আজ ১৯ জুলাই। ১১ বছর ধরে এই দিনটির প্রতি অপরিমেয় অভিমান নিয়ে দিনযাপন করছি। সেদিন রাতের একটি অতি অপ্রত্যাশিত খবর এলোমেলো করে দিয়েছিল সমগ্র চিন্তার জগৎ। উন্মাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম। তরুণ মনে এত বড় আঘাত এর আগে আর আসেনি। আজকাল মাঝেমধ্যে মনে প্রশ্ন জাগে, কেন এমন অঝোরে কেঁদেছিলাম? কেন এত আপন আর একান্ত নিজের কিছু হারিয়েছি বলে মনে হচ্ছিল? বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ইহলোক ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলে? হিমু, শুভ্র, মিসির আলীর নতুন কোনো গল্প আর পাব না বলে! একজন লেখক বা তাঁর সৃষ্টি করা চরিত্রের প্রতি অপরিসীম মায়া আর আবেগের কারণই-বা কী? এসব প্রশ্নের উত্তরে অনেক কথাই মনে আসে। সব তো বলার সুযোগ নেই, তাই বরং কিশোরকালের গল্পে চলে যাই।
সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের পাঠাগারে ১৭ টাকা ফি দিয়ে সদস্য হই। ‘তিন গোয়েন্দা’র বাইরে প্রথম উপন্যাস পড়ার সুযোগ দিল এই সদস্য পদ। প্রথম দিকে শরৎ (চট্টোপাধ্যায়) পড়তাম বেশি। একদিন কিছু না বুঝেই হুমায়ূন আহমেদের ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’ হাতে তুলে নিলাম। পড়া শুরু করেই বুঝলাম, এত দিন যা যা পড়েছি, তার থেকে এই বই একদম আলাদা। অন্য রকম আনন্দ নিয়ে পড়া শুরু করলেও শেষ হতে হতে অদ্ভুত বিষণ্নতায় ডুবে গেলাম। ঘোর নিয়ে পরদিন তুললাম আরেকটা বই, নাম ‘অন্যভুবন’। ‘অন্যভুবন’ আমার কিশোরী মন, চিন্তার জগৎ সবকিছুকে ভয়াবহ রকমের আন্দোলিত করে।
সেই শুরু। হুমায়ূন আহমেদের বই পেলেই গোগ্রাসে গিলি। প্রতি বইমেলার আগে লিস্টি করি—এবার প্রিয় লেখকের কী কী বই আসবে, কোনটা নিজে কিনব, কোনটা বান্ধবী কিনবে, তারপর ভাগাভাগি করে পড়ব। হিমু-শুভ্র-মিসির আলী ছাড়াও ‘লীলাবতী’, ‘অপেক্ষা’, ‘রুমালী’, ‘মধ্যাহ্ন’-এর মতো অনেক অসাধারণ বই আমরা পড়ার সুযোগ পেয়েছি। প্রতিটা বই, প্রতিটি চরিত্র যেভাবে আকুল করেছে পাঠক হৃদয়, তা কবে কে পেরেছে আর! শুধু তাঁর বই-ই তো নয়, তার লেখা পড়তে পড়তে আরও কত নতুন নতুন লেখক আর বইয়ের নাম জানতে পেরেছি! অনলাইন দুনিয়ায় অনেকটা লিংক দিয়ে আরও পড়ুনের মতো, পড়েছি তাঁদের বইও। এই যে এত এত লেখকের উপন্যাস পড়েছি জীবনে, তার কৃতিত্বও তো অনেকাংশেই হুমায়ূন আহমেদের।
শুধু বইয়ের জগৎই তো নয়, এই পৃথিবীকেও তো ভিন্নরূপে দেখতে শিখিয়েছেন তিনি। তাঁর লেখায় ভরা পূর্ণিমার বর্ণনা পড়েই তো চাঁদ দেখতে শিখেছিলাম, সেই মোহ আজও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। দুঃখ, দুর্দশা আর হতাশায় থেকেও বেঁচে থাকাকে যে উদ্যাপন করা যায়, চারপাশের ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সৌন্দর্য আর সম্পর্কের যে মহত্ত্ব, তা শিখেছি তো এই জাদুকরের কাছেই। এই যে জীবনে খুব অল্প চাওয়া, অল্পতে আনন্দ খুঁজে পাওয়া, সহজ-সরল জীবনযাপনের আগ্রহের মূলে হয়তো আছে তাঁর লেখা থেকে প্রাপ্ত অনুপ্রেরণা।
এত এত প্রভাবিত হয়েছি যাঁর কাছ থেকে, তাঁকে দেখার তীব্র বাসনা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় পণ করেছিলাম, যেভাবেই হোক মিসির আলীর (প্রিয় লেখককে তখন আমার তাই মনে হতো) সঙ্গে দেখা করতেই হবে। ভাগ্য তাঁকে আজীবন আমার কাছে স্বপ্নের চরিত্র করে রাখবেন বলেই হয়তো তাঁর চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া-আসা বেড়ে গেল ওই সময়। যখন বারবার পত্রিকায় লিখতে থাকল তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন, বিশ্বাস হয়নি। মনে হয়েছে ঠিক সুস্থ হয়ে ফিরবেন তিনি, ঠিক তাঁর ম্যাজিকের মতো। অথচ সব আশা ভেঙেচুরে দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো রাতের খবরে ব্রেকিং নিউজে জানিয়েছিল তাঁর চলে যাওয়ার খবর। হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম সারা রাত। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের টিভি রুমে হুমায়ূন আহমেদ-সংক্রান্ত খবর দেখতে দেখতে কয়েকটা দিন কেটে গেল। তারপর একদিন জানতে পারলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া সম্ভব!
শহীদ মিনারে লাখো ভক্তের জনস্রোতে আমিও ছিলাম। সবাই গিয়েছিল শ্রদ্ধা জানাতে, আর আমি গিয়েছিলাম দেখা করতে! সেই মহাযাত্রার ভিড়ে মিশে তাঁর কফিনের সামনে এক দণ্ড দাঁড়ানোর অবকাশ ছিল না। কফিন পার হয়ে যাওয়ার পথে মনে মনে শুধু বলেছিলাম ‘আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন।’ কয়েক ফোঁটা জলও গড়িয়েছিল চোখ থেকে। সেই শেষবার। আর কাঁদিনি প্রিয় লেখকের জন্য। শুধু অসীম শূন্যতা নিয়ে ফিরেছিলাম।
প্রকৃতি নাকি শূন্যস্থান পছন্দ না, অথচ এই ক্ষেত্রে প্রকৃতি যেন আত্মভোলা। প্রকৃতিও বোধ হয় চায় হুমায়ূন আহমেদের শূন্যতা থাকুক। তাই তো আজও আবেগ-অনুভূতির কেন্দ্রস্থলে রয়ে গেছেন তিনি। এখনো একই আগ্রহ নিয়ে বারবার পড়া বইগুলো আবার পড়ি। প্রতিবারই আনন্দ-বেদনায় আচ্ছন্ন করে শেষ হয় সেসব গল্প। তিনি চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি তো কখনো পুরোনো হওয়ার না। তরতাজা সেসব লেখা যুগে যুগে আলোকিত করবে বাংলা সাহিত্যের পাঠককে। কারণ, বাঙালি পাঠকের আবেগ-অনুভূতিকে এত আপন আর যত্নে লিপিবদ্ধ করেছেন আর কে!