা বার্তা আদান–প্রদান করে।
অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে ব্যবহারকারীরা দীর্ঘ সময় অ্যালগরিদমের বেছে দেওয়া ভিডিও ও ছবি দেখে যায়। সেখানে ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবনযাপন, সাজানো মুহূর্ত এবং আকর্ষণীয় কনটেন্টের আধিক্য থাকে।
ফলে অনেকেই অজান্তে অন্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করতে শুরু করে।
গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্যও উঠে এসেছে। প্রতিদিন এক ঘণ্টা বা তার কম সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা, একেবারেই ব্যবহার না করা মানুষের তুলনায় জীবনের কিছু ক্ষেত্রে বেশি সন্তুষ্ট থাকে।
তবে সমস্যা শুরু হয় যখন ব্যবহার অনেক বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের গড় ব্যবহার ছিল প্রতিদিন প্রায় আড়াই ঘণ্টা।
ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ইয়ান-ইমানুয়েল ডে নেভ বলেন, এখানে ‘গোল্ডিলকস নীতি’ কাজ করে। অর্থাৎ খুব বেশি নয়, আবার একেবারে শূন্যও নয়; মাঝামাঝি ব্যবহারই সবচেয়ে উপকারী হতে পারে।
গবেষকেরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। যেসব দেশে তরুণদের সুখের মাত্রা কম, সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়াও আরও অনেক কারণ আছে। যেমন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, অর্থনৈতিক চাপ ইত্যাদি। অর্থাৎ শুধু ইনস্টাগ্রাম বা টিকটককে দায়ী করলে পুরো ছবিটি বোঝা যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ব্যবহার করার ধরনটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু অভ্যাস সাহায্য করতে পারে—
অকারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল না করে নির্দিষ্ট সময় ব্যবহার করুন।
বাস্তব জীবনের বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগকে বেশি গুরুত্ব দিন।
ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা না করার চেষ্টা করুন।
প্রয়োজনে ফোনের ‘স্ক্রিন টাইম’ বা ‘ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং’–এর মতো ফিচার ব্যবহার করে সময় সীমা নির্ধারণ করুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে ভালো বা খারাপ, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। আপনি এটি কীভাবে ব্যবহার করছেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যে প্ল্যাটফর্ম মানুষকে বাস্তব সম্পর্কের কাছাকাছি রাখে, সেটি তুলনামূলকভাবে উপকারী হতে পারে। আর যদি অ্যালগরিদমের টানা স্ক্রলিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হারিয়ে যান, তাহলে সেটিই ধীরে ধীরে আপনার মানসিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৬