ওয়াওজা এন্টারটেইনমেন্ট মিউজিয়াম হলেও এতে আছে নানা ধরনের গেম ও অ্যাক্টিভিটি সেগমেন্ট, যা একে অন্য যেকোনো বিনোদনকেন্দ্র থেকে আলাদা করে তুলেছে।

ধরুন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু আপনার পায়ের নিচের মাটি নিজ থেকেই সরে যাচ্ছে, মনে হতে পারে এ কী করে সম্ভব? এই ভেবে যখন দু কদম যাবেন, ঠিক তখনই নিজেকে আবিষ্কার করলেন চাঁদের মাটিতে।
এখানেই শেষ নয়! আরেকটু সামনে গিয়ে দেখতে পেলেন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হুবহু আরও কয়েকখানা আপনি। কিন্তু তা কীভাবে হয়? মনে হতেই পারে আপনি হয়তো স্বপ্ন দেখছেন, ঘুমটা বুঝি এখনই ভাঙল। কিন্তু না! এটা কোনো স্বপ্ন নয়। এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছে মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থিত সদ্য চালু হওয়া চিত্তবিনোদনকেন্দ্র ওয়াওজা।
ওয়াওজা নিজেকে বলছে বাংলাদেশের প্রথম প্রিমিয়াম ইলুশন ও ইমারসিভ এন্টারটেইনমেন্ট মিউজিয়াম। অপটিক্যাল ইলুশনকে কাজে লাগিয়ে ছোট-বড় সব বয়সীর জন্য সাজানো হয়েছে এই বিনোদনকেন্দ্র। আছে তাদের নিজস্ব ক্যারেক্টার উজি। উদ্বোধনের মাত্র তিন মাসের মাথায় ইতিমধ্যে ওয়াওজা রাজধানীবাসীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বেশ কয়েকজন তরুণের সম্মিলিত উদ্যোগ এই ওয়াওজা। ঘোরাঘুরি কিংবা ব্যবসার কাজে কোনো দেশ ভ্রমণে গেলে প্রথমেই যে কেউ সেখানকার দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখতে চান। এই তরুণদের গল্পও একই। থাইল্যান্ড, নেপালের মতো দেশগুলোতে গিয়ে তাঁরা দেখলেন প্রতিটি দেশেই থ্রিডি আর্ট গ্যালারি কিংবা অপটিক্যাল ইলুশন মিউজিয়াম আছে। তবে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? এমন নানা উদ্যোগ এখন দেশে দেখা গেলেও এই তরুণদের মতে, ওয়াওজা সেসব থেকে আলাদা।
এ ব্যাপারে কথা হচ্ছিল ওয়াওজার ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হৃদয় চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘ওয়াওজা এমন একটি উদ্যোগ, যেখানে দুই-তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের মানুষ এসে উপভোগ করতে পারবে। সবার কথা মাথায় রেখে আমরা পুরো জায়গাটিকে অপটিক্যাল ইলুশন মিউজিয়াম, পারস্পেকটিভ আর্ট এবং গেমিং জোন—এমন বিভিন্ন সেগমেন্টে ভাগ করেছি।’
‘এক্সপেরিয়েন্স দ্য আনরিয়েল’ স্লোগানকে ঘিরে গড়ে ওঠা ওয়াওজাতে আছে নানা আকর্ষণ। তবে কয়েকটির কথা বলতে হয় আলাদা করে।
বোধ হয় এটিই ওয়াওজার মূল আকর্ষণ। পর্দাঘেরা অন্ধকার একটি ঘর। মাঝে লম্বা এক সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গের চারদিকে লাল-নীল আলোর খেলা। সুড়ঙ্গে পা দিলেই মনে হয় নড়ছে পায়ের নিচের মাটি, গোল গোল ঘুরছে পুরো সুড়ঙ্গ।
এভাবেই পার হতে হবে পথ। যেতে হবে সুড়ঙ্গের অন্য পারে। এ যেন অন্য এক জগৎ। অপটিক্যাল ইলুশন আর সঙ্গে আলোছায়ার খেলাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করা হয়েছে ভিন্নধর্মী এই ভর্টেক্স টানেল।
