কোনো কোনো জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ব্যক্তিগত গল্প, যেখানে প্রথম যাওয়ার দিনটা মনে থাকে আজীবন। বারবার সেখানে ফিরে যেতে চায় মন। প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’র নিয়মিত বিভাগ ‘ফিরে ফিরে যাই’-তে প্রিয় ভ্রমণস্থানের গল্প বলেন নানা ক্ষেত্রের বিখ্যাত ব্যক্তিরা। আজ বলেছেন সংগীত পরিচালক ইমন চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজীব মিয়া

বাংলাদেশে আমার প্রিয় বেড়ানোর জায়গা সুন্দরবন আর বান্দরবান। সবচেয়ে প্রিয় বললে সুন্দরবন।
সুন্দরবনের প্রথম যে বিষয়টি আমার খুব ভালো লাগে সেটা হলো, এর পরিচ্ছন্নতা ও নীরবতা। রাতে আকাশের দিকে তাকালে অগণিত তারা মনে হয় খুব কাছে। চাঁদটাও যেন অনেক বড়। চারপাশে গাছ, নদী—সবকিছুর একটা অদ্ভুত সমন্বয় আছে। সুন্দরবনে এমন একটা নীরবতা আছে, যেটাকে ‘পিনড্রপ সাইলেন্স’ বলা যায়।
আমি সব সময় একটা কথা বলি, সুন্দরবনে গেলে আসলে মানুষ সুন্দরবনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে কখন কোথায় যাওয়া যাবে, সবকিছুর জন্য সুন্দরবনের অনুমতি লাগে। তাই জায়গাটি আমার কাছে খুব রহস্যময়। একটু পরপরই এর রূপ বদলে যায়।
প্রথম গিয়েছিলাম ২০০৫ সালে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ বার যাওয়া হয়েছে। এ বছরও আশা করছি অক্টোবর বা নভেম্বরে যাব।
সুন্দরবনকে ঘিরে অনেক গল্প আছে, অনেক রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতাও আছে। সুন্দরবনে বাঘের মুখোমুখিও হয়েছি কয়েকবার। একবার ডিমের চরে একটি ঘটনা ঘটেছিল।
সেদিন ডিমের চরে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। অন্য সবাই সেখান থেকে চলে গিয়েছিল। আমাদের ব্যক্তিগত লঞ্চ ছিল বলে আমরা আরও কিছুক্ষণ থাকার সিদ্ধান্ত নিই। তখন চাঁদ উঠেছে। এত আলো ছিল যে চারপাশ দিনের মতো মনে হচ্ছিল। আমরা বুঝতেই পারিনি কখন অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। পরে যখন লঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমাদের সঙ্গে থাকা গার্ড বারবার বলছিলেন, ‘ভাই, চলেন, চলেন।’
কিন্তু জায়গাটার প্রকৃতি এত সুন্দর ছিল যে ফিরতে মন চাইছিল না। একপর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নাকে অদ্ভুত একটা গন্ধ পেলাম। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, বাঘের গন্ধ। তখন দ্রুত কয়েকটি ছবি তুললাম। আমার স্ত্রী সামনে ছিলেন, তাঁরও একটি ছবি তুলছিলাম। এরপর চারপাশে কয়েকটি ছবি তুলে দ্রুত লঞ্চের দিকে ফিরে আসি। পরে লঞ্চে গিয়ে ছবি জুম করে দেখলাম, বেশ দূরে একটা অবয়বের মতো কিছু দাঁড়িয়ে আছে। একটু সোজা ধরনের অবয়ব। সবাই নিশ্চিত করল, ওটা বাঘই ছিল।
আমরা মূলত ঘুরতে যাই, তাই আশপাশের অনেক পরিবর্তন হয়তো সেভাবে খেয়াল করি না। তবে একটা পরিবর্তন চোখে পড়েছে, এখন সবাই বাঘ নিয়ে একটু বেশি ভয় পায়। আশপাশে থাকলেও একটা হালকা ভয় কাজ করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আমার চোখে পড়েছে।
জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনে পরিবর্তন তো আছেই। আমরা সিডরের আগে যেমন সুন্দরবন দেখেছি, সিডরের পরের সুন্দরবনের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। যাঁরা নিয়মিত সুন্দরবনে যান, তাঁরা হয়তো আরও ভালো বলতে পারবেন।
সিডরের আগে জঙ্গলটা অনেক সুন্দর ছিল, অনেকটা বাগানের মতো। সিডরের পর জঙ্গলের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অনেক কিছুই ভাঙাচোরা। সুন্দরবনের ওপর দিয়ে তো নিয়মিতই ঝড় যায়। ফলে বনটি সব সময়ই ক্ষতির মধ্যে থাকে।
বিদেশে আমার প্রিয় জায়গা নেপাল। স্রষ্টা আমাকে পৃথিবীর অনেক জায়গায় ঘোরার সুযোগ দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত নেপালই আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমার মনে হয়, একবার গিয়ে নেপালকে বোঝা সম্ভব নয়। আরও যেতে হবে, তারপর হয়তো নেপালের আসল অনুভূতিটা বুঝতে পারব। সুন্দরবনের পর পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত নেপালকেই আমার সবচেয়ে ভালো ‘গুড ভাইব’-এর জায়গা মনে হয়েছে।