নানান রকম, নানান বরণ বইয়ে ঝলমল করছে বইমেলা। সেসবের মধ্য থেকে নির্বাচিত তিনটি বইয়ের পাণ্ডুলিপির অংশবিশেষ নিয়ে এ আয়োজন।

গোয়েন্দা গল্প আমার একদম সহ্য হয় না। মানুষকে নিয়ে ঈশ্বর যেমন খেলা করেন, গোয়েন্দা গল্পকারও তেমনি খেলা করতে চান পাঠককে নিয়ে। হত্যাকাণ্ডের পর পাঠকেরা গোয়েন্দাকে রুমালটা তুলতে দেখেন। কিন্তু রুমালের মনোগ্রামটা তাঁদের দেখানো হয় না। ওটা দেখেন শুধু গোয়েন্দা। এরপরও গোয়েন্দা–লেখক চ্যালেঞ্জ করেন পাঠকের মেধাকে। ব্যাপারটা খুবই অনৈতিক। আমার তো একদমই পছন্দ না। আমার প্রিয় অ্যাডভেঞ্চার। অ্যাডভেঞ্চার পড়তে পড়তে নিজেকে জড়িয়ে ফেলি আমি কাহিনির সঙ্গে। হারিয়ে যাই আরেক জগতে। রহস্য সাহিত্য কিন্তু আমি পড়তে পছন্দ করতাম ছেলেবেলা থেকেই। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়—এঁরা পাগল করে দিয়েছিলেন আমাকে। তো, অ্যাডভেঞ্চারের নানা কাহিনি পড়তে পড়তে বয়সটা আটকে গেল আমার। আর বড় হতে পারলাম না। এখন পর্যন্ত আটকে আছি সেই রহস্য–রোমাঞ্চের জগতে।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে নিজের প্রেসে ছাপাতে শুরু করলাম আমার বই। প্রথমে কুয়াশা। মাহবুব আমীন নামের এক বন্ধু ছিল আমার। বইগুলো পড়ে কড়া এক সমালোচনা ঝেড়ে দিল। খুব আহত হলাম আমি। বই সমালোচনার যোগ্যই সে নয়, ভাবলাম মনে মনে। ভেতরে–ভেতরে যে খেপে যাচ্ছি, সে বুঝতে পারল সেটা। সেদিনই ইয়ান ফ্লেমিংয়ের একটা বই কিনে উপহার দিল আমাকে। বলল, ‘পড়ে দেখলে বুঝতে পারবেন বিশ্ব রহস্য সাহিত্য কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে।’ পড়ে তো আমার মাথা হেঁট। খুবই নাবালক মনে হতে লাগল নিজের লেখা। তখন খুব বেশি করে পড়তে লাগলাম বিদেশি থ্রিলার। ফ্লেমিংয়ের বন্ড আর এমের ধাঁচে মাথার মধ্যে তৈরি হতে লাগল মাসুদ রানা আর রাহাত খানের চরিত্র। গড়ে উঠতে লাগল আমার নিজস্ব রহস্য জগৎ।
আমিই মাসুদ রানা
কাজী আনোয়ার হোসেন
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: মার্চ ২০২২
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
২০৯ পৃষ্ঠা, দাম: ৪০০ টাকা।
‘মাসুদ রানা’র প্রথম বই দুটো প্রচণ্ড খেটে লিখেছি। অনেকেরই ভালো লেগেছিল বইগুলো। কবি আবুল হাসান দ্বিতীয় বইটি পড়ে আবেগপ্রবণ হয়ে রাত জেগে এক দীর্ঘ চিঠি লিখে ফেলেছিলেন তাঁর বাবাকে। তো বইগুলো লিখতে শ্রম আর সময় গেছে প্রচুর। আমি জানি না, ধ্বংসপাহাড় আর ভারতনাট্যমকে পুরোপুরি মৌলিক বলা যাবে কি না। গাড়ির স্পিড কীভাবে বাড়ানো যায়, জানার জন্য অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বই এনে পড়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজি বিভাগ থেকে এনে পড়তে হয়েছে পঙ্গপালের ওপর থিসিস। ভারতে গিয়ে ঘুরে দেখেছি সীমান্ত এলাকা। একে মৌলিক বললে মৌলিক, যৌগিক বললে যৌগিক। এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তথ্য নিয়ে, শ্রম দিয়ে বই শেষ করতে লেগে যেত একেবারে দশ–এগারো মাস।
