ছাদবাগানের জন্য ভালো মাটি কোথায় পাবেন

পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে অনেকেই এখন ছাদবাগানে সবজির চাষ করছেন
ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

ইট–পাথরের নগরী ঢাকায় ছাদবাগান এখন আর নিছক শখের জায়গায় আটকে নেই। এ বাগান পরিবারের পুষ্টিচাহিদা যেমন পূরণ করে, ঘটায় প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, তেমনি মনেও আনে প্রশান্তি। আর তাই ছাদ বা বারান্দাবাগানে ভালো মানের মাটির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঢাকায় ভালো মাটি কোথায় পাওয়া যায়, অনেকেরই তা অজানা। বাগানের জন্য আদর্শ মাটি কোথায় পাবেন, চলুন জেনে নিই তারই খোঁজ।

ভোলার উমর ফারুক ঢাকায় নার্সারি ব্যবসা করছেন দীর্ঘ ২৫ বছর। বনানীতে দুটি ও দিয়াবাড়িতে তিনটি, ঢাকার তাঁর পাঁচটি নার্সারি রয়েছে। জানালেন, ছাদবাগান কিংবা বারান্দাবাগানের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হলো বেলে দোআঁশ মাটি। বালু, পলি ও কাদার সুষম মিশ্রণে তৈরি বলে চাষাবাদের জন্য এই মাটি সবচেয়ে উপযোগী। বিশেষ করে টব, ড্রাম বা সবজি বেডে লাগানো গাছে বেলে দোআঁশ মাটি শিকড়, পানি ও বাতাসের ভারসাম্য বজায় রাখে।

ছাদবাগান থেকে তোলা অর্গানিক শাকসবজি

বেলে দোআঁশ মাটিতে সাধারণত বালুকণার পরিমাণ থাকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, পলিকণা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ, কাদাকণা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এবং হিউমাস ও অন্যান্য জৈব পদার্থ থাকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ। এই জৈব অংশই হলো মাটির প্রাণ। এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায়, উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে সহজ করে তোলে গাছের পুষ্টি গ্রহণ।
অন্য দিকে বালুকণা মাটিকে হালকা রাখে এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দিতে সাহায্য করে। ফলে ছাদবাগানে পানি জমে শিকড় পচে যাওয়ার যে আশঙ্কা থাকে, তা অনেকটাই কমে আসে। কাদাকণা মাটিকে প্রয়োজনীয় দৃঢ় রাখে এবং গাছের শিকড়ের জন্য দরকারি আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে সাহায্য করে। সামান্য জৈব সার যোগ করে এই মাটি ব্যবহার করলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়, রোগবালাই কম হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে মাটির গুণাগুণ বজায় থাকে।

শহরের বেশির ভাগ বড় নার্সারিতেই এখন ছাদবাগানের উপযোগী মাটি পাওয়া যায়

কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন

শহরের বেশির ভাগ বড় নার্সারিতেই এখন রেডি পটিং মিক্সড বা ছাদবাগানের উপযোগী প্রস্তুত মাটি পাওয়া যায়। নতুন বাজার, ১০০ ফিট, দিয়াবাড়ি, আগারগাঁও, মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকা, গাবতলী, বেড়িবাঁধ, খিলগাঁও, বাসাবো, আফতাবনগর, আমিনবাজার, যাত্রাবাড়ী ও ডেমরা অঞ্চলে থাকা নার্সারি থেকে মাটি সংগ্রহ করতে পারেন। এসব জায়গা থেকে কেনা মাটির সুবিধা হলো জৈব সার হিসেবে গোবর ও বালুসহযোগে এই মাটি অনেকটাই প্রস্তুত থাকে, সরাসরি টব বা ড্রামে ব্যবহার করা যায়।

দরদাম কেমন

মাটি সাধারণত সিএফটি বা ঘন ফুট হিসেবে বিক্রি হয়। নার্সারিতে ব্যবহৃত সিমেন্টের বস্তায় মাটি ভর্তি করে বিক্রি করে। প্রতি বস্তায় এক থেকে দেড় সিএফটি মাটি থাকে। খুচরা হিসেবে প্রতি বস্তা মাটির দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। অল্প কিছু টব বা ছোট বাগানের জন্য খুচরা দামে অল্প পরিমাণ মাটি কিনলে খরচ তুলনামূলক বেশি পড়ে।
বড় মাপের বাগান করার সময় বেশি পরিমাণ মাটির প্রয়োজন পড়ে। সে ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী ট্রাক ভর্তি করে ২০০ থেকে ৪০০ সিএফটি খোলা মাটি নিতে পারেন। তাতে মাটির দামটাও কমে আসবে প্রায় অর্ধেকে। দাম পড়বে প্রতি সিএফটি ২৮ থেকে ৩০ টাকা।

