বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাখির আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ২৫টি ছবি দেখুন

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাখির আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ‘বার্ড ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’-এর ২০২৬ সালের আসরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জমা পড়েছিল ২৪ হাজারের বেশি ছবি। সেরা ছবিগুলোয় কখনো ধরা পড়েছে পাখির আচরণের দুর্লভ মুহূর্ত, কখনো প্রকৃতির সঙ্গে তাদের অসাধারণ মেলবন্ধন। আবার কোনো ছবিতে উঠে এসেছে পাখি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও। এবারের সেরা কিছু ছবি নিয়ে এই ছবির গল্প। ছবিগুলো নেওয়া হয়েছে বার্ড ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ারের ওয়েবসাইট থেকে

সেরা পোর্ট্রেট (সোনা): রেডিয়্যান্ট

আলোকচিত্রী: টমাস ডেলিবার্তো, যুক্তরাষ্ট্র
আলোকচিত্রী: টমাস ডেলিবার্তো, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহয় প্রজনন মৌসুমে একটি পুরুষ গ্রেটার সেজ-গ্রাউস। পেছনের ছায়ায় ঢাকা সেজব্রাশের পাহাড়ের ওপর তখন সূর্য উঠছিল। সেই আলো পাখিটির লেজের পালকে এমনভাবে পড়েছিল যে মনে হচ্ছিল, পালকগুলো যেন আলো ছড়াচ্ছে।

সেরা পোর্ট্রেট (রুপা): সানসেট পাফিন

আলোকচিত্রী: ভলকার ভিডমান, জার্মানি

যুক্তরাজ্যের স্কোমার দ্বীপে একটি আটলান্টিক পাফিন। ভোরের শুরু ও সন্ধ্যার শেষভাগে পাফিনের ছবি তুলতে কয়েক দিন স্কোমারে কাটিয়েছেন আলোকচিত্রী। এ সময় দিনের পর্যটকেরা দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতেন, ফলে পাখিগুলোকে প্রায় নিজের মতো করে পাওয়া যেত।

সেরা পোর্ট্রেট (ব্রোঞ্জ): টাইনি ড্যান্সার

আলোকচিত্রী: ডেভিড স্টো, অস্ট্রেলিয়া

ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম পাপুয়ার রেইনফরেস্টে একটি পুরুষ ওয়েস্টার্ন প্যারোটিয়া। স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করতে নাচছে।

পাখির উড়ান (সোনা): আই-টু-আই উইথ আ শর্ট-ইয়ার্ড আউল

আলোকচিত্রী: ইভান শোগ্রেন, সুইডেন

কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ফ্রেজার নদীর বদ্বীপের লবণাক্ত জলাভূমির ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটি শর্ট-ইয়ার্ড আউল। সন্ধ্যা নামার সময় সেখানে পাঁচটি প্যাঁচাকে শিকার করতে দেখেছিলেন আলোকচিত্রী। তাঁর ভাষায়, সেটি ছিল এক জাদুকরি সন্ধ্যা।

পাখির উড়ান (রুপা): প্যাটার্নস

আলোকচিত্রী: অ্যালেক্স পানসিয়ার, নেদারল্যান্ডস

নরওয়ের হর্নোয়া দ্বীপের আকাশে উড়ছে একঝাঁক গিলেমট। ছবিটি প্রথম দেখলে মনে হয় যেন কোনো পাজল। চলমান বিশৃঙ্খলার মধ্যেও আশ্চর্য এক শৃঙ্খলা।

পাখির উড়ান (ব্রোঞ্জ): লর্ড অব দ্য রিডবেডস

আলোকচিত্রী: পাত্রিক কুর্চ, পোল্যান্ড

পোল্যান্ডের ড্যাব্রোভা গুরনিচার একটি জলাভূমিতে এক রিডবেড থেকে আরেক রিডবেডে উড়ে যাচ্ছে একটি বিটার্ন। সূর্য ওঠার সময় পানিতে ভাসমান একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে ছবিটি তোলা হয়েছে।

