উল্লাপাড়া রেলস্টেশনের স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স
উল্লাপাড়া রেলস্টেশনের স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স

উল্লাপাড়া রেলস্টেশনের বইয়ের দোকানটি কি ফিরে পাবে সেই জৌলুশ?

আশির দশকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া রেলস্টেশনটি ছিল সাজানো-গোছানো ও পরিষ্কার। আমরা চার বন্ধু—বিপ্লব, হাকিম, মাসুদ ও আমি—মাঝেমধ্যেই স্টেশনে গিয়ে বসতাম। চা-শিঙাড়া খেতে খেতে দেখতাম মানুষের ছোটাছুটি, প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাওয়া রেলগাড়ি। সন্ধ্যা হলে যার যার বাড়ি ফিরতাম।

রেলস্টেশনের সামনেই টংঘরের মতো ছোট একটি দোকান, বড় বড় হরফে লেখা ‘স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স’। দোকানটি ছোট হলেও সেখানে গল্প, উপন্যাস, মনীষীদের জীবনী, পঞ্জিকা, শিশুতোষ বইসহ কয়েকটি পত্রিকা পাওয়া যেত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকান খোলা থাকত। কেউ কেউ ট্রেন থেকে নেমেই শিশুতোষ বই কিনত, আবার দোকানের দুই পাশের বেঞ্চে বসে অনেকে বিনা পয়সায় পত্রিকা পড়ত। দোকানের মালিক মেছের ভাই ছোটখাটো, সুঠাম দেহের হাসিখুশি মানুষ। তাঁর যেন দম ফেলার সময়ই নেই।

একদিন মেছের ভাই–ই আমাদের দেখে বললেন, ‘তোমরা বই পড়ো না কেন?’

আমরা অবাক। বই তো পড়ি, ক্লাসের বই না পড়ে কি পাস করা যায়! 

আমাদের অবস্থাটা তিনি বুঝলেন। কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুক্ষুধা আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই বইটা পড়বে।’

আমি দ্বিধায় বললাম, ‘আমাদের তো টাকা নেই ভাই, বই কিনব কীভাবে?’

মেছের ভাই হেসে বললেন, ‘টাকা লাগবে না, নিয়ে যাও, পড়ো।’

কিন্তু বইটি কার বাসায় থাকবে, এ নিয়ে আমাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। শেষে লটারি হলো। লটারিতে মাসুদের নাম উঠল। অগত্যা সে-ই বইটি বাড়ি নিয়ে গেল। ঠিক হলো, প্রতিদিন বিকেলে আমরা চারজন একসঙ্গে বসে পড়ব। শর্ষেখেতের আলের পাশে বসে আমরা একেকজন ১০ পৃষ্ঠা করে পড়ে কয়েক দিনে বইটি শেষ করলাম।

বই পড়ে এত আনন্দ পাওয়া যায়, তা আমরা আগে কল্পনাও করিনি। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য মানুষকে কীভাবে অসহায় করে তোলে, জীবনকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়, তা বুঝতে পারলাম। এর পর থেকেই আমরা পাঠক হয়ে উঠলাম। স্টেশনে গেলেই পত্রিকা পড়তাম, উপন্যাস ও গল্পের বই কিনতাম।

৪০ বছর পর আমরা সেই চার বন্ধু আবার রেলস্টেশনে গেলাম স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স আর মেছের ভাইয়ের খোঁজে। দূর থেকেই দেখলাম, দোকানটি এখনো খোলা। মেছের ভাইয়ের তেমন পরিবর্তন হয়নি—চুল পেকে গেছে কিছুটা, তবু যেন বয়স তাঁকে পুরোপুরি স্পর্শ করতে পারেনি।

সালাম দিয়ে বললাম, ‘কেমন আছেন বড় ভাই?’

সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘ভালো।’

আমাদের চিনতে তাঁর একটু সময় লাগল। তারপর শুরু হলো আলাপ। এখন দোকানে বেচাকেনা প্রায় নেই বললেই চলে। কোনো কোনো দিন একটি বইও বিক্রি হয় না। তবু সারা দিন বসে থাকেন, স্বপ্ন দেখেন—আবার বুঝি বইয়ের সোনালি দিন ফিরে আসবে।

জিজ্ঞেস করলাম, সংসার চলে কীভাবে?

জানালেন, তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেরা চাকরি করে, মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা টাকা পাঠায়, কিছু ধানি জমি আছে—তাতেই কোনো রকম চলে যায়। বই বিক্রি না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরাও চান না তিনি দোকানে আসুন। তবু তিনি আসেন, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের টানে। 

বলছিলেন, ‘বই, বইয়ের ঘ্রাণ আমার খুব ভালো লাগে। বসে বসে নিজেই বই পড়ি, পত্রিকা পড়ি। আর এই দোকান তো আমার সন্তানের মতো, এর মায়া ছাড়তে পারি না।’

মনে মনে ভাবি, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স কি আর কোনো দিন ফিরে পাবে তার সেই পুরোনো জৌলুশ?