সেন্ট মার্টিনের নীল জলের কাছাকাছি

বেড়ানোর এই মৌসুমে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে করোনাভাইরাস। সেই মার্চ থেকে ঘরবন্দী থাকার পর খানিকটা ঝুঁকি নিয়েই সেন্ট মার্টিনের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম। বাসে ঢাকা থেকে সোজা টেকনাফ। সকালে নাশতা করে কেয়ারি সিন্দবাদ জাহাজে চেপে বসলাম। সঙ্গে সহকর্মী মাসুদ।

সেন্ট মার্টিনের নীল জলরাশি আর সাম্পান নৌকা

ছুটির দিনে পর্যটকের চাপ বেশি মনে করে ছুটির দিন এড়িয়ে রওনা হয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। ছুটির দিনের বাইরেও মানুষের ভিড় কম নয়। জাহাজ কর্তৃপক্ষ বলছিল, আগামী ১৫ দিনের টিকিট সব বুকিং। এ যাত্রায় নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবান মনে হলো।

সৈকতে নারকেল গাছ আর কেয়া বন

জাহাজে নিজ নিজ আসনে বসার পর মনে হলো বসে থাকতে মন চাইছে না। জাহাজের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। শত শত গাঙচিল ছুটছে জাহাজের পেছনে। যেদিক দিয়ে জাহাজ ছুটছে, সেদিকে তারাও ছুটছে। কারণ, জাহাজ চলে যাওয়ার পথে পানি সরে গেলে সেখানে জলজ খাবার ভেসে ওঠে। সেই লোভে গাঙচিলগুলো ছুটছে তো ছুটছেই। কেউ কেউ সেই দৃশ্য ভিডিও করছেন। আজকাল ভ্রমণ ব্লগের জন্য ভিডিও করেন অনেকে। পরে সেগুলো সম্পাদনা করে ইউটিউব বা ফেসবুকে দেন। এমন দুটি দলকে দেখতে পেলাম। কথায় কথায় জানলাম তাঁরা ট্রাভেল ব্লগার।

টেকনাফের দুদিকে পাহাড়। আরেক দিকে দেখা যাচ্ছে মিয়ানমারের সীমান্ত। কুয়াশাঘেরা পাহাড় দেখতে দেখতে মন যেন ভালো হয়ে গেল। সেই সঙ্গে মিষ্টি একটা রোদ এসে গায়ে আরাম দিল। বেলা একটার দিকে জাহাজ সেন্ট মার্টিনের কাছাকাছি আসতেই যেন যাত্রীরা নড়েচড়ে বসলেন। ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। প্রতিযোগিতা যেন কে কার আগে নামবেন। সহযাত্রী এক চিকিৎসক বললেন, এত তাড়াহুড়ার তো কিছু নেই। করোনার এই সময়ে ধীরে ধীরে নামাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা।

কেয়া বন

জাহাজ থেকে নামতে গিয়ে মনে হলো এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ। যাহোক, জাহাজ থেকে নেমে হোটেল খুঁজতে গেলাম। কিছুদিন আগে এক সহকর্মী একটি রিসোর্টের খোঁজ দিয়েছিলেন। সাগরের তীরঘেঁষা সেই রিসোর্টে গিয়ে পরিবেশটা ভালো লাগল। চারদিকে নারকেলগাছ আর মূল সৈকতের একবারে কাছে। রিসোর্ট থেকেই সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। রিসোর্টের আশপাশে সাগরলতার ফুল ফুটেছে। আছে দোলনাও। সব মিলিয়ে মনমতো হলো।

প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছিল। কাছেই লেখক হুমায়ূন আহমেদের বাড়ির পাশে বেশ কয়েকটি খাবারের দোকান। মসলা হলুদ মাখানো মাছের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। পছন্দ করলেই ভেজে দিচ্ছে। সেন্ট মার্টিনে এসে সামুদ্রিক মাছ বাদে অন্য খাবার খাওয়া নাকি বোকামি! কেননা, মাছের এত আয়োজন তো চাইলে ঢাকায় বসে পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা বাছাই করলাম সুন্দরী আর টুনা মাছ। এখানে ভাতের প্যাকেজ হলো, মাছের সঙ্গে ‘আনলিমিটেড’ ভাত। সঙ্গে সবজি আর ভর্তা। খাবার খেতে খেতে ঠিক করলাম বিকেলে মূল সৈকতে বসব আর সূর্যাস্ত দেখব।