সাদা-কালো (সোনা): অ্যান অস্ট্রিচ হরাইজন

আলোকচিত্রী: রাহুল সচদেব, ভারত

কেনিয়ার অ্যাম্বোসেলির শুকনো হ্রদের তলদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একটি উটপাখি। সাদা-কালো ছবিতে শুষ্ক ভূদৃশ্যটি ধুলা আর উত্তাপের মধ্যে পাখিটির একাকী পথচলাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

সাদা-কালো (রুপা): গ্রাস ট্রি

আলোকচিত্রী: রাউল স্লেটার, অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের পোমোনায় প্রতিবেশীর বাড়ির ফটকের পাশে আছে একটি গ্রাস ট্রি, যাকে জ্যান্থোরিয়া নামেও ডাকা হয়। ধীরে বেড়ে ওঠা এই রসাল উদ্ভিদ অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয়। এর প্রায় ৩০টি প্রজাতি আছে। গাছে বড় ফুলের মঞ্জরি হয়, যাতে প্রচুর মধু থাকে। সেই মধুর টানে এখানে একটি ছোট ওয়াটলবার্ডের পাশাপাশি প্রজাপতি ও স্থানীয় মৌমাছিও এসেছে।

সাদা-কালো (ব্রোঞ্জ): প্রমেনেড প্রিনিং

আলোকচিত্রী: জুলিয়ান তেরেরোস-মার্তিন, স্পেন

তাসমানিয়ার একটি লিটল পেঙ্গুইন রাতে এই পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। কাছের ঝোপঝাড়ের নিরাপদ জায়গায় তার ওর বাসা।

পাখির আচরণ (সোনা): আই অ্যাম কিপিং এভরিওয়ান ড্রাই

আলোকচিত্রী: ডোনাল্ড চিন, অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার পার্থের একটি বনে বৃষ্টি পড়ছে। গাছের বাকল ও ছায়ার সঙ্গে প্রায় মিশে থাকা একটি টনি ফ্রগমাউথ ডানা মেলেছে। দেখে মনে হচ্ছে, বৃষ্টির ফোঁটা থেকে সে যেন তার ভাইবোনদের আড়াল করে রাখছে।

পাখির আচরণ (রুপা): স্প্রেড ঈগল

আলোকচিত্রী: মার্ক কার্ডেইন, যুক্তরাজ্য

কানাডার পশ্চিম উপকূলের গ্রেট বিয়ার রেইনফরেস্টে সেদিনও টানা বৃষ্টি হচ্ছিল। বনের ভেতর একটি জলপথ দিয়ে ধীরে ধীরে জোডিয়াক নৌকায় যাচ্ছিলেন আলোকচিত্রী। হঠাৎ দেখতে পান ডানা মেলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি চমৎকার তরুণ বল্ড ঈগল।

পাখির আচরণ (ব্রোঞ্জ): ক্লেপ্টোপ্যারাসিটিজম

আলোকচিত্রী: বার্নহার্ড শুবার্ট, অস্ট্রিয়া

মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের তুলুমের সমুদ্রসৈকতে এক জেলের সমান্তরালে অবস্থান নিয়েছিলেন আলোকচিত্রী। জেলের ফেলে দেওয়া মাছ বারবার আকাশে পাখিদের মধ্যে লড়াই বাধাচ্ছিল। কয়েক মিটার ওপর দিয়ে উড়ছিল ফ্রিগেটবার্ডগুলো। জেলে যখনই একটি মাছ ওপরে ছুড়ে দিচ্ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে আকাশে শুরু হচ্ছিল হইচই।

সংরক্ষণ (একক ছবি, সোনা): নট আ গুড ডে ফিশিং

আলোকচিত্রী: কেন্ট স্টুয়ার্ট, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির ওয়ারেন কাউন্টির একটি স্থানীয় পুকুরে ছবিটি তোলা। সেখানে মানুষের প্রবেশ সীমিত। তাই ভুট্টাখেতের পেছন দিক দিয়ে হেঁটে পুকুরে পৌঁছেছিলেন আলোকচিত্রী। বুক পর্যন্ত ওঠা পানির পোশাক পরে কাদামাটির একটি জায়গার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানেই দেখা মেলে গ্রেট ব্লু হেরনের।