মাটি ভালো হলে সবজির ফলনও ভালো হয়

প্যাকেটজাত রেডি মিক্সড মাটি

ঢাকায় ছাদ ও বারান্দাবাগানের জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠছে রেডি মিক্সড মাটি। এসব মাটিতে দোআঁশ মাটি, জৈব সার, ভার্মিকম্পোস্ট, ট্রাইকোডার্মা, বাগানমাটি, কোকো পিট, কোক ডাস্ট বা নারকেল আঁশের গুঁড়া, বালু, হাড়ের গুঁড়া, খইল ও অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে দেওয়া থাকে। ফলে টবে বা ড্রামে সরাসরি ব্যবহার করা যায়।

বাজারে মিলে এমন কিছু রেডি মিক্সড মাটির মধ্যে এসিআই অরণ্যের ৫ কেজির রেডি মিক্সড মাটির প্যাকেট পাবেন ১৮৯ টাকা দরে। ১০ কেজির প্যাকেটের দাম ৩৪৫ টাকা আর ২৫ কেজি প্যাকেটের দাম ৫২৫ টাকা। পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক গার্ডেনিং ব্র্যান্ড মাই গার্ডেন বিডির রেডি মিক্সড মাটি পাবেন ৫ কেজির প্যাকেট ১৭৫ টাকা, ১০ কেজির ৩২০ টাকা এবং ২৫ কেজির প্যাকেট ৫৯৫ টাকায়। ছাদবাগানে নতুন শুরু করা বা অল্পসংখ্যক টবের জন্য এই ছোট প্যাকেটগুলোই বেশি জনপ্রিয়।

বড় পরিসরে বাগান করার জন্য তারা ৫০ কেজির ব্যাগও সরবরাহ করে, যার দাম ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। সিরাজ টেকের রেডি মিক্সড মাটির দাম প্রতি কেজি ২৮ টাকা। ছোট বারান্দা বা কয়েকটি টবের জন্য ৫ বা ১০ কেজির প্যাকেট যথেষ্ট। বড় ছাদবাগান বা একাধিক ড্রাম ও সবজি বেডের জন্য ২৫ কেজি বা ৫০ কেজির বড় প্যাকেট তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। কারণ, বড় প্যাকেটে প্রতি কেজি মাটির দাম কম পড়ে।

একসঙ্গে অনেক মাটি না কিনে আগে অল্প পরিমাণে এনে পরীক্ষা করে নিন

কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ছাদবাগানিদের জন্য মাটি কেনা ও মাটি–সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ দিলেন এফ এইচ নার্সারির মালিক উমর ফারুক—
১. একসঙ্গে অনেক মাটি না কিনে আগে অল্প পরিমাণ এনে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। এই অল্প পরিমাণ মাটিতেই যখন গাছের বৃদ্ধি আশানুরূপ দেখবেন, ফুল–ফল আসতে দেখবেন, তখন মাটির স্বাস্থ্য ভালো বলে ধরে নিতে পারেন।
২. মাটির স্বাস্থ্য নিশ্চিত হতে চাইলে ছোট্ট একটা পরীক্ষাও করতে পারেন। সদ্য আনা মাটিতে কিছু শর্ষে বা মেথির বীজ ছিটিয়ে বুনতে পারেন। তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হলে মাটির মান ভালো বলেই ধরে নিতে পারবেন।
৩. বছরে অন্তত একবার পুরোনো মাটির সঙ্গে নতুন কম্পোস্ট বা জৈব সার যোগ করলে মাটির উর্বরতা বজায় থাকে।
৪. ছাদে অতিরিক্ত ওজন এড়াতে টবের মাটির সঙ্গে নারকেলের খোসা থেকে তৈরি কোকো পিট বা কোক ডাস্ট যোগ করতে পারেন।
সবশেষ বলা যায়, ছাদবাগানের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে গুণগত মানসম্পন্ন মাটির ওপর। ভালো মাটি মানেই গাছে রোগবালাই কম। সুস্থ–সবল গাছে তখন ফলনও হয় বেশি।