চেঙ্গিস খানের দেশ মঙ্গোলিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন সাবেক টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান লিনু
চেঙ্গিস খানের দেশ মঙ্গোলিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন সাবেক টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান লিনু

মঙ্গোলিয়ায় বেড়াতে গিয়ে কেমন অভিজ্ঞতা হলো সাবেক টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান লিনুর

চেঙ্গিস খানের দেশ মঙ্গোলিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন সাবেক টেবিল টেনিস তারকা জোবেরা রহমান লিনু। নানা দর্শনীয় স্থানে ঘোরার ফাঁকে যাযাবরদের তাঁবুতেও ঢুঁ মেরেছিলেন। লিখলেন সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।

বিমানবন্দরে নেমেই বোঝা গেল, মঙ্গোলিয়া আসলে চেঙ্গিস খানময়! তাঁর নামেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি। বের হয়ে গেস্টহাউসে যেতে যেতেও দেখলাম, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁর প্রতিকৃতি। ছোটবেলায় এই চেঙ্গিস খানের পৃথিবী জয়ের গল্প পড়েই তাঁর দেশ মঙ্গোলিয়ার প্রতি আগ্রহের শুরু। ভ্রমণ ছাড়াও নানা কাজে নানা দেশে গেছি, তবে যাওয়া হয়ে ওঠেনি মঙ্গোলিয়ায়। অবশেষে গত অক্টোবরে ছোটবেলার আগ্রহের দেশ ভ্রমণের সুযোগ হলো।

প্রথম দিন ব্রেকফাস্ট সেরেই উলানবাটোর শহরটা ঘুরতে বের হলাম। প্রথমেই হাজির হলাম দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধমন্দির গানডেন মনাস্ট্রিতে। ২০০ বছর আগের এই মঠে শতাধিক সন্ন্যাসী থাকেন। নানা ধরনের বৌদ্ধ নিদর্শন রাখা মঠ প্রাঙ্গণের এখানে-সেখানে। এর মধ্যে সোনালি প্রলেপ দেওয়া ব্রোঞ্জ ও মূল্যবান রত্ন দিয়ে তৈরি আভালোকিতেশ্বরের মূর্তি বেশি নজর কাড়ল। সময় নিয়ে মনাস্ট্রি দেখে চলে গেলাম সুখবাটার স্কয়ারে। এই স্কয়ার মঙ্গোলিয়ায় পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণকেন্দ্র। স্যুভেনির থেকে বইয়ের দোকান, খাবারদাবারসহ নানা কিছু মেলে এখানে। স্কয়ারটির নামকরণ হয়েছে দেশটির বীর দামদিন সুখবাটারের নামে, যিনি বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় স্বাধীনতা বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ভেতরে যেতেই চোখে পড়ল তাঁর ভাস্কর্য। স্কয়ারের উত্তর প্রান্তে দৃষ্টিনন্দন রাষ্ট্রীয় ভবন।

সেদিন আরও ঘুরে দেখলাম পার্লামেন্ট হাউস, ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মৃতিবাহী জাইসান মেমোরিয়াল। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই স্মৃতিস্তম্ভের কাছে দাঁড়িয়ে পুরো উলানবাটোর শহর আরেকবার দেখে নিলাম।

যাযাবর মঙ্গোলীয়রা যে তাঁবুতে থাকে, তা ‘গের’ নামে পরিচিত

যাযাবরদের অন্দরে

মঙ্গোলীয়রা যাযাবর জাতি। দেশটির আদিবাসী এই মানুষদের জীবনযাপন দেখার ইচ্ছাও এই দেশে আমাকে টেনে এনেছে। পরদিন ভোরে নাশতা খেয়ে সেই পথেই পা বাড়ালাম। সকালের মিষ্টি রোদ আর ঠান্ডা বাতাসে শরীর ও মন কী এক অসাধারণ ভালো লাগায় ভরে গেল। গাড়ি চলছে মহাসড়কে। চারদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ। রঙিন পাহাড় সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে ব্যাকট্রিয়ান ক্যামেল (দুই কুঁজওয়ালা উট) চরছে।

পথেই চেঙ্গিস খানের বিশাল এক মূর্তি দেখে থেমে গেলাম। ঘোড়ায় আরোহী চেঙ্গিস খানের এই বিশাল ভাস্কর্যটি স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি। মাটি থেকে ৩৩ ফুট উঁচুতে মূর্তিটি রাখা, মোট উচ্চতা ১৬৪ ফুট। লিফটে চড়ে নিচ থেকে একেবারে ঘোড়ার মাথা পর্যন্ত চলে যাওয়া যায়। সেখানে একটি ভিউয়িং প্ল্যাটফর্ম আছে, যেখান থেকে মঙ্গোলিয়ার বিস্তৃত তৃণভূমির প্যানারোমিক দৃশ্য দেখা যায়। পেছনে চেঙ্গিস খানের মূর্তি রেখে আমি ছবি তুললাম একটা ইগল হাতে নিয়ে। পাখিটির এতই ওজন যে হাতে ধরে রাখতে কষ্ট হচ্ছিল!