ওয়াওজার আরেক আকর্ষণ এই শ্যাডো ড্যান্স। প্রথমেই বড় স্ক্রিনে বেছে নিতে হবে মাইকেল জ্যাকসন, হাল্কের মতো আপনার পছন্দের ক্যারেক্টার। দেওয়া হবে ৩০ সেকেন্ড সময়।
এই সময়ে আপনার অঙ্গভঙ্গিকে হুবহু অনুকরণ করবে সেই ক্যারেক্টার। তা আবার স্ক্রিনে দেখা যাবে। উদ্যোক্তাদের মতে, এটি ইতিমধ্যে দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ওই যে বলছিলাম চাঁদের মাটিতে নিজেকে আবিষ্কারের কথা, এটিই সেই টিল্ট রুম। কিছুটা বাঁকানো এই ঘরে অবিকল চাঁদে পা রাখার মতো অনুভূতি পাবেন। অভিজ্ঞতাকে আরও বাস্তব করে তুলতে শিগগিরই আনা হবে নভোচারীদের পোশাক, এমনটাই জানিয়েছে ওয়াওজা কর্তৃপক্ষ।
একই ঘরের দুই কোণে দাঁড়ালে একজনকে লাগবে দৈত্যের মতো বড় আর আরেকজনকে লাগবে ছোট—এমনই দৃষ্টিভ্রমের খেলা দেখায় এই অ্যামস রুম। মা–বাবা, ভাই-বোন কিংবা দম্পতি—ছবির জন্য সবার পছন্দ এই ঘর।
এটি এমন এক ঘর যেখানে নিমেষেই আপনি অদৃশ্য হয়ে যাবেন। শুধু খুঁজে পাওয়া যাবে আপনার মুখখানা। এর নাম ক্যামোফ্লাজ রুম। মূলত দেয়ালের মতো হুবহু দেখতে একটি পোশাক আছে এই জাদুর পেছনে, সঙ্গে চোখের ধোঁকা। শুধু তাই নয়, অন্যদিকে তাকালে আয়নার জাদুতে আপনি পরিণত হবেন কয়েক খানায়। এমন অদ্ভুত এক ঘর ক্যামোফ্লাজ রুম।
ওয়াওজার ভেতরে ঢুকলে জায়গায় জায়গায় দেখতে পাবেন নানা ধরনের থ্রিডি এবং পারস্পেকটিভ ওয়াল আর্টস। এগুলোর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা, সাহায্যের জন্য থাকছেন ওয়াওজার কর্মীরা। এই থ্রিডি, পারস্পেকটিভ ওয়াল আর্টসের মধ্যে আপনাকে সবচেয়ে বেশি ধাঁধায় ফেলবে রঙিন এক শহরের দৃশ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে জীবন্ত এক শহর, আপনার সঙ্গেই যা হাঁটছে।
প্রশ্ন আসতে পারে, মিরর মেইজ আর নতুন কী? সত্যি বলতে এখানেও ভিন্নতা এনেছে ওয়াওজা। এই মিরর মেইজে ঢুকলে শত শত আপনার মাঝে তো হারাবেনই, সেই সঙ্গে দেখতে পাবেন বিরাট এক সূর্যমুখীর বাগান। সঙ্গে আলোর খেলা তো আছেই। সব মিলিয়ে অন্য এক জগতে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি দেবে ওয়াওজার মিরর মেইজ।
এই তো গেল অ্যাক্টিভিটির আলাপ। এবার গেমসে আসা যাক। ওয়াওজায় আছে নানা ধরনের ইন্টারঅ্যাকটিভ গেমস। অংশ নিচ্ছে ছোট-বড় সবাই। আছে লাল-নীল ব্লকের খেলা, নাটাই দিয়ে ঘুড়ি ওড়ানোর ভিডিও গেম। এক কথায় আউটডোর থেকে শুরু করে ইনডোর—এক ছাদের নিচেই পাচ্ছেন সব রকম গেমসের অনুভূতি।
ওয়াওজাতে একজনের ঢুকতে গুনতে হবে ৫০০ টাকা, সেই সঙ্গে আছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। প্রতিটি পাসের জন্য সময় থাকে এক ঘণ্টা। এটি মূলত স্লটভিত্তিক টিকিট সিস্টেম। এই এক ঘণ্টায় আপনি যেকোনো অ্যাকটিভিটি ও গেম যতবার ইচ্ছা উপভোগ করতে পারবেন। তবে সিঙ্গেল পাসের পাশাপাশি নানা ধরনের প্যাকেজের ব্যবস্থাও আছে এখানে।
প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকছে ওয়াওজা। মিরপুর ১২-এ অবস্থিত হাজী কুজরাত আলী মোল্লা মার্কেটের ৪র্থ তলায় ওয়াওজার অবস্থান।