দেখলাম, এভাবে চলবে না। প্রকাশনা দাঁড় করাতে হলে অনেক বেশি লিখতে হবে। তখন গেলাম রূপান্তরের দিকে। সেটার খাটনিও মৌলিকের চেয়ে বিশেষ কম নয়। কারণ, আমি তিন–চারটে বিদেশি কাহিনির উপাদান নিয়ে দাঁড় করাতাম একেকটা উপন্যাস। স্বর্ণমৃগ, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা, শত্রু ভয়ঙ্কর লিখেছি এভাবে। সে আরেক মানসিক যন্ত্রণা। বিভিন্ন উপাদান জোড়া লাগতে চায় না কিছুতেই। না মেলানো পর্যন্ত আমারও অস্থিরতা কমে না। সাংঘাতিক যন্ত্রণা। এমনও হয়েছে, ভেবে ভেবে উদ্ভ্রান্ত হয়ে গেছি, কিন্তু কাহিনি কিছুতেই মিলছে না। যেমন শত্রু ভয়ঙ্কর। বিশ–পঁচিশ দিন পেরিয়ে গেছে। মিলছেই না। শেষে বেড়াতে যাচ্ছি একদিন। গাড়িতে করে। সঙ্গে সস্ত্রীক বন্ধু, কথাসাহিত্যিক রাহাত খান। গাড়িতে বসেই হঠাৎ মিলে গেল কাহিনিটা।
পরে দেখলাম, এভাবেও হচ্ছে না। সময় নিয়ে নিচ্ছে অনেক। অথচ পাঠকের দাবি, প্রতি মাসে একটা করে লিখতে হবে। ফলে একটা উপন্যাস, কিংবা বড়জোর দুটো থেকে একটা কাহিনি রূপান্তরের দিকে ঝুঁকতে হলো। তবে আমার রূপান্তরের ধরনটা আলাদা। মূল কাহিনি কখনোই অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করি না। আস্ত আস্ত পরিচ্ছেদ বাদ দিয়ে দিই। দরকারমতো গল্প নিজের মতো তৈরি করে ফেলি। একটুখানি সরে গেলে মূল কাহিনির সঙ্গে কোনো সম্পর্কই আর থাকে না অনেক সময়। নিজের মতো গড়ে ওঠে একেকটা চরিত্র। সেগুলো আমাকে মূল কাহিনি থেকে সরে যেতে বাধ্য করে। বন্ধুত্ব, মহত্ত্ব, শিভালরি খুব প্রিয় বিষয় আমার। গল্পের মধ্যে চলে আসে এসব। হিউমার খুব পছন্দ আমার। তার ছাপ চলে আসে কাহিনিতে।
রূপান্তরের জন্য অনেকে সমালোচনা করেন হয়তো। তাতে কিছু মনে করি না আমি। বছরে একটি করে উপন্যাস বেরোলে প্রকাশনা চলবে কীভাবে? তা ছাড়া এ দেশে অ্যাডভেঞ্চার বা রহস্যোপন্যাস লেখার পরিবেশও তো নেই। ওসব অভিজ্ঞতা আমরা পাব কোথায়? কোথায় সমুদ্রতরঙ্গের শীর্ষে কী হচ্ছে, আর্কটিকে আবহাওয়া কেমন, সংঘর্ষ লেগে কঠিন বরফে চিড় ধরে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল—এসব বাঙালি লেখকের অভিজ্ঞতার বাইরে। কিংবা সায়েন্টিফিক বা টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে থ্রিলার লেখা আমাদের পক্ষে দুরূহ।
