সোনা তৈরির গল্প জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরুতে
সোনা তৈরির গল্প জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরুতে

পৃথিবীতে এত সোনা এল কোথা থেকে

আপনার ব্যবহৃত চকচকে অলংকার তৈরি হয়েছে সোনা দিয়ে। তবে এই সোনা কিন্তু পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়নি। পৃথিবীর কোনো গবেষণাগার বা মাটির গভীরের কোনো জাদুকরি কারখানায় সোনা তৈরি করা সম্ভব নয়। আপনার হাতের ওই আংটির প্রতিটি কণা তৈরি হয়েছে আমাদের থেকে কোটি কোটি কিলোমিটার দূরে, মহাকাশের কোনো এক প্রলয়ংকরী ঘটনার মাধ্যমে। সোজা কথায়, সোনা হলো মহাকাশের এক মহাজাগতিক ধ্বংসাবশেষ। কীভাবে মহাবিশ্বের এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে জন্ম নিয়েছিল আজকের এই সোনা, চলুন জানা যাক।

নক্ষত্রের পেটের ভেতর

সোনা তৈরির গল্প জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে মহাবিশ্বের সৃষ্টির শুরুতে। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের পর মহাবিশ্বে মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস ছিল। তখনো সোনার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

মহাবিশ্বের আসল কারখানা হলো নক্ষত্র। আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলো বিশাল এক পারমাণবিক চুল্লি। এদের পেটের ভেতর প্রতিনিয়ত এক মৌল পুড়ে অন্য মৌলে রূপান্তরিত হয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন।

একটি নক্ষত্র তার জীবদ্দশায় হাইড্রোজেন পুড়িয়ে হিলিয়াম বানায়। এরপর হিলিয়াম পুড়িয়ে বানায় কার্বন ও অক্সিজেন। এভাবে ধীরে ধীরে ভারী মৌল তৈরি করতে থাকে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার একটা সীমা আছে। নক্ষত্রের এই সাধারণ ফিউশন প্রক্রিয়াটি লোহা পর্যন্ত এসে থেমে যায়। মানে ফিউশন প্রক্রিয়ায় লোহার পর আর কোনো মৌল বানাতে পারে না।

কারণ, লোহা তৈরি করতে নক্ষত্রকে শক্তি খরচ করতে হয়, কিন্তু লোহা ফিউশন করে নতুন শক্তি দেয় না। ফলে লোহা তৈরি হওয়ার পর নক্ষত্রের ভেতরের জ্বালানি তৈরির খেলা বন্ধ হয়ে যায়। আর সোনা লোহার চেয়ে অনেক অনেক বেশি ভারী ও জটিল একটি মৌল। তাই সাধারণ কোনো নক্ষত্রের পক্ষে সোনা তৈরি করা অসম্ভব। গ্রহের পক্ষে তো সম্ভবই নয়। তাহলে সোনা এল কোথা থেকে?

নক্ষত্রের মৃত্যু ও সোনার জন্ম

বিজ্ঞানীরা আগে মনে করতেন, সুপারনোভা বিস্ফোরণ হলেই সোনা তৈরি হয়

বিজ্ঞানীরা আগে মনে করতেন, সুপারনোভা বিস্ফোরণ হলেই সোনা তৈরি হয়। মানে আমাদের সূর্যের চেয়ে অনেক বড় আকারের নক্ষত্রের আয়ু যখন শেষ হয়ে যায়, তখন তার নিজস্ব মহাকর্ষ বলের চাপে নক্ষত্র নিজের ভেতরেই চুপসে যেতে থাকে।

এই চুপসে যাওয়ার শেষ ধাপে ঘটে এক বিকট বিস্ফোরণ, যাকে আমরা বলি সুপারনোভা। এই বিস্ফোরণের সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য এত বিপুল পরিমাণ শক্তি ও তাপ উৎপন্ন হয়, যা অকল্পনীয়।

এই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের সময় নিউট্রন ক্যাপচার নামে একটি ঘটনা ঘটে। সহজ করে বললে, লোহার পরমাণুগুলোর ওপর কোটি কোটি নিউট্রন কণা বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়ে। এত দ্রুত এবং এত বেশি নিউট্রন লোহার নিউক্লিয়াসে ঢুকে পড়ে যে সেসব আর সাধারণ লোহা থাকে না, ভারী মৌলে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর এভাবেই তৈরি হয় সোনা, প্লাটিনাম ও ইউরেনিয়ামের মতো ভারী ধাতুগুলো।

সুপারনোভা বিস্ফোরণের ফলে এই সোনা মহাকাশের বুকে ধূলিকণার মতো ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু সুপারনোভা দিয়ে মহাবিশ্বের এত বিপুল পরিমাণ সোনার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। এর পেছনে নিশ্চয়ই আরও বড় কোনো ঘটনা আছে।

মহাজাগতিক রত্নভান্ডার

সোনা বানানোর ক্ষমতা মানুষের নেই

এখানেই গল্পে প্রবেশ করে মহাকাশের এক অদ্ভুত নিউট্রন স্টার। যখন কোনো বিশাল নক্ষত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায়, তখন তার কেন্দ্রটি টিকে থাকে। এই কেন্দ্র অবিশ্বাস্য রকমের ঘন। এতটাই ঘন যে এই নিউট্রন স্টারের এক চামচ উপাদানের ওজন হতে পারে কয়েক শ কোটি টন!