সেখান থেকে দ্রুতই পথ ধরলাম যাযাবরদের আস্তানার দিকে। যাযাবর মঙ্গোলীয়রা যে তাঁবুতে থাকে, তা ‘গের’ নামে পরিচিত। বিশেষ এই তাঁবু তৈরি হয় ভেড়ার চামড়া দিয়ে। এগুলো ভীষণ মজবুত। তুষারপাতেও নষ্ট হয় না। তাঁবুর ভেতরে ঠিক মাঝখানে থাকে একটা ফায়ারপ্লেস, ছাদের মাথা দিয়ে চিমনি বের হয়ে আছে ধোঁয়া বেরোনোর জন্য। আমি সে রকম এক গেরে গিয়ে বিস্মিত হয়ে উচ্চারণ করলাম ‘আলহামদুলিল্লাহ’। মনে হচ্ছিল, আমি কি সত্যিই মঙ্গোলীয় যাযাবরদের বাড়িতে এসেছি! গেরের ভেতরটা ভীষণ রঙিন। শীতের সময় গরম রাখতে দেয়াল আর ছাদ ভেড়ার উল দিয়ে তৈরি। মেঝেতেও উলের কার্পেটিং।

ঝুলন্ত ব্রিজে পা দিয়েই ভয়ে অস্থির

যাযাবর পরিবারটা আপ্যায়ন করল আমাকে। দুধ আর ক্রিম দিয়ে বানানো খাবারটা আমাদের চিজের মতো স্বাদের, কেক আর পাউরুটি দিয়ে খেতে হলো। তারপর মঙ্গোলিয়ার খুব জনপ্রিয় লবণ মেশানো দুধ-চা পরিবেশন করা হলো। কী যে স্বাদ! তারপর শুরু হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী রান্না। সবজির সঙ্গে গরুর মাংস, রুশ সালাদ, আলুর চিপস আর স্টিকি রাইস রান্না হলে বসে পড়লাম খাবারের টেবিলে।

তাঁবু ছেড়ে দুই কুঁজবিশিষ্ট উট আর ঘোড়ায় চড়ার জন্য খামারে গেলাম। উটের পিঠে চড়ে মনে হলো আমি সেই ২১ বছরের তরুণী, যে জীবনকে উপভোগ করতে মঙ্গোলিয়ায় চলে এসেছে। ভাবছিলাম, এই বিরানভূমিতে তারা কীভাবে জীবন কাটাচ্ছে? এরা জানে না উন্নত বিশ্বে কী ঘটছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, পারমাণবিক বোমা, ক্ষমতার দাম্ভিকতা এসবের খোঁজ তারা রাখে না। শুধু নিজেদের নিয়েই থাকে। উট, ঘোড়া আর গরু ও ভেড়া নিয়েই তাদের দিন কাটে। এসব প্রাণী তাদের প্রিয় বন্ধু, বেঁচে থাকার উৎস।

এবার ফেরার পালা। সন্ধ্যা নেমে গেছে। চারদিকে সুনসান নীরবতা। তার মধ্য দিয়ে হিমশীতল আবহাওয়ায় আমি হারিয়ে গেলাম অন্য এক স্মৃতিবিজড়িত জীবনে, যেখানে আমি কারও হাত ধরে হাঁটতে চেয়েছিলাম; কিন্তু বিধাতা আমার জন্য তুলে রেখেছেন এই যাযাবরদের জীবন দেখা।

বৌদ্ধমন্দির গানডেন মনাস্ট্রিতে

একা, তবে নিঃসঙ্গ নই

সন্ধ্যায় বারান্দায় ঠান্ডায় বাতাসে বসে ভাবছি—কে বলে আমি একা? অ্যালোন অ্যান্ড লোনলি—দুটির দুই মানে। আমি একা হতে পারি; কিন্তু নিঃসঙ্গ নই। নিঃসঙ্গতাকে আমি ভয় পাই, কিন্তু একাকিত্বকে আমি আমার মতো করে উদ্‌যাপন করি। আমি যে গেস্টহাউসে উঠেছি, তার মালিক একটি মেয়ে। দেশে থাকতেই ফোনে কথা বলতে বলতে সে আমার বন্ধু হয়ে গেছে। সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, আমার জন্য অপেক্ষা করছে সে। জিজ্ঞাসা করল, তার সঙ্গে বেড়াতে যাব কি না?

আমি ওর জিপে চড়ে বসলাম। দুই ঘণ্টা ড্রাইভ করে পাহাড়ে চলে গেলাম। ওপরে উঠে অবাক, কী অপরূপ দৃশ্য! যত দূর চোখ যায়, সারি সারি গের আর পাহাড়। তারপর দেখলাম সুইং ব্রিজ। দোলনার মতো ঝুলন্ত ব্রিজে পা দিয়ে আমি তো ভয়ে অস্থির। ব্রিজটা দুলছে তো দুলছেই। মনে হচ্ছিল, এখনই হয়তো উল্টে গিয়ে নিচে পড়ে যাব! কিন্তু হাঁটি হাঁটি পা পা করে শেষ করলাম। এমন রোমাঞ্চকর মুহূর্ত কি জীবনে ভোলা যায়!