
কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। সেই হিলারি ডাফই সমাবর্তন বক্তা হয়ে হাজির হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে। পড়ুন এই মার্কিন গায়িকা ও অভিনেত্রীর বক্তৃতার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।
অভিনন্দন, স্নাতকেরা! তোমাদের নিষ্ঠা, একাগ্রতা দেখে আমি মুগ্ধ। সত্যি বলতে কিছুটা হিংসাও হচ্ছে। কারণ, আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই। আমি কখনো ক্লাসে বন্ধুদের চিরকুট পাঠাতে পারিনি, আমার কোনো লকার ছিল না। সমাবর্তনের এই গাউন পরার সৌভাগ্যও হয়নি। তাই তোমাদের এই অর্জনের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা। আজকের দিন শুধুই তোমাদের।
প্রিয় অভিভাবকেরা, আপনাদের অভিবাদন। আদরের সন্তানকে এই পৃথিবীর বুকে ছেড়ে দেওয়ার যে সাহস আপনারা দেখিয়েছেন, সেটা প্রশংসার দাবিদার, কারণ কাজটা মোটেও সহজ নয়। প্রিয় শিক্ষকেরা, বছরের পর বছর এমন দারুণ সব ছাত্রছাত্রীকে বাইরের দুনিয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলার অনুভূতি যে কী অসাধারণ হতে পারে, আমি সেটা কেবল কল্পনাই করতে পারি।
সত্যি কথা বলতে, এখানে দাঁড়িয়ে তোমাদের উপদেশ দেওয়াটা বেশ অস্বস্তিকর। কারণ, আমি নিজেই প্রতিদিন টিকে থাকার তরিকা আবিষ্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু অন্যদিক থেকে ভাবলে, আমার এখানে দাঁড়ানোর একটা যৌক্তিকতা অন্তত আছে। অভিজ্ঞতাই তো সবচেয়ে বড় শিক্ষা, যা আমি তোমাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে পারি।
আমি জানি তোমাদের মধ্যে অনেকে তুলনামূলক আগেভাগেই কর্মজীবনে পা রেখেছ, কারণ এটাই নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির নিয়ম। যদি আমার কথা বলি, আমি কাজ শুরু করেছি ৭ বছর বয়সে। ১০ বছর বয়স থেকে অভিনয় শুরু করি। ১৩ বছর বয়সে একটি টিভি শোতে সুযোগ পাই। যখন সফলতার পথগুলো খুলতে শুরু করে, তখন মনে হতে পারে সিঁড়ির একেকটা ধাপ পেরোনোর একমাত্র উপায় হলো ‘হ্যাঁ’ বলা। বছরের পর বছর আমি প্রায় সব কাজকেই হ্যাঁ বলেছি। কারণ ভেবেছিলাম, সুযোগ পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার, এটা হেলায় হারানো ঠিক না। সব সুযোগ লুফে নেওয়া উচিত। যখন কেউ জিজ্ঞেস করত, ‘এরপর কী? এরপরে কী করছ?’ দেওয়ার মতো কোনো উত্তর না থাকলে নিজেকে ব্যর্থ মনে হতো। তাই আমি নিশ্চিত করতে চাইতাম, আমার কাছে যেন সব সময় উত্তর থাকে।
কিন্তু এই পথচলার কোনো একপর্যায়ে, সম্ভবত কোনো একটি বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় অনুভব করলাম, ভালো সুযোগ বা ভালো উপার্জনই যে সব, তা নয়। পৃথিবী আমাকে যা দিচ্ছিল, তা কেবল চোখ বুজে গ্রহণ করতে করতে আমি নিজের কণ্ঠস্বরটাই হারিয়ে ফেলছি। কেবল পরিস্থিতি অনুযায়ী সাড়া দিয়ে যাচ্ছি। নিজেকে জিজ্ঞেস করছিলাম না, আমি আসলে কী চাই। এই উপলব্ধি আমার ভাবনার জগতে একটা আমূল পরিবর্তন এনে দিল। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো—আমি বুঝতে পারছিলাম, আমাকে ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাস বদলাতে হবে।
তাই গান থেকে কিছুটা বিরতি নিলাম। এমন নয় যে আমি জানতাম না যে ঠিক কেমন অ্যালবাম তৈরি করতে চাই, গানের মাধ্যমে কী গল্প বলতে চাই। কিন্তু আমি কাজটা আরও মন থেকে করতে চাচ্ছিলাম। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েই এক পা পিছিয়ে এলাম। দিক পরিবর্তন করলাম। নিজেকে নতুন করে গড়ে তুললাম। নিজের শক্তি ও অনুপ্রেরণা ফিরিয়ে আনলাম।
বুঝতে পেরেছিলাম ‘না’ বলা মানেই প্রত্যাখ্যান না। বরং দিক বদলানো। যেন আমি যখন সত্যিই প্রস্তুত হব, তখন নিজেকে সেই দিকে নিয়ে যেতে পারি, যেখানে আদতে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। আমি নিজের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজের হাতে ফিরে পেয়েছিলাম। জীবনের গল্প নতুন করে লিখেছিলাম। নিজের ওপর নিজের কর্তৃত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। আমি কৃতজ্ঞ যে সেই বিরতি নেওয়ার সামর্থ্য আমার ছিল।
নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়ার একটা চমৎকার দিক হলো, পেছনে ফিরে দেখা যায়, কতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। কত দূর এসেছি, কী কী বাধা জয় করেছি, সেসব দিকে তাকিয়ে নিজের প্রশংসা করতে ভুলো না। তারপর সামনে তাকিয়ে দেখতে পারো, আরও কত কি আসার বাকি।
হ্যাঁ, আজ থেকে ৫ বছর পর তুমি যে চাকরিটা করবে, এখনো হয়তো সে চাকরির অস্তিত্বই নেই। যে শিল্পে বা ক্ষেত্রে তুমি প্রবেশ করতে যাচ্ছ, তার গতিপথ হয়তো এ মুহূর্তে নতুন করে লেখা হচ্ছে। তাই বলে খবরের কাগজের শিরোনাম দেখে ভয় পেয়ো না। তোমার কাজ হয়তো বদলে যেতে পারে, কিন্তু তুমি মানুষ হিসেবে কেমন, সেটা বদলানোর দরকার নেই। মনে রেখো তুমি নিজেই নিজের পথ তৈরি করবে, গাড়ির চালকের আসনে তুমিই আছ।
একটা কথা আমি আমার সন্তানদের সব সময় বলি—তুমি তোমার নিজের চরিত্রেই হাজির হও, কারণ অন্য সব চরিত্র কেউ না কেউ নিয়ে নিয়েছে। (সংক্ষেপিত)