হাতির মল থেকে তৈরি হয়েছে নোটবুকের কাগজ
হাতির মল থেকে তৈরি হয়েছে নোটবুকের কাগজ

হাতির মল থেকে কাগজ, দেখে বেশ বিস্মিতই হলাম

একটু ভিন্ন টেক্সচারের নোটবুকগুলো দেখতে সুন্দর। কৌতূহল থেকে একটা হাতে তুলে নিলাম। কাগজে হালকা আঁশের ছাপ। ট্যাগে চোখ পড়তেই বিস্মিত হলাম—এই নোটবুকের কাগজ নাকি হাতির মল থেকে তৈরি!

শ্রীলঙ্কার গল ফোর্টের পাথুরে দেয়ালে বসে দূর দিগন্তে মিশে যাওয়া নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। পুরোনো সেই দেয়ালে একের পর এক এসে আছড়ে পড়ছে ভারত মহাসাগরের ঢেউ—কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল। বাতাসে লবণাক্ত সোঁদা গন্ধ, সঙ্গে হালকা রোদ আর সমুদ্রের গর্জন—সব মিলিয়ে যেন এক মায়াবী আবেশ। সময় যে কেটে যাচ্ছে, বুঝতেই পারিনি।
হঠাৎই বন্ধুদের ডাক, ‘এই, আর কতক্ষণ! চল, খেয়ে নিই।’ বাস্তবে ফিরতে হলো। ফোর্টের ভেতরেই সমুদ্রের ধারে ছোট্ট, ছিমছাম একটি রেস্তোরাঁ। কাঠের টেবিল-চেয়ার, দেয়ালে পুরোনো ছবি আর জানালার বাইরে অবিরাম নীল জল—সবকিছুতেই একধরনের পুরোনো দিনের আবহ। স্থানীয় খাবারের গন্ধে ক্ষুধাও যেন হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। দ্রুতই অর্ডার দিয়ে গল্প করতে করতে দুপুরের খাবার সেরে নিলাম।
ফোর্টের ভেতরেই যে ভবনের দ্বিতলে আমরা খেলাম, তারই নিচতলায় আছে স্যুভেনিরের দোকান। ছোট্ট হলেও বেশ আকর্ষণীয়—নানা রঙের হস্তশিল্প। ভাবলাম, একটু ঢুঁ মেরে যাই।

ভেতরে ঢুকতেই যেন অন্য এক জগৎ। চারপাশে কাঠ, কাপড় আর প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি কত জিনিস—হাতে তৈরি মুখোশ, ছোট ছোট ভাস্কর্য, গৃহসজ্জার সামগ্রী আর নানা ধরনের অলংকার। দোকানের ভেতরে হালকা কাঠের গন্ধ, সঙ্গে নরম আলো একটা উষ্ণ, শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।
ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎই এক কোণে চোখ আটকে গেল। সেখানে থরে থরে সাজানো নোটবই আর পেনসিল। একটু ভিন্ন টেক্সচারের নোটবুকগুলো দেখতে সুন্দর। কৌতূহল থেকে একটা হাতে তুলে নিলাম। কাগজে হালকা আঁশের ছাপ। ট্যাগে চোখ পড়তেই বিস্মিত হলাম—এই নোটবুকের কাগজ নাকি হাতির মল থেকে তৈরি!
দোকানে কথা বলে জানলাম, মূলত হাতির মল পুনর্ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব কাগজের বিকল্প তৈরির লক্ষ্য থেকেই এই শিল্পের সূচনা। বিষয়টা নিয়ে বিস্তারিত জানার আগ্রহ হলো। হোটেলের রুমে ঢুকেই ইন্টারনেট ঘাঁটতে শুরু করলাম।
সেখান থেকেই জানলাম, হাতির মলকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে কাগজ তৈরির এই অভিনব ধারণা প্রথম দেন শ্রীলঙ্কার থুসিতা রানাসিংগে। পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগ দ্রুতই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর কাগজ উৎপাদনে প্রায় ১৫ বিলিয়ন গাছ কাটা হয়। উপরন্তু কাগজ তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ জলাশয়ে মিশে পরিবেশ দূষণ করে। এ চাপ কমাতেই বিকল্পভাবে কাগজ উৎপাদনের চিন্তা।

হাতি সাধারণত কলা গাছ, ঘাস, পাতা ও গাছের বাকল খেয়ে থাকে, যার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই হজম হয় না। ফলে একটি পূর্ণবয়স্ক হাতি প্রতিদিন ৩০০-৪০০ পাউন্ড মলত্যাগ করে। এই মলের আঁশ বা ফাইবারই কাগজ তৈরির মূল উপাদান। প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে হাতির মল সংগ্রহ করে স্তূপ করা হয়। এরপর জীবাণুনাশক হিসেবে নিমপাতা দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। পরে তা ছেঁকে মেশিনে মণ্ড তৈরি করে রোদে শুকানো হয়। অনেক সময় এই মণ্ডে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগৃহীত রং মেশানো হয়, যেমন বিটরুট বা বিভিন্ন ফুলের পাপড়ি। এরপর প্রয়োজনীয় উপাদান মিশিয়ে তৈরি হয় কাগজ।
আশ্চর্যের বিষয়, এই কাগজে কোনো দুর্গন্ধ বা জীবাণু থাকে না। শুধু কাগজই নয়, এই উপাদান দিয়ে তৈরি হচ্ছে নোটবই, ফটোফ্রেম, শপিং ব্যাগ, পেনসিল, ক্যালেন্ডারসহ নানা গৃহসজ্জার সামগ্রী।
শ্রীলঙ্কার সীমানা পেরিয়ে ৩০টির বেশি দেশে এখন রপ্তানি হচ্ছে এই পণ্য। তৈরি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান, বাড়ছে পর্যটকদেরও আগ্রহ। প্রকৃতির বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে পরিবেশ রক্ষায় এক অনন্য উদাহরণ।
তথ্যসূত্র: অ্যাটলাস অবসকিওরা