
১০০ দেশ ঘুরে ফেললেন মালিহা ফাইরুজ। শুধু ঘুরেই বেড়ান না, নিয়মিত ভ্রমণ–অভিজ্ঞতাও লেখেন। তাঁর ব্লগ পোস্ট পড়ে ভ্রমণের রসদও পান অনেকে। বাংলাদেশি তরুণ পর্যটকের সাক্ষাৎকার নিলেন সজীব মিয়া
এখন কোথায় আছেন?
জার্মানিতে। বার্লিন আমার কর্মস্থল। বছরের শুরুতে একটা এনজিওতে যোগ দিয়ে এখানে এসেছি। অন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে এর আগে সুদান ও সিয়েরা লিওনে কাজ করেছি।
জার্মানি থেকেই কি ১০০তম দেশ ভ্রমণে গেলেন?
জি, জার্মানি থেকেই পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম। বেনিন, টোগো ঘুরে ঘানায় গিয়েছি। আমার ভ্রমণতালিকার শততম দেশ ঘানা। ২৫ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলাম। দারুণ একটা দেশ। মানুষগুলো আরও দারুণ। এই সামান্য সময়ে যেমন মানুষের সঙ্গে মিশেছি, তেমনি দেশটার ঐতিহাসিক স্থান, জলপ্রপাত, জাতীয় উদ্যানে গিয়েছি। জেনেছি ইতিহাস।
শততম দেশ হিসেবে ঘানাকে কেন বেছে নিলেন?
দীর্ঘদিন চেষ্টা করছিলাম ঘানায় যাব। যাওয়া হয়ে ওঠেনি। দেশটা ঐতিহাসিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ। ওদের খাবার, প্রকৃতিও অনন্য। শততম দেশ হিসেবে তাই ঘানাকেই বেছে নিয়েছি। আরেকটা ছোট কারণ হলো, মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ। ভ্রমণ–গন্তব্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোকে অনুসরণ করি। তারা যেসব গন্তব্যের কথা বলে, সেসব জায়গায় আমরা যেতে চাই। কিন্তু এসব গণমাধ্যম ইউরোপ, আমেরিকা আর কানাডার বিভিন্ন জায়গা যতটা চমৎকারভাবে উপস্থাপন করে, আফ্রিকা সম্পর্কে ততটা করে না। আফ্রিকার বিভিন্ন গন্তব্য সম্পর্কে গৎবাঁধা কিছু তথ্য দেয়। নিউকলোনিয়াল এই ধারণাটা আমি ভাঙতে চাই। মানুষকে অনুধাবন করাতে চাই, আফ্রিকায় এমন সুন্দর সুন্দর ডেস্টিনেশন আছে, যেগুলোতে আমাদের অবশ্যই যাওয়া উচিত।
আপনার ভ্রমণজীবনের শুরুর কথা যদি বলতেন?
আমার ঘোরাঘুরি জীবনের শুরু ছয় বছর বয়সে। মা–বাবা ঘুরতে ভালোবাসেন। তাঁদের সঙ্গেই শুরুটা। মনে আছে, আমরা সেবার ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্কটল্যান্ড ঘুরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। সেই প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। ছোট থেকেই মা–বাবা আমার মধ্যে ‘অভিজ্ঞতা অনেক মূল্যবান’ এই বোধ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
আপনি কেন ভ্রমণ করেন?
ওই যে বললাম, অভিজ্ঞতা। আমি সব সময় অভিজ্ঞতা নিতে পছন্দ করি। বেশির ভাগ সময় আমি একাকী ভ্রমণ করি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শহরের গল্প জানি। প্রতিটি দেশে গিয়ে মানুষের গল্প, মানুষের জীবন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। আসলে মানুষ বড় বিচিত্র। একেকজন মানুষের গল্প জানলে মনে হয় আমাদের সমস্যাগুলো কত ছোট, আর পৃথিবীটা কত বড়। আমরা কত বৈচিত্রের মধ্যে বসবাস করি, চাইলেই কতটা পজিটিভিটি (ইতিবাচকতা) নিয়ে আমরা থাকতে পারি।
আমার ভাবনার জগৎটা এভাবে দিনে দিনে পরিবর্তিত হয়েছে। আমি এখন ভাবি, আমার পৃথিবীটা অনেক বড়—আমি শুধু ঢাকার মানুষ নই, আমি শুধু আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নই, আমার কর্মস্থলের নই। ভ্রমণ আমাকে এটা শিখিয়েছে।
আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন...
