
ক্লাস আছে, পরীক্ষা আছে, অ্যাসাইনমেন্টের চাপও আছে। এসবের মধ্যেই দুই বছর ধরে একটা খ্যাপাটে স্বপ্ন মাথায় নিয়ে ঘুরেছিলেন একদল শিক্ষার্থী—‘একটা সিনেমা বানাব।’ কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁদের ছিল না, মাথার ওপর ছিল না বড় কোনো প্রযোজকের হাত। খরচাপাতি সব সামলাতে হয়েছে নিজেদের পকেট থেকে, টিউশনির আয় থেকে। শেষ পর্যন্ত সেই সিনেমা মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে। নাম অন্যপাতা। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই ছবিটি মুক্তি পাবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ৪০ জনের বেশি শিক্ষার্থী যুক্ত ছিলেন এই মহাযজ্ঞে। শুরুটা হয়েছিল মাত্র ছয়জনকে নিয়ে। কাজ যত এগিয়েছে, যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও শিক্ষার্থী।
এসজেএ প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মো. শাহেজাহান এ্যানি। তিনি চুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থী। করোনার সময় একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানিয়ে আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজার পরামর্শে পরে সিনেমা নিয়ে পড়াশোনাও করেছেন। এরপর যখন মনে হয়েছে তিনি প্রস্তুত, তখন হাত দিয়েছেন অন্যপাতায়।
এ্যানি বলেন, ‘অন্যপাতার অভিজ্ঞতা অনেকটাই ম্যাজিক্যাল। এটা বানাতে গিয়ে আবিষ্কার করেছি, আমার চারপাশের প্রতিটি মানুষ কতটা সুন্দর, সাহায্যের জন্য কতটা উদ্গ্রীব। ৬ জনের টিম আস্তে আস্তে ৪০ জনের হয়েছে। তাই মাঝে মাঝে আমরা বলি, অন্যপাতাকে আমরা বানাইনি, অন্যপাতা আমাদের বানিয়েছে।’
সিনেমা নির্মাণ করতে গিয়ে বেশ কিছু কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে নির্মাতাদের। ছবি তো শুধু বানালেই হয় না, আছে আরও নানা আনুষ্ঠানিকতা। সিনেমার অন্যতম প্রযোজক অংকন দে অনিমেষ বলছিলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, আমরা অনেক কিছুই চিনতাম না, জানতাম না। এফডিসি একটা বিশাল ধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল।’ প্রক্রিয়াটা কেমন, কার কাছে যেতে হবে, কী করতে হবে, কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারছিলেন না তাঁরা। সেই সুযোগে কেউ কেউ ঠকানোর চেষ্টা করেছেন। অনিমেষের হিসাবে, কয়েক জায়গায় প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় লাখ টাকা খুইয়েছেন তাঁরা।
ছবির বাজেট নিয়ে এখনই কিছু বলতে চাইলেন না অনিমেষ। কত খরচ হয়েছে নির্মাতারা নিজেরাও জানেন না। তার ওপর অঙ্কটা এখনো বাড়ছে। তবে তাঁদের দাবি, কারিগরি দিকে তাঁরা ছাড় দেননি। ছবিটা পর্দায় দেখলেই দর্শক বুঝবেন, এটা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
প্রযোজনার পাশাপাশি সহকারী পরিচালকের দায়িত্বও সামলেছেন অনিমেষ। এর বাইরে আরও একটা ভূমিকা জুটেছে তাঁর—অভিনয়। অথচ শুরুতে পরিকল্পনা ছিল সামান্যই। কথা ছিল দুই-একটা সংলাপ দেবেন; ব্যস, এটুকুই। কিন্তু পুরো সিনেমা যখন দাঁড়িয়ে গেল, দেখা গেল ছোট্ট সেই চরিত্রটা আর ছোট নেই। নিজের একটা আলাদা গল্প, একটা নিজস্ব পথ তৈরি করে নিয়েছে সে।
