১০ সেপ্টেম্বর ফেসবুক লাইভে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সামনে বক্তব্য দিয়েছেন অধ্যাপক ফিলিপ কটলার। তিনি আধুনিক মার্কেটিংয়ের জনক হিসেবে পরিচিত। এআই ফর মার্কেটার্স সামিট শীর্ষক এ আয়োজনটির সঞ্চালনায় ছিলেন আইডিয়ান কনসাল্টিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক অনুপম মল্লিক। ৯৫ বছর বয়সেও যে ফিলিপ কটলার এ সময়ের বিপণন নিয়ে কতখানি অবগত, বোঝা যায় তাঁর বক্তব্যে। কী বলেছেন তিনি?

বিপণনগুরু ফিলিপ কটলার মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই হলো এমন এক শক্তিশালী মাধ্যম, যা বর্তমান যুগের বিপণন বা মার্কেটিং টুলগুলোকে সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে। প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাজের ধরন বদলে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, যে যারা এই নতুন প্রযুক্তি সঠিকভাবে এবং সময়মতো গ্রহণ করতে পারবে, তারা প্রথাগতভাবে পরিচালিত অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় প্রতিযোগিতায় অনেক এগিয়ে থাকবে। বাজারেও নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হবে।
আধুনিক বিপণনে এত দিন ইংরেজি ‘পি’ বর্ণ দিয়ে শুরু হয় এমন চারটি শব্দকেই গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রোডাক্ট (পণ্য), প্রাইস (দাম), প্লেস (স্থান) ও প্রমোশন (প্রচারণা)। কিন্তু কটলার বলছেন, এখন আর ৪ পি-ই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে সেবা, শক্তিশালী ব্র্যান্ড এবং সঠিক প্রণোদনা বা ইনসেনটিভের মতো তিনটি নতুন উপাদান যুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ বিপণন মিশ্রণ তৈরি করতে হবে।
ডিজিটাল বিশ্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এআইয়ের প্রভাবে এখন ভোক্তার চিন্তা করার ধরন বা মানসিকতায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। গ্রাহকদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, সব গ্রাহকের মধ্যেই মূলত তিন ধরনের মস্তিষ্ক কাজ করে। অ্যাটেনশন ব্রেন বা মনোযোগের মস্তিষ্ক, সোশ্যাল ব্রেন বা সামাজিক মস্তিষ্ক এবং রিওয়ার্ড ব্রেন বা পুরস্কারের মস্তিষ্ক। আধুনিক মার্কেটারদের সফল হতে হলে ভোক্তাদের এই পরিবর্তিত মানসিকতা এবং স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্সের শৃঙ্খলা সম্পর্কে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।
অধিকাংশ কোম্পানি বর্তমানে কেবল স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের জন্য এবং গ্রাহকের কাছ থেকে শেষ ডলারটি বের করে নেওয়ার জন্য ‘পারফরম্যান্স মার্কেটিংয়ের’ ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করছে। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে। এই ধরনের মার্কেটিং দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না, কারণ এতে প্রায়ই ব্র্যান্ডের মূল আদর্শ লঙ্ঘিত হয়। তাই শুধু তাৎক্ষণিক বিক্রির পেছনে না ছুটে, পারফরম্যান্স মার্কেটিংয়ের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ও সুদৃঢ় ব্র্যান্ড গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে।
সাধারণত কোম্পানিগুলো কেবল ক্রেতার পণ্য আবিষ্কার থেকে শুরু করে লেনদেন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত; অর্থাৎ বায়িং এক্সপেরিয়েন্স বা ক্রয় অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশি গবেষণা চালায়। কিন্তু এআইয়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের এর পরিধি আরও বাড়াতে হবে। গ্রাহক পণ্যটি বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর কীভাবে ব্যবহার করছেন, তাঁর কোনো অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন পড়ছে কি না এবং ব্যবহারের পর তিনি ব্র্যান্ডটির সঙ্গে কতটা যুক্ত থাকছেন, এই ইউসেজ এক্সপেরিয়েন্স বা ব্যবহার অভিজ্ঞতাও সমানভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত।
ঐতিহ্যগতভাবে বিপণন কার্যক্রম নির্দিষ্ট কিছু বয়সের বা শ্রেণির মানুষের ওপর ভিত্তি করে, অর্থাৎ সেগমেন্ট বা ক্লাস্টার আকারে পরিচালনা করা হতো। তবে এআইয়ের যুগে এসে এই ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে। একটি নির্দিষ্ট অংশের (সেগমেন্ট) মানুষও একে অপরের থেকে আলাদা হতে পারে। তাই বর্তমান যুগে মার্কেটিং আরও উন্নত হয়ে একেবারে একক গ্রাহককে লক্ষ্য করে পরিচালিত ‘ওয়ান-অন-ওয়ান মার্কেটিং’ বা ব্যক্তিগতকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রত্যেক গ্রাহকের পছন্দকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এখন চ্যাটবট, অ্যালগরিদম এবং এজেন্টিক এআই নতুন বাস্তবতা। অ্যালগরিদম হলো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম, যা মানুষের ভুলত্রুটি সংশোধন করে নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটি, জেমিনাই ও ক্লডের মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম আজ বিভিন্ন ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
প্রথাগত বিপণন পরিকল্পনাগুলো সাধারণত পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বছরজুড়ে তৈরি করা হতো। কিন্তু এআই আসার পর নিয়ম বদলে গেছে। আগামী দিনের সফল কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং পরিকল্পনা কোনো স্থির বার্ষিক দলিল থাকবে না, বরং তা হবে জীবন্ত দলিল, যা রিয়েল-টাইম বা বাস্তব সময়ের ডেটা অনুযায়ী প্রতিনিয়ত হালনাগাদ হতে থাকবে। ফলে বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলোও দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে।
ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক সফলতা অর্জনের জন্য শুধু এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই চলবে না, এর সঙ্গে শক্তিশালী ব্র্যান্ডের শৃঙ্খলা ও যুগোপযোগী উদ্ভাবন বা ইনোভেশনকে যুক্ত করতে হবে। কারণ, বাজার ও গ্রাহকদের রুচি অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তাই একটি সফল ব্র্যান্ডকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি পণ্যে ও সেবায় ক্রমাগত নতুনত্বের ধারা বজায় রাখতে হবে।