
আমাদের মাকে যেদিন আমরা
ভাওয়ালের জঙ্গলে ফেলে রেখে
পালিয়ে গিয়েছিলাম,
ডালে ডালে পাখিরা বেদনায় মূক হয়ে গিয়েছিল।
অথচ আকাশ ভরে উঠছে আলোয় আলোয়
পাখি ছাড়া আকাশে আর কোনো পাখা নেই
কাকলি ছাড়া আকাশে কোনো গর্জন নেই
পাখির হৃৎপিণ্ড ছাড়া আকাশে কোনো ইঞ্জিন নেই
কক্সবাজারের সৈকতে নীল ঢেউয়ে
জলকেলি করছে ডলফিন
পঞ্চগড় থেকে দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালি শিখর
শুধু তোমার সঙ্গে আমার কফিসন্ধ্যাটা আর এল না
আঙুলে আঙুল ছোঁয়াব অলক্ষ্যে
এক টেবিলে মুখোমুখি—
আমরা কফিমগে চামচ নাড়বার বদলে
যার যার ঘরে বন্দী
আঙুলে মৃত্যুর সংখ্যা গুনতে লাগলাম
অচিরেই কালো মৃত্যু সাদা কাফন ঢেকে দিতে লাগল
সবকিছু—টিভি পর্দা, অনলাইন নিউজ,
প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ কলাম
আমরা কফির ঘ্রাণের বদলে লোবানের গন্ধ পেতে শুরু করলাম
মার্চ থেকে নভেম্বর পেরিয়ে ডিসেম্বর
আমাদের সমস্ত অস্তিত্বজুড়ে গোর খননের শব্দ
আমরা যখন আমাদের মাকে ফেলে রেখে এলাম জঙ্গলে
বাবাকে তুলে দিলাম আঞ্জুমানের হাতে
তখন আকাশে টিয়াপাখির ঝাঁক একবার অবিশ্বাসের চোখে
আমাদের দিকে দৃকপাত করল
আমাদের অক্সিজেন কমে আসতে লাগল
শ্বাস রোধ হয়ে আসতে লাগল আমাদের
আমরা মিকেলাঞ্জেলোর ছবির মতো পরস্পরের দিকে
অসহায় আঙুল বাড়ালাম
মৃত্যু সেই হাত সরিয়ে নেবার আগে
মানুষই এগিয়ে এল মানুষের দিকে
পোশাককর্মীরা শত মাইল হেঁটে যোগ দিলেন কারখানায়
বিদ্যানন্দের কিশোরেরা মমতার হাতে কড়া নাড়ল দরজায়
দু–দুবার করোনাক্রান্ত হওয়ার পরেও রোগীদের পাশে দাঁড়ালেন ডা. সিফাত
হাসপাতালে কোভিড রোগী স্বামীর শিয়রে লেপ্টে রইল সদ্য বিবাহিতা নারী
বৃদ্ধা মাকে কোলে করে বসে রইল নাছোড় যুবক
কোভিডকে পরাজিত করে হাসিমুখে ফিরল তারা
তাদের সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল আকাশে
মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখে
পাখিরা আবার হেসে উঠছে
পাতায় পাতায় আদর বোলাচ্ছে ভোরের সূর্য
আমরা ২০২১-এর দিকে পা বাড়ালাম
আমাদের পাশে পাখি
আমাদের পাশে নদী
আমাদের সামনে সাগর
আমাদের পেছনে পাহাড়
আমাদের সঙ্গে আকাশ
আর আমাদের সঙ্গে মানুষ।
আমরা আবার কফির পেয়ালা হাতে বসব
মুখোমুখি, নীলকণ্ঠ পাখি
৩১.১২.২০২০, ঢাকা