সৈকতের পাশে সন্ধ্যার পর থেকে হরেক রকম মাছের পসরা বসে

সৈকতের পাশে ছাতা দেওয়া চেয়ারে ঘণ্টা চুক্তিতে বসে গেলাম। পাশেই সেন্ট মার্টিনের ডাবের পসরা। এখানে এত নারকেলগাছ আপনি গুনে শেষ করতে পারবেন না। এ জন্যই নাকি সেন্ট মার্টিনের আরেক নাম নারিকেল জিঞ্জিরা। ডাবের পানি ভীষণ মিষ্টি। পানিতে চুমুক দিতে দিতেই বেলা পড়ে গেল।

সেন্ট মার্টিনে সূর্যাস্ত

পশ্চিম আকাশে লালের আভা আর টকটকে লাল সূর্য বিদায় নেওয়ার অপেক্ষায়। এখানে বাইসাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। সেই সাইকেলে সৈকতে ঘুরতে লাগল বেশ কিছু তরুণ–তরুণী। একসময় টুপ করে সূর্যটা ডুবে গেল। তবে লাল আভা আরও কিছুটা সময় দেখা গেল।

আমাদের এক সহকর্মী জুয়েল বিয়ের ৯ মাস পর হানিমুনে এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে দেখা হতেই রাতে মাছের বারবিকিউয়ের আমন্ত্রণ জানালাম। সৈকতের পাশে সন্ধ্যার পর থেকে হরেক রকম মাছের পসরা বসে। সেই মাছ পছন্দ করে দিলে ভেজে দেয় বা বারবিকিউ করে দেয়। বারবিকিউ অর্ডার দিলে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। আর মাছ ভাজায় সময় কম লাগে। আমরা কিছু মাছ ভাজার অর্ডার দিয়ে খেতে খেতে বারবিকিউয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।

জ্বলন্ত কয়লার মধ্যে মাছ বারবিকিউ করার দৃশ্য দেখতে দারুণ

জ্বলন্ত কয়লার মধ্যে মাছ বারবিকিউ করার দৃশ্য দেখতে দারুণ। আর খাবারের জন্য অপেক্ষা করার সময়টাও উপভোগ্য। বারবিকিউ এল যখন সঙ্গে পরোটা আর সালাদ সস দেওয়া হলো। বড় সাইজের সামুদ্রিক লাল কোরাল আমরা অর্ডার করেছিলাম। দেখতে তো ভালোই খেতে যে কেমন হয়! নাহ, খেতেও ভালোই লাগছে। শীতের হিমেল হাওয়া সহনীয় হওয়ায় পরিবেশটাও বেশ ভালোই লাগল।

কোনো তাড়াহুড়া নেই। বাসায় ফেরার তাড়া নেই। সময় নিয়ে গল্পগুজব করে খেতে লাগলাম। গল্পে যোগ দিলেন মাছ বিক্রেতা। তিনি বলছিলেন, একবার বেশ কিছুদিন তাঁদের জেলেদের দলটি মাছ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু কিছুদিন পর একেবারে শত শত বড় সাইজের লাল কোরাল মাছ পেলেন। সাত লাখ টাকায় বিক্রি করে ফিরে সবার মুখে তৃপ্তির হাসি। এমন ঘটনা নাকি প্রায়ই এখানে ঘটে। রাত ১২টা পর্যন্ত থেকে আমরা যে যার হোটেলের কটেজে ফিরে গেলাম।

বালুতে সাগরলতায় ফুল ফুটেছে

পরদিন সকালে উঠে নাশতা সেরে নিয়ে সৈকতের ধারে বসলাম। নীল জলরাশি আর সামুদ্রিক সাম্পান নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে। বিশাল নারকেলবাগানে মন মাতাল করা বাতাস। সৈকতের ধারে মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকল। তবে শীতের এই সময়ে সৈকতে গোসল করতে নামা মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা। আমরাও দুপুরের দিকে নামলাম, তবে থাকলাম অল্প সময়। গোসল শেষে আবার হোটেল গিয়ে পরিষ্কার পানিতে গা ধুয়ে নিলাম। দুপুরে আবার মাছ ভাজা আর ভাত। সঙ্গে নানা ধরনের মাছের ভর্তা।

