সাত মহাদেশের শতাধিক দেশ ভ্রমণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি দম্পতি শাহারিয়াত শারমীন ও রেজাউল বাহার। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে গিয়েছিলেন গ্রিনল্যান্ডে। তাঁদের সেই সফরের অভিজ্ঞতা লিখেছেন রেজাউল বাহার
পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্ত অ্যান্টার্কটিকার বরফশীতল অঞ্চলে যখন ঘুরছি, সেই সময়ই মাথায় ঢুকল পৃথিবীর সর্ব উত্তরের অঞ্চলটি ঘুরে দেখার পোকা। সুমেরু বৃত্ত বা পৃথিবীর সর্ব উত্তরে পড়েছে আটটি দেশের অংশ। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই গ্রিনল্যান্ডের। ২০২১ সালে অ্যান্টার্কটিকা সফর শেষ করেই দেশটি ভ্রমণের পরিকল্পনা শুরু করি। শেষমেশ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে এল সেই দিন।
আমাদের যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহর থেকে। সেখান থেকে আইসল্যান্ড হয়ে গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে অবস্থিত নুক শহরে। নুক গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী। শহর বললে হয়তো বেশ বড় কিছু মনে হতে পারে, নুক ততটা বড় নয়। কতটা বড় বা ছোট, সেটা বোঝা যাবে একটা উদাহরণ দিলে—পুরো শহরে ট্রাফিক সিগন্যাল আছে মাত্র তিনটি!
এখানেই কিছুদিন কাটল আমাদের। তারপর চলে গেলাম ইলুলিসাতে। ইলুলিসাত পশ্চিমে গ্রিনল্যান্ডের শহর। সুমেরু বৃত্তের ভেতরে এর অবস্থান। এই শহরেই থাকলাম কিছুদিন।
কখনো তিমির আনাগোনা দেখলাম, কখনো সাগরের তীর ঘেঁষে খাড়া পাহাড়ের পাদদেশে মাছ ধরা দেখলাম, সেই মাছ নিয়ে যাওয়া হলো অন্য এক দ্বীপে। এখানে কয়েক মাসের জন্য পর্যটকদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে রেস্তোরাঁ। তরতাজা মাছের স্বাদ নিতে ভুল করিনি।
প্রতিদিন এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে ঘুরে রাতে বোটে করে ফিরে আসি আমাদের হোটেল যেখানে, সেই দ্বীপে। অবশ্য রাত বলাটা ভুল হলো! সময়ের দিক থেকে তখন অনেক রাত। কিন্তু সূর্য দিগন্ত ছুঁয়ে আলো ছড়াচ্ছে সারাটা সময়। গ্রিনল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডে শীতে যেমন সূর্যোদয় হয় না, গ্রীষ্মে তেমন সূর্য ডোবে না।
আমরা উত্তর মেরুর যেসব ছবি দেখতে পাই, তার বেশির ভাগই ইলুলিসাত বা তার আশপাশের এলাকার। গ্রিনল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা বলেই বেশির ভাগ পর্যটক ভিড় করেন এই শহরে। এখানেই আছে বিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল হিমবাহ। শত শত বছরের জমে থাকা বরফ নেমে আসে সাগরের বুকে। তৈরি হয় আইসবার্গ বা হিমশৈল। ধীরে ধীরে চলতে থাকে মূল সাগরের দিকে।
খুব ছোট ছোট ট্যুরিস্ট বোটগুলো ঘুরে বেড়ায় আইসবার্গের কাছ ঘেঁষে। আমাদের ইচ্ছা ছিল একটা প্রাইভেট বোট নিয়ে নিজেদের মতো করে এই অপার্থিব দৃশ্য দেখব। লাল কাঠের তৈরি বোট ভাড়া করলাম। ১৯৭০-এর দিকে ডেনমার্কে তৈরি কাঠের বোট প্রথমে পুলিশ ব্যবহার করত, এখন পর্যটকদের প্রমোদভ্রমণে কাজে লাগানো হচ্ছে। আধুনিক লোহালক্কড়ের বোটের চেয়ে এই পুরোনো বোটে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা একদম আলাদা। ছোট বোটটা সাগরের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে, আশপাশে ভাসছে বরফ। খোলা বোটে আমার স্ত্রী শারমীন ও আমি।
আমার সঙ্গে ড্রোন ছিল। কখনো দূরত্ব রেখে, কখনো ওপর থেকে নিজেদের ছবি ও ভিডিও করলাম। আমরা শতাধিক দেশ ভ্রমণ করেছি। এই বোটেই দুজনের সবচেয়ে সুন্দর কিছু ছবি আর ভিডিও ফুটেজ পেয়ে গেলাম।