অনেকের ধারণা, রহস্যগল্পের সাহিত্যগুণ নেই। এটা কিন্তু একেবারে ভুল। ফ্লেমিং আমার প্রিয় তাঁর লেখার সাহিত্যগুণ ও ডিটেইলের জন্য। তাঁর এক উপন্যাসে একটা রাস্তার বর্ণনা আছে। ‘পাহাড়ি এলাকা। ঝাঁঝা দুপুর। নির্জন রাস্তায় জেসমিন ফুলের তীব্র গন্ধ। মনে হয়, কী যেন ঘটবে এখানে। শূন্য মঞ্চের রোমাঞ্চ লাগে মনে।’ বর্ণনাটা এত সুন্দর, এত জীবন্ত যে মুগ্ধ হয়ে যাই।
আরেকটা বর্ণনার কথা বলি। ‘রাত। একটা নিউক্লিয়ার বোমা নিয়ে বিশাল এক উড়োজাহাজ ক্র্যাশ–ল্যান্ড করেছে ক্যারিবিয়ান সিতে। একদল দস্যুর কাছে বোমাটা ডেলিভারি দেওয়া হচ্ছে। আজই পাইলটের চাকরির শেষ দিন—এরপর বাকি জীবন শুধু আমোদ–ফুর্তি করে কাটাবে সে। এলাকাটা চিহ্নিত করার জন্য একটা স্পিডবোটে করে এসেছে দুজন। এদের একজন ডুবন্ত প্লেনের উইংয়ের ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে ককপিটের দিকে। নামল পাইলট। হাসছে। হাত বাড়িয়ে দিল করমর্দনের জন্য। হাতটা ধরল আগন্তুক, হ্যাঁচকা টান দিল সামনের দিকে। মাথাটা পেছনে হেলে গেল পাইলটের, দৃষ্টি স্থির হলো মস্ত গোল চাঁদের ওপর। সাঁৎ করে ছয় ইঞ্চি ব্লেডের একটা ছুরি ঢুকে গেল পাইলটের চিবুকের নরম মাংস ফুঁড়ে, ওপর দিকে। বিস্ফোরিত হলো চাঁদটা।’
ফ্লেমিং এমনি এমনি জনপ্রিয় হননি। তাঁর বই বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে জন এফ কেনেডি সেটা কিনে পড়ে ফেলতেন।
এরপর আমি মুগ্ধ হয়েছি অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন পড়ে। শুধু থ্রিলার লিখেই ডি–লিট উপাধি পেয়েছেন ম্যাকলিন। এখন আমার প্রিয় উইলবার স্মিথ। যেমন তাঁর হাস্যরসবোধ, তেমনই তিনি কাঁদাতেও পারেন পাঠককে। তবে মানুষটা তিনি বর্ণবাদী। দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে আসার পর তা আরও প্রকট হচ্ছে দিন দিন। আই লাভ ইউ ম্যান, মুক্ত বিহঙ্গ—এসব লিখেছি তাঁর কাহিনির ছায়া নিয়ে।
একবার লিখতে বসলে দিনদুনিয়ার কোনো খেয়াল আমার থাকে না। লেখা শেষ না করা পর্যন্ত শান্তি নেই। একধারসে লিখে যাই। দু–তিন দিন ধরে। ঘুম–নাওয়া–খাওয়া কোনো কিছুরই কোনো ঠিক–ঠিকানা তখন থাকে না। একবার গ্যাপ পড়ে গেলে ঘটনার সঙ্গে একাত্ম হতে অসুবিধা হয়। আমি লিখতে বসলে ক্ষতিটা হয় প্রকাশনার—ব্যবসার কোনো কাজ আর তখন দেখতে পারি না।
এখন নিজে লেখার জন্য তেমন কোনো তাগিদ অনুভব করি না। কিন্তু একটা তৃপ্তি আছে আমার। গত ত্রিশ বছরে কম করেও পঞ্চাশজন লেখক তৈরি করেছি আমরা। গড়ে উঠেছে রহস্য সাহিত্যের শক্তিশালী একটা ধারা। এই আমার আনন্দ। আমার মিশন আমি পুরো করেছি। পাঠককে সেবা দিতে এসেছি, সেবাটা যেন ঠিকমতো পৌঁছায় তাঁদের কাছে, সেটা দেখি এখন। তবে পণ করে লেখা ছাড়িনি। ছেলেরা প্রকাশনার হালটা ধরলে হয়তো লিখতে বসব আবার। আবার ফিরে যাব আমার নিজের রহস্যজগতে।
● কাজী আনোয়ার হোসেনের নানা লেখা নিয়ে বইটি অচিরেই বইমেলায় প্রকাশিত হবে।