সংরক্ষণ (একক ছবি, রুপা): বার্ডস ইন দ্য রেড

আলোকচিত্রী: ইয়ান বিগঁ, ফ্রান্স

কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনের কেন্দ্রস্থলে বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে ইয়েলো বিটার্নসহ বিভিন্ন জলচর পাখি। পাখি শিকার ও বাণিজ্য নিয়ে করা এক অনুসন্ধানের সময় ছবিটি তোলা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশটির বিভিন্ন জায়গায় বন্য পাখি অবৈধভাবে বিক্রি করা হচ্ছে।

সংরক্ষণ (একক ছবি, ব্রোঞ্জ): ডিসকার্ডেড এভিডেন্স

আলোকচিত্রী: লুকা এরেবলে, ইতালি

মাল্টায় একটি মিসরীয় শকুন। পরিযায়ী পাখি শিকার দেশটির আইনে নিয়ন্ত্রিত হলেও এর লঙ্ঘন এখনো ব্যাপক। প্রতি মৌসুমে কয়েক ডজন, কখনো কয়েক শ সংরক্ষিত ও বিরল পাখি অবৈধভাবে মারা হয়। শিকারিদের অন্যতম লক্ষ্য থাকে বিভিন্ন শিকারি পাখিও।

সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি (সোনা): সানড্যান্স

আলোকচিত্রী: আসমুন্ড কেইলেন, নরওয়ে

নরওয়ের অসলোয় গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম দিনে বাতাস কেটে উড়ে যাচ্ছে একটি কমন সুইফট। নীল রঙের একটি গাড়ির চকচকে ছাদে প্রতিফলিত পাখিটির একাধিক এক্সপোজার ক্যামেরার ভেতরেই তৈরি করে ছবিটি তোলা হয়েছে।

সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি (রুপা): টার্বুলেন্স

আলোকচিত্রী: হেনলি স্পিয়ার্স, যুক্তরাজ্য

স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ডে একটি নর্দার্ন গ্যানেট। শিকার ধরতে ডজন ডজন গ্যানেট পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছিল। প্রতিবার পাখিগুলো পানির পৃষ্ঠ ভেদ করার সঙ্গে সঙ্গে কালো পানিতে তৈরি হচ্ছিল নতুন নতুন ঢেউ। মুহূর্তের জন্য দৃশ্যমানতা হারিয়ে যাচ্ছিল আর পানির নিচে পাখিগুলো বুদবুদের ধারা তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছিল চোখের পলকে।

সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গি (ব্রোঞ্জ): গ্রিব ইমপ্রেশন

আলোকচিত্রী: জুলিয়ান লোজিনস্কি, পোল্যান্ড

গ্রেট ক্রেস্টেড গ্রিবের এই ছবি পোল্যান্ডের ব্রোদনিকা লেক অঞ্চলে কায়াক থেকে তোলা। যেন আঁকা ছবি! বিশেষ কৌশল খাটিয়ে ছবিটি তোলার পাশাপাশি কায়াক সামলানোও বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।

শহুরে পাখি (সোনা): অল্টার ইগো

আলোকচিত্রী: জিয়ানলুকা দামিয়ানি, ইতালি

ইতালির রোমে উঁচু ভবনগুলো হলুদ পায়ের গাঙচিলের জন্য অনেকটা সমুদ্রের পাথুরে খাড়াইয়ের মতো। এসব ভবনে তারা বাসা বাঁধে, বিশ্রাম নেয় এবং শহরের মধ্যে টিকে থাকার জন্য নিরাপদ জায়গা খুঁজে পায়। এমনই একটি ছোট উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল একটি ভবনের ছাদে। সেখানেই পাখিটির ছবি তোলা হয়েছে।