মহাকাশে মাঝেমধ্যে দুটি নিউট্রন স্টার একে অপরের চারপাশে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় এরা একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ে। এ ঘটনাকে বলা হয় কিলোনোভা। সম্প্রতি একটি কিলোনোভার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা।

দুটি নিউট্রন স্টারের এই সংঘর্ষ হলো মহাবিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনা। এই সংঘর্ষের সময় তাপমাত্রা ও চাপ এত বেড়ে যায় যে সেখানে মুহূর্তের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে র‍্যাপিড নিউট্রন ক্যাপচার প্রসেস ঘটতে থাকে।

দুটি ঘন মৃত নক্ষত্র একে অপরকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে আর সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ছিটকে বের হচ্ছে বিশুদ্ধ সোনা, প্লাটিনাম আর রুপা!

বিজ্ঞানীদের মতে, এই কিলোনোভা বিস্ফোরণই হলো মহাবিশ্বের আসল সোনার খনি। একটিমাত্র সংঘর্ষ থেকে যে পরিমাণ সোনা তৈরি হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, তা দিয়ে আমাদের পৃথিবীর মতো কয়েকটা গ্রহ তৈরি করা সম্ভব!

পৃথিবীর বুকে সোনা এল কীভাবে

প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে, মহাকাশ থেকে কোটি কোটি গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল; এসব গ্রহাণু বয়ে এনেছিল প্রচুর পরিমাণে সোনা

এখন প্রশ্ন হলো, মহাকাশে তৈরি হওয়া সেই সোনা আমাদের পৃথিবীর মাটির নিচে এল কীভাবে? ৪৫০ কোটি বছর আগে যখন আমাদের পৃথিবী তৈরি হচ্ছিল, তখন এটি ছিল একটি গলিত আগুনের গোলক। মহাকাশে ভেসে বেড়ানো ধূলিকণা, পাথর ও গ্যাস জমে পৃথিবী তৈরি হয়েছিল। সেই ধূলিকণার মধ্যে ছিল সুপারনোভা বা নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ থেকে আসা সোনার কণাগুলোও।

কিন্তু পৃথিবী যখন গলিত অবস্থায় ছিল, তখন লোহা ও সোনার মতো ভারী ধাতুগুলো মাধ্যাকর্ষণের টানে ডুবে পৃথিবীর একদম কেন্দ্রে চলে গিয়েছিল। মানে পৃথিবীর আসল সোনার ভান্ডার কিন্তু আমাদের পায়ের অনেক নিচে, কেন্দ্রের কাছাকাছি। সেখানে আমরা কখনো পৌঁছাতেই পারব না।

তাহলে আমরা খনিতে বা মাটির ওপরের স্তরে যে সোনা পাই, সেটা এল কোথা থেকে? এখানেই আসে ‘লেট হেভি বোম্বার্ডমেন্ট’ নামে একটি তত্ত্ব।

পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে শক্ত হওয়ার অনেক পরে, প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে, মহাকাশ থেকে কোটি কোটি গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়েছিল। এসব গ্রহাণু বয়ে এনেছিল প্রচুর পরিমাণে সোনা।

যেহেতু তখন পৃথিবীর ওপরের মাটি শক্ত হয়ে গিয়েছিল, তাই উল্কাপিণ্ডের সেই সোনা আর কেন্দ্রে ডুবে যেতে পারেনি। সেসব পৃথিবীর ওপরের স্তরেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে গেছে। আজ আমরা খনি খুঁড়ে যে সোনা বের করি, তা আদতে সেই কোটি কোটি বছর আগে আকাশ থেকে পড়া উল্কাপিণ্ডের উপহার।

বিজ্ঞানের চোখে প্রমাণ

এতক্ষণ যা যা বললাম, তা শুধুই গল্প নাকি প্রমাণিত সত্য? ২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়েছেন। লাইগো ও ভার্গো ডিটেক্টর ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্ত করেন। এ ঘটনার নাম দেওয়া হয় ‘GW170817’।

এরপর হাবল স্পেস টেলিস্কোপসহ পৃথিবীর বাঘা বাঘা টেলিস্কোপ ওই সংঘর্ষের দিকে নজর দেয়। তারা ওই বিস্ফোরণের আলো বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়, সেখানে প্রচুর পরিমাণে ভারী মৌল, বিশেষ করে সোনা এবং প্লাটিনাম তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেছেন, ওই একটি সংঘর্ষে যে পরিমাণ সোনা তৈরি হয়েছিল, তার ভর আমাদের পৃথিবীর ভরের কয়েক গুণ!

শেষ কথা

সোনাকে শুধু দামি অলংকার হিসেবে দেখবেন না, ওটা একটি মৃত নক্ষত্রের স্মৃতি

প্রাচীনকালের রসায়নবিদেরা গবেষণাগারে লোহা বা সিসাকে সোনা বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা জানতেন না, সোনা বানানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, এই ক্ষমতা কেবল মহাবিশ্বের প্রলয়ংকরী নক্ষত্রগুলোরই আছে।

তাই আপনার পরিহিত সোনাকে শুধু দামি অলংকার হিসেবে দেখবেন না, ওটা একটি মৃত নক্ষত্রের স্মৃতি। এটি শতকোটি বছর আগে মহাকাশের কোনো এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে জন্ম নিয়েছিল, তারপর উল্কাপিণ্ডের পিঠে চড়ে পাড়ি দিয়েছে কোটি কোটি মাইল পথ। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় পেয়েছে পৃথিবীতে। সেখান থেকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে উঠে এসেছে আপনার হাতে! অদ্ভুত না?

সূত্র: নাসা, লাইগো ল্যাব, স্পেস ডটকম ও বিবিসি সায়েন্স ফোকাস