আরেক প্রযোজক বুয়েটের আবতাহী শামস বলেন, ‘অন্যপাতা আমার কাছে শুধু একটা সিনেমা না, একটা স্বপ্নকে সত্যি করার গল্প। প্রযোজক হিসেবে প্রথম কাজ, তাই প্রতিটা মুহূর্তেই নতুন কিছু শিখেছি, ভুল করেছি, আবার ঠিক করার চেষ্টা করেছি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, এতগুলো মানুষের বিশ্বাস আর পরিশ্রমকে একটা গল্পের মধ্যে একসঙ্গে দেখতে পারা। আমরা আমাদের জায়গা থেকে যতটা ভালোবাসা দিয়ে কাজটা করতে পেরেছি, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সিনেমাটা দর্শকের, তাঁরা কীভাবে নেন, সেটাই দেখার অপেক্ষা।’
সিনেমার প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়া শাকিল ও প্রত্যাশা পাল। শাকিলের এটাই প্রথম সিনেমা। তিনি বলেন, ‘প্রথমবার সিনেমায় কাজ করছি, তাই অনেক বেশি উৎসাহী ছিলাম।’ পড়ালেখার ফাঁকেই দুই বছর ধরে একটু একটু করে সময় বের করে সিনেমাটা বানিয়েছেন নির্মাতারা। তবে শাকিলকে তাঁর চরিত্র ধরে রাখতে হয়েছে এই পুরোটা সময়। এটাই তাঁর কাছে বড় অভিজ্ঞতা।
প্রত্যাশা জানালেন, গল্পটা প্রথমবার শোনার সময়ই তাঁর মনে হয়েছিল, এই সিনেমায় অভিনয় করাটা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাঁর ভাষ্য, ‘অন্যপাতা অনেক দূর যাবে।’
কালার গ্রেডিং ও পোস্ট–প্রোডাকশন পুরোটা একা হাতে সামলেছেন চুয়েটের তানভীর জানি। চিত্রগ্রাহক হিসেবে ছিলেন ইব্রাহিম বিন আনছারী। সিনেমার ছয়টি মৌলিক গানের সংগীত পরিচালক ফাহরিয়াজ তাসজিম। আবহসংগীত করেছেন আইনান। কাস্টিং ডিরেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নোমান আহমেদ। সঙ্গে কারিগরি ও শিল্পনির্দেশনায় ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দ্র নীল। থ্রি–ডি অ্যানিমেশন আর্টিস্ট হিসেবে দলে ছিলেন বুয়েটের মাশরাফি ইসলাম। আর হ্যাঁ, লাইন প্রডিউসারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যে সামলেছে, তাঁর নাম সুদীপ্ত পাল। সুদীপ্ত সবে এসএসসি পেরিয়েছে।
এত কষ্ট করে যে গল্পটা শিক্ষার্থীরা পর্দায় এনেছেন, সেটা আদতে তাঁদের নিজেদেরই গল্প। পরিবারের প্রত্যাশার চাপ, টাকার টানাটানি, ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়া, পরিচয়ের সংকট, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধ, এসব নিয়েই সিনেমার গল্প। পরিচালক এ্যানি বলেন, ‘এটা কোনো এক্সপেরিমেন্টাল গল্প না। এটা আমাদের সবার গল্প, প্রতিদিনের যুদ্ধের গল্প। দর্শক বড় পর্দায় নিজেকে খুঁজে পাবেন।’
অনিমেষের মতে, ‘ভর্তিযুদ্ধর মধ্য দিয়ে সবাই যায়, কিন্তু এ নিয়ে খুব বেশি কাজ হয় না। এই গল্পটা কোথাও না কোথাও বলা খুব দরকার ছিল। বাংলাদেশের দর্শক এই সিনেমায় একটা দুষ্টু-মিষ্টি কমেডির ছোঁয়া পাবেন, যা সচরাচর দেখা যায় না।’
১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের সিনেমায় আছে ছয়টি মৌলিক গান ও আবহসংগীত। চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের নানা নৈসর্গিক ও প্রাকৃতিক দৃশ্য উঠে এসেছে ক্যামেরায়। নির্মাতারা বলছেন, গল্প ও সংলাপে আজকের তরুণ প্রজন্মের ভাষা আর জীবনযাপনের ছাপ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে ১০ থেকে ১২টি হলে সিনেমাটি মুক্তি দেওয়ার ইচ্ছা আছে নির্মাতাদের। ইতিবাচক সাড়া পেলে হলের সংখ্যা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবেন তাঁরা। এরই মধ্যে ছবিটি সেন্সরে জমা পড়েছে। প্রকাশ পেয়েছে সিনেমার পোস্টার, মোশন ভিডিও, গান। শিগগিরই মুক্তি পাবে ট্রেলার।