শহুরে পাখি (রুপা): ডিসেপশনস হোপ

আলোকচিত্রী: রোমাঁ বারা, ফ্রান্স

অ্যান্টার্কটিকার ডিসেপশন দ্বীপের ইতিহাস বেশ অস্থির। একসময় এখানে সিল শিকারের ব্যবসা ছিল, পরে তিমি শিকারের কেন্দ্র হয়। এরপর একের পর এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু এখন প্রকৃতি আবার জায়গাটি নিজের মতো করে নিয়েছে। ছবিতে একটি মরচে ধরা তিমির চর্বি সংরক্ষণের গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি জেন্টু পেঙ্গুইন, যেন তারা পাহারা দিচ্ছে।

শহুরে পাখি (ব্রোঞ্জ): দ্য উইন্ডো অব ড্রিমস

আলোকচিত্রী: জুলিয়ান ফের্নান্দেস কিলেস, স্পেন

স্পেনের এলিন শহরে একটি ব্লু রক থ্রাশ। একটি পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতর থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত ক্যামেরায় পাখিটির ছবি তোলা হয়েছে। পাখিটি যখন বাড়ির ভেতরে ঢুকছিল বা বের হচ্ছিল, তখন সন্ধ্যা; জানালা গলে পুরোনো কাঠের ওপর পড়েছে সন্ধ্যার আলো। আর তাতে তৈরি হয়েছে উষ্ণ আলো–ছায়া।

তরুণ পাখি আলোকচিত্রী (সামগ্রিক বিজয়ী ও ১৫–১৭ বছর বিভাগে সোনা): মুনলিট নাইট

আলোকচিত্রী: পারহাম পুরআহমাদ, যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস গ্যাটোসে নিজের বাড়ির পাশের একটি পার্কে দুটি গ্রেট হর্নড আউলকে বাসা বাঁধতে দেখেছিল পারহাম। সন্ধ্যায় তাদের ভালো একটি পোর্ট্রেট তোলার আশা নিয়ে বেরিয়েছিল সে। কিন্তু দিগন্তে পূর্ণিমার চাঁদ উঠতে দেখে তাঁর পরিকল্পনা বদলে যায়। একটি প্যাঁচা উড়ে গিয়ে পাইনগাছে বসে। দ্রুত জায়গা বদলে চাঁদের সামনে পাখিটিকে রেখে ছবিটি তোলে সে।

বার্ড ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার ২০২৬ (সামগ্রিক বিজয়ী ও পাখি ও পরিবেশ বিভাগে সোনা): সানবল রকেট

আলোকচিত্রী: হেনলি স্পিয়ার্স, যুক্তরাজ্য

স্কটল্যান্ডের শেটল্যান্ডে পানির ভেতর ডুব দেওয়ার সময় মনে হচ্ছে যেন সূর্যের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে একটি নর্দার্ন গ্যানেট। এই সুন্দর পাখিগুলোর জীবন যেন দুই রকম। বাসায় তারা ছানাকে যত্নে বড় করে। আবার সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কও দৃঢ় করে—দুটি পাখি ঠোঁট আকাশের দিকে তুলে একে অপরের সাদা ঘাড় আলতো করে স্পর্শ করে।

পাখি ও পরিবেশ (রুপা): ম্যাজেস্টি

আলোকচিত্রী: আসমুন্ড কেইলেন, নরওয়ে

চাঁদের সামনে কালো ছায়ার মতো ভেসে যাচ্ছে একটি রাজকীয় গোল্ডেন ইগল। তার মেলে ধরা ডানা রুপালি আলোয় আকাশজুড়ে শক্তিশালী এক অবয়ব তৈরি করেছে।

পাখি ও পরিবেশ (ব্রোঞ্জ): ব্যাক টু ফিশিং

আলোকচিত্রী: রোমাঁ বারা, ফ্রান্স

অ্যান্টার্কটিকার অপূর্ব পোর্ট শারকো উপসাগরে সাঁতার কাটছিলেন আলোকচিত্রী। হঠাৎ একঝাঁক জেন্টু পেঙ্গুইন এসে হাজির হয়। মাছ ও ক্রিল খেতে তারা সেদিকে যাচ্ছিল।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান