নানা রঙের কমনওয়েলথ গেমস

কমনওয়েলথ গেমসের ইভেন্ট শেষের দৈনন্দিন প্রতিবেদনে কি আর গেমসের খুঁটিনাটি উঠে আসে? ছাপা না হওয়া সেই সব টুকরো ছবিই উঠে এল মাসুদ আলমের দিল্লির ডায়েরিতেবাবা-মা এবং ছেলে...লিয়াম জামেল পিয়েস, মাইকেল এন্ডু পিয়েস, জ্যাকুইলিন...। নামগুলো আগে কখনো শোনেননি। প্রথমজন অস্ট্রেলিয়ার তরুণ হাইজাম্পার। পরের দুজন তাঁর মা-বাবা। এদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে। তা মা-বাবা কমনওয়েলথের মতো বড় আসরে সন্তানের খেলা দেখতে দিল্লি আসতেই পারেন। কিন্তু তরুণ লিয়ামের মা-বাবা শুধুই বাবা-মা নয়। তাঁর কোচও!লিয়ামের দাদা ছিলেন ক্রীড়াবিদ। কিন্তু বাবা খেলাধুলা তেমন করেননি। ছোটবেলা থেকে ছেলের খেলার প্রতি ঝোঁক, সে হাইজাম্পার হবে। কোচ রাখা হলো, কিন্তু কাজ তেমন হচ্ছে না। ছেলের উন্নতির গ্রাফ চোখে পড়ার মতো নয়। এরপর মা-বাবা নিজেরাই কিছু কোচিং কোর্স করে হয়ে গেলেন ছেলের কোচ।ছেলেকে নিয়ে বাইরে স্টেডিয়ামে ঘোরাঘুরি করছিলেন ষাটোর্ধ্ব মা-বাবা। তিনজনের গলায়ই অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে বেরিয়ে এল তাঁদের ক্রীড়া পরিবার হয়ে ওঠার গল্প। ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ওর অনেক উন্নতি হয়েছে। এখানে সে পদক জিতবে আশা করছি’—বাবার মুখে গর্ব। না জিতলে দুংখ পাবেন? কোচ পরিচয় ভুলে মমতাময়ী মায়ের ভূমিকায় জ্যাকুইলিন, ‘জীবনে তো পদকই সব নয়। তাই না?’ শুধুই মুগ্ধতাগেমস ভিলেজে সাপ-ব্যাঙের বসবাস, ফুটওভারব্রিজ ভেঙে গেছে—এসব ধুয়া তুলে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম অনেক নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছিল গেমস শুরুর কয়েক দিন আগেও। ছিল নিরাপত্তাহীনতার কত অভিযোগ। কিন্তু এটা যে বাড়াবাড়ি রকমের প্রচারণা ছিল, এখানে পা দিয়েই বোঝা গেছে। ছোটখাটো বিষয়কে বড় করে দেখিয়ে দিল্লির প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। গেমসের সব ভেন্যুই আধুনিক। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আছে। গেমস ভিলেজকে তো অনেকে পাঁচ তারকা হোটেলের সঙ্গে তুলনা করছেন। একই জায়গায় ছয় হাজারের বেশি ক্রীড়াবিদের থাকার জন্য সব সুউচ্চ অট্টালিকা বানানো হয়েছে।এখানে গেমস শুরুর পর থেকে বলার মতো কোনো সমস্যাই চোখে পড়েনি। কোনো সাহায্য চাইলে একসঙ্গে তিন-চারজন স্বেচ্ছাসেবী এগিয়ে আসছেন। সবাই খুবই আন্তরিক।তিন-চার জায়গায় নিরাপত্তা তল্লাশি অনেকের বিরক্তির কারণ হতে পারে, কিন্তু আয়োজকদের স্লোগানই হচ্ছে, ‘আমরা আপনাকে নিরাপদ রাখতে চাই।’ কিছু অংশ বাদ দিলে দিল্লি শহরটাও খুব পরিচ্ছন্ন। ওভারব্রিজময় এই শহরে কোনো পোস্টার, ব্যানার, অযাচিত লেখাজোখা নেই। এই শহরে চলাচলের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন মেট্রো রেল। মিডিয়া সেন্টারের ওপরই মেট্রোর স্টেশন, দুই মিনিট পর পরই মেট্রো আসছে। দুরন্ত বেগে ছুটছে। কমনওয়েলথ গেমসটাও ঠিক যেন তাই।প্রগতি ময়দানদিল্লির বিভিন্ন বাণিজ্য মেলার জন্য নির্ধারিত বিশাল এই এলাকাজুড়ে মিডিয়া সেন্টার। একটি ইলেকট্রনিক সাংবাদিকদের জন্য, অন্যটি প্রিন্ট। এ পর্যন্ত ঠিকই আছে, কিন্তু এটির পেটের ভেতর ঢুকতে গেলে হাঁটতে হাঁটতে জীবন শেষ! প্রথম দিন নিরাপত্তার নানা স্তর পেরিয়ে শুধু হাঁটছি আর হাঁটছি, শেষমেশ মিডিয়া সেন্টারের দেখা মিলল এবং অবশ্যই স্বস্তি। সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই যে এখানে আছে।রাস্তা ফাঁকাদিল্লির রাস্তা বেশ চওড়া। তবু কোথাও কোথাও ট্র্যাফিক জ্যাম আছে। ঢাকার মতো বিরক্তিকর না হলেও জ্যাম থেকে মুক্তি মিলছে না কিছু সড়কে। এই জ্যাম থেকে গেমসের খেলোয়াড়-কর্মকর্তাদের মুক্তি দিতে রাস্তায় কমনওয়েলথ গেমসের জন্য একটা আলাদা লেন করা হয়েছে। এতে অন্য সব গাড়ি যখন যানজটে আটকে থাকে, তখন কমনওয়েলথের যেকোনো বাসই বীরপর্দে নির্ধারিত লেন দিয়ে চোখের পলকে পৌঁছে যাচ্ছে গন্তব্যে।যাত্রাপথে চালককে তেমন ব্রেকই কষতে হয় না। সামনে যে শুধু ফাঁকা রাস্তা! ওই গাড়ি যেন নিঃশব্দে বলে, দেখো, আমার কী ক্ষমতা! লোকজন তো হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। কারও মুখে অস্ফুট কৌতূহল, ‘ইয়ে কেয়া হ্যায় ভাইছাব!’সানি টমাসের ‘না’‘না’ শব্দটাই সবচেয়ে বেশি পছন্দ সানি টমাসের। ভারতীয় শ্যুটিং দলের অন্যতম এই কোচকে দিল্লি এসেই ফোনে অনুরোধ, ‘অভিনব বিন্দ্রার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই। যদি সুযোগ দিতেন...।’ তাঁর গলাটা বেশ ঝাঁজালো শোনায়, ‘সাংবাদিকেরা আমাকে জ্বালিয়ে মারছে। কিন্তু ব্রাদার, কথা তুমি বলতে পারবে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকেও অনুরোধ এলে আমি বলব, “নো।” কম্পিটিশন শেষ হোক, তারপর।’ বিন্দ্রার ১০ মিটার এয়ার রাইফেল শেষ হলো ৬ অক্টোবর, কিন্তু সানির নির্দেশে মুখে যথারীতি তালা। ভারতীয় সাংবাদিকদের কোরাস, ‘সানিজি, সানিজি, এক মিনিট বাত করেঙ্গে...প্লিজ।’ শেষমেশ মন গলল ভদ্রলোকের, রুপাজয়ী বিন্দ্রা রেঞ্জে দাঁড়িয়েই মিনিট দুয়েক কথা বললেন। বিন্দ্রাকে হারিয়ে ১০ মিটার রাইফেলে সোনাজয়ী গগন এসবের ধারেকাছেও নেই। রাইফেল কাঁধে নিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিয়েই নিরুদ্দেশ। দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে পরদিন সানিকে ফোন, ‘তুমি তো প্রতিযোগিতা শেষে কথা বলার সুযোগ দেবে বলেছ, এখন দাও।’ এবার তাঁর উত্তরটা অপ্রত্যাশিত, ‘ও লাড়কা (বিন্দ্রা) তো চণ্ডীগড় (বিন্দ্রার বাড়ি) চল গয়া।’ প্রতিযোগিতা শেষ করেই এত তাড়াতাড়ি বাড়ি! বাড়ি গিয়েছেন ঘুমানোর জন্য নয়, সময় নষ্ট না করে অনুশীলনে নেমে পড়বেন বলে!ধূমপান এবং...ভারতীয়রা খুব কমই ধূমপান করে। সাংবাদিকেরাও এই কাতারে। কিন্তু বিদেশি সাংবাদিকদের অনেকের তো ধূমপান না করলে মাথাই খোলে না। মুশকিল হচ্ছে, মিডিয়া বক্স তো বটেই, গেমস ভেন্যুর চৌহদ্দিতে ধূমপান নিষিদ্ধ। এমনকি সিগারেটের প্যাকেট বহন করাও যাবে না। ম্যাচ তো নয়ই। তার পরও লুকিয়ে কেউ কেউ সিগারেটের প্যাকেট নিতে সক্ষম হন। কিছুক্ষণ প্রেস বক্সে কাজ করে অনেক সাংবাদিক বাইরে এসে দুই টান দিয়েই দৌড়।বিষয়টা একদিন চোখে লাগল এক পুলিশ কর্তার। তিনি এক ধূমপায়ী সাংবাদিকের কাছে এসে জানতে চান, ‘কে তোমাকে সিগারেট নিয়ে ঢুকতে দিয়েছে?’ ওই সাংবাদিক বলেন, ‘নিরাপত্তাকর্মীদের অনুরোধ করে এনেছি।’ এই সেরেছে, পুলিশ কর্তা ওই সাংবাদিকের নাম-পাসপোর্ট নম্বর টুকে নিয়ে বললেন, ‘যাও।’ সাংবাদিক জানতে চান, ‘আমাকে আবার বিপদে ফেলবা নাকি?’ পুলিশ কর্তা বললেন, ‘তোমাকে না, বিপদে ফেলব ওই ব্যাটাদের (নিরাপত্তাকর্মীদের), যারা তোমাকে সিগারেট ভেতরে আনতে দিয়েছে!’‘ইয়ে অলিম্পিক হ্যায়?’এই শহরে ৭১টি দেশের সাড়ে ছয় হাজার ক্রীড়াবিদের এক বিশাল যজ্ঞ চলছে—দিল্লির বেশির ভাগ মানুষই তা জানে না। যারা জানে, তাদের অনেকের জানাটা আবার ভুল! এটা টের পাওয়া যায় ট্যাক্সিতে উঠলে। অন্তত তিন-চারজন ট্যাক্সিচালক ভিনদেশি সাংবাদিকের মুখে গেমসের কথা শুনে বললেন, ‘ইয়ে অলিম্পিক হ্যায় না?’ অলিম্পিক নয়, এটা কমনওয়েথ গেমস...বারবার বললেও বিহারের তরুণ কুমার সানতি বুঝলেনই না।