সেন্ট মার্টিনের ডাব খুব সুস্বাদু

ছেঁড়া দ্বীপ যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে অনেকে ট্রলারে বা মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। মনকে সামলালাম। নিষিদ্ধ কোনো কিছু করা ঠিক হবে না। এই ছেঁড়া দ্বীপ একসময় সামুদ্রিক নানা প্রবালে ভরপুর ছিল। মানুষের আনাগোনা কম ছিল। এখন মানুষ যেতে যেতে সেই দ্বীপের পরিবেশ অনেকটা ঝুঁকিতে। পলিথিন বা প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে সামুদ্রিক মাছ ও প্রাণী হুমকিতে। ঠিক সেন্ট মার্টিনেও একই অবস্থা। অপরিকল্পিত হোটেল ওঠায় আর মানুষের অসচেতনতায় এই দ্বীপ এখন হুমকিতে।

সেন্ট মার্টিনে যা করবেন না

প্রচুর নারকেল গাছ আছে বলেই হয়তো সেন্ট মার্টিনের আরেক নাম নারিকেল জিঞ্জিরা

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, মানুষের অসচেতনতা সেন্ট মার্টিনকে হুমকিতে ফেলে দিয়েছে।

  • এখানে এসে অনেকে পলিথিন বা খাবার পানির ব্যবহৃত বোতল এখানে–সেখানে ফেলেন। সেগুলো সমুদ্রে গিয়ে জলজ প্রাণী আর প্রবালের বংশবিস্তারে বাধা দেয়। তাই ওগুলো এখানে–সেখানে ফেলা যাবে না।

  • সামুদ্রিক প্রবাল বা বড় ঝিনুক সংগ্রহ করা যাবে না। এগুলো কেউ সংগ্রহ না করলে চোরাকারবারিরা এগুলো বিক্রি করতে নিরুৎসাহিত হবে। তাতে এই প্রবাল দ্বীপের জন্য ভালো হবে।

  • সামুদ্রিক কচ্ছপ রাজকাঁকড়া সংগ্রহ করা যাবে না। এগুলো পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে নিষিদ্ধ করা।

  • বিশেষ বিশেষ এলাকা যেখানে কচ্ছপ ডিম দেয়, সেসব এলাকায় আনাগোনা কমাতে হবে। তারা রাতে ডিম দেয়। সেই সময় সেখানে অবস্থান করা যাবে না।

  • সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়া দ্বীপ অংশে পর্যটকদের যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


    এ ছাড়া পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় সেন্ট মার্টিনে ছয় ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। ১২ অক্টোবর মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক পরিপত্রে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নভেম্বর মাস থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত বাড়বে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরিপত্রটি জারি করা হয়েছে। নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কোস্টগার্ডকে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বলা হয়েছে, সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়া দ্বীপ অংশে এখনো কিছু সামুদ্রিক প্রবাল জীবিত আছে। প্রবালগুলো সংরক্ষণের জন্য এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

  • এখন থেকে সেন্ট মার্টিনের সৈকতে কোনো ধরনের যান্ত্রিক যানবাহন, যেমন মোটরসাইকেল ও ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চালানো যাবে না।

  • রাতে সেখানে আলো বা আগুন জ্বালানো যাবে না।

  • রাতের বেলা কোলাহল সৃষ্টি বা উচ্চ স্বরে গানবাজনার আয়োজন করা যাবে না।

  • টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে যাতায়াতকারী জাহাজে অনুমোদিত ধারণ সংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা যাবে না।

সেন্ট মার্টিনের এই নির্মল প্রকৃতিকে বাঁচাতে হলে একে দুষণ মুক্ত রাখতে হবে

প্রশ্ন হলো, সেন্ট মার্টিন কি মরে যাবে? কেন বলছি সে কথা, সেটা বলি। আমাদের মধ্যে যাঁরা ভ্রমণে যান তাঁরা ভাবেন ভ্রমণে আছে অপার স্বাধীনতা। তাই যা ইচ্ছা তাই করা যায়। কিন্তু সেন্ট মার্টিনের মতো সংবেদনশীল জায়গায় ভ্রমণে গিয়ে যা ইচ্ছা তাই করলে সেগুলো কি বাঁচবে? সেন্ট মার্টিন এবং এর মতো সংবেদনশীল জায়গাগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আর বাঁচিয়ে রাখতে হলে সচেতন হতে হবে ভ্রমণকারীদের। সরকারি বিধিনিষেধগুলো মানতে হবে।
নতুন বছরে ভ্রমণে সবাই সচেতন হবেন, সেটা আশা করছে সেন্ট মার্টিন।