আমার জন্ম ১৯৯১ সালে, ঢাকায়। মা জাতিসংঘের একটি সংস্থায় কাজ করেন। বাবা ব্যবসায়ী। বাংলাদেশে ও নেদারল্যান্ডসে আমার স্কুলজীবন কেটেছে। ঢাকায় সানিডেইল স্কুলে পড়েছি। কলেজজীবন কেটেছে লেসোথোর মাচাবেং ইন্টারন্যাশনাল কলেজে। আইনে স্নাতক করেছি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হাল ও নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে। হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাকশন বিষয়ে মাস্টার্স করেছি জার্মানি, আয়ারল্যান্ড ও পোল্যান্ডের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শুরুতে মা-বাবা আমার অনেক ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছেন। পরে ভ্রমণের কথা মাথায় রেখেই পড়াশোনা ও কর্মস্থল নির্বাচন করেছি।
কেপ ভার্দে ভ্রমণ নিয়ে আপনার একটা ব্লগ পোস্ট পড়েছিলাম...
‘মালিহা অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’–এ (মালিহার ব্লগসাইট) লেখাটা আছে। আমার জীবনের ভীতিকর আর কষ্টের অভিজ্ঞতা হয়েছে কেপ ভার্দে গিয়ে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক হিসেবে ভ্রমণ করা যে কত কঠিন, সেটা কেপ ভার্দে গিয়ে বুঝেছি। আমি সেনেগাল থেকে ওখানে পৌঁছাই। চার দিন থাকার পরিকল্পনা ছিল। হোটেল বুকিং করা ছিল। কেপ ভার্দে থেকে ফেরার বিমানের টিকিট কাটা ছিল। কিন্তু তারপরও আমাকে বিমানবন্দরে আটকায়। যাবতীয় কাগজপত্র থাকার পরও জিজ্ঞাসাবাদের নামে হেনস্তা করে। হাজতে রাখে দীর্ঘ সময়। পরে আমার মায়ের মাধ্যমে জাতিসংঘের স্থানীয় অফিসের হস্তক্ষেপে ছাড়া পাই। এরপর দীর্ঘদিন আমি ট্রমার মধ্যে ছিলাম।
আপনার প্রিয় দেশ কোনটি?
একটা দেশের কথা বললে, তুরস্ক। তুরস্কে আমি আটবার গিয়েছি। আলাদা একটা মুগ্ধতা কাজ করে।
আর বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ তো আমার জন্মভূমি। সেটা তো আলাদা করে বলার দরকার নেই। সিলেট, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার, কুমিল্লা, টাঙ্গাইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় মায়ের সঙ্গে গিয়েছি। তবে আমার স্মৃতিতে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এখনো উজ্জ্বল। আমার তখন সম্ভবত ১১ বছর বয়স। মা–বাবার সঙ্গে একবার হালুয়াঘাটে গিয়েছিলাম। এক গারো পরিবারের অতিথি হয়ে ছিলাম। গারো পাহাড় আর স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তা আমার মনে স্থায়ী আসন করে আছে।
ভ্রমণ নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা বলুন...
দুনিয়ার সব কটি দেশই ঘুরে দেখতে চাই। কত দিনে পারব জানি না। পেশাগত কাজের ফাঁকে সময় করতে হয়। জার্মানিতে থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ করা বেশ সহজ। এখানে থাকতে থাকতেই নতুন বেশ কিছু দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।