নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি
নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি

হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে যে ক্যাম্পাসকে চেনে বাংলাদেশ

লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি শিক্ষার্থী সুমন দে

চোখে দেখা তো দূর, যাঁরা আগে কখনো নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির (এনডিএসইউ) নামও শোনেননি, তাঁদের মনেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ছবি এঁকে দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এখানেই পলিমার রসায়নে পিএইচডি করেছিলেন তিনি। সেই সময়ের কথা লিখেছেন হোটেল গ্রেভার ইনসহ একাধিক বইতে।

যখন বাংলাদেশ ছেড়ে এনডিএসইউ আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন জানতাম, হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাসে পড়তে যাচ্ছি। রওনা দেওয়ার ঠিক আগে এক বন্ধু কথাটা আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছিল। সে জন্যই হয়তো এখানে আসার পর মনে হচ্ছিল, জায়গাটা বুঝি খুব চেনা। এই অনুভূতি সব সময় আমার ভেতরে ছিল, তবে ২০২৪ সালের একটি বিশেষ ঘটনার আগপর্যন্ত এর গভীরতা আমি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারিনি।

সে বছর তারিকুল ইসলাম নামের বাংলাদেশের একজন চিকিৎসক ফার্গো শহরে আসেন। কোনো কনফারেন্স বা পেশাগত প্রয়োজনে নয়, এসেছিলেন কেবল এই ক্যাম্পাসটি দেখতে, কারণ এখানে একসময় হুমায়ূন আহমেদ থেকেছেন, পড়াশোনা করেছেন।

ডা. তারিকুল আমার অ্যাপার্টমেন্টেই উঠেছিলেন। অনুরোধ করেছিলেন, আমি যেন তাঁকে ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখাই। বিশেষ করে ডানবার হল দেখার আগ্রহ ছিল তাঁর। মনে করিয়ে দিই, হোটেল গ্রেভার ইন বইতে ‘ডানবার হলের জীবন’ নামে একটা অংশ আছে। ডানবার হলের ৫২৯ নম্বর রুমে কোয়ান্টাম মেকানিকসের ক্লাস করার অভিজ্ঞতা লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। ডা. তারিকুলের অনুসন্ধানী চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি কেবল একটা ভবন নয়, স্মৃতির একটা টুকরা খুঁজছেন।

আমরা দুজন এক সকালে হাঁটতে শুরু করলাম। ক্যাম্পাসের একদম মাঝখানে পাথরের তৈরি বাইসন মূর্তিটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। চারপাশটা সুন্দর, সাজানো। মিনার্ড হল, মরিল হল, ল্যাড হল পার হয়ে আমরা সুগিহারা হলের দিকে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু ডা. তারিকুলের মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল এক পুরোনো মানচিত্রে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অফিশিয়াল নির্দেশিকায় নেই। তাই অনেক খুঁজে, আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞেস করেও ডানবার হলের খোঁজ পাইনি আমরা। পরে জেনেছি, ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির দুই শিক্ষকের সঙ্গে ডা. তারিকুল (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) ও লেখক (বাঁ থেকে চতুর্থ)

হুমায়ূন আহমেদ এনডিএসইউতে কেবল পড়াশোনাই করেননি, রসায়ন বিভাগের ডক্টোরাল ছাত্র হিসেবে নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রবাসের জীবন, একাকিত্ব, বন্ধুত্ব, ছোট ছোট হাসি-আনন্দের গল্প কী দারুণভাবেই না তিনি লিখেছেন! কোনো জাঁকজমকপূর্ণ বর্ণনা নয়, টুকরা টুকরা মুহূর্তের মাধ্যমে ফার্গো শহর উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। বিমানবন্দরের কনকনে ঠান্ডা বাতাস, অচেনা কফির তিক্ত স্বাদ, পুরোনো হোটেলে নির্ঘুম রাত, ক্লাসরুমের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অভ্যাসের বশে বারবার খাওয়া সস্তার খাবার আর বেঁচে থাকার লড়াই…কত সহজ করেই না উপস্থাপন করেছেন তিনি! তাঁর সেই আবেগ এত বছর পরও ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমাকে ও ডা. তারিকুলকে।

ফার্গো শহর ঘুরে ঘুরে আমরা মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলাম। রসায়ন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গেও কথা হলো। ‘হুমায়ূন আহমেদ’ নামটা তাঁরা আবছাভাবে মনে করতে পারলেন। এই নামে কেউ একজন ছিল, এটা তাঁরা জানেন।

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেমোরিয়াল ইউনিয়নে কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হয়। আমরা মূলত সেখানকার দেয়ালে টাঙানো বোর্ডে হুমায়ূন আহমেদের নাম খুঁজছিলাম। কিন্তু কোথাও পেলাম না।

হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতির খোঁজে ডা. তারিকুলকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল গ্রেভার ইনেও গিয়েছিলাম। দুঃখের বিষয়, সেই হোটেলও এখন নেই। হোটেলের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক অ্যাপার্টমেন্ট।

ডা. তারিকুলের সঙ্গে এই ‘অভিযানের’ কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম—দ্য স্পেকট্রামে লিখেছি, প্রকাশিত হয়েছে গত ২৮ এপ্রিল। শিরোনাম—দ্য স্টোরি দ্যাট মেড এনডিএসইউ নোন ইন বাংলাদেশ (যে গল্প এনডিএসইউকে বাংলাদেশে পরিচিতি দিয়েছে)। লেখাটি পড়তে পারেন এই লিংকে