ডেরেক ওয়ালকট

এ যুগের হোমার

ডেরেক ওয়ালকট [জন্ম: ২৩ জানুয়ারি ১৯৩০]
ডেরেক ওয়ালকট [জন্ম: ২৩ জানুয়ারি ১৯৩০]

ফরাসি কবি ও নাট্যকার রেমঁ কুইনো বলেছিলেন: ‘পৃথিবীর যেকোনো মহান সাহিত্যকর্মই হয় ইলিয়াড, না হয় অডিসি।’ আজ থেকে প্রায় দুই হাজার ৭০০ বছর আগে গ্রিক কবি হোমার জন্ম দেন এই দুই মহাকাব্যের, আর সেই সঙ্গেই সূচনা ঘটে পশ্চিমা সাহিত্যের। ‘ইলিয়াড’-এর মূল বিষয়বস্তু ‘যুদ্ধ’—গ্রিকরা ট্রয়ে আসে তাদের রানি হেলেনকে ফিরিয়ে নিতে; ট্রয়ের উপকূলে দশ বছরব্যাপী এক দীর্ঘ অপেক্ষার পরে গ্রিক বীর অ্যাকিলিসের হাতে নিহত হয় হেক্টর, ট্রোজানদের প্রধান যোদ্ধা। ‘অডিসি’, অন্যদিকে দশ বছরব্যাপী এক সাগর পাড়ি দেওয়ার কাহিনি। যুদ্ধ শেষে গ্রিক বীর অডিসিয়ুস (লাতিন নামে ‘ইউলিসিস’) এখানে ঘরে ফিরছে হাজারো বিপদ পার হয়ে। তার ঘর গ্রিক দেশের ইথাকা প্রদেশে, সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে স্ত্রী পেনোলোপি ও পুত্র টেলেমেকাস। দুই মহাকাব্যে, নিঃসন্দেহে, আমাদের বলা হচ্ছে দুই অতিপরিচিত কথা: মানবজীবন এক দীর্ঘ যুদ্ধ—এই হলো ‘ইলিয়াড’-এর সার; এবং মানবজীবন এক দীর্ঘ সফর—এ-ই ‘অডিসি’র। হোমার ট্রয়কে বানিয়েছেন সব শহরের রূপক শহর, শত্রুর হাতে পরাজিত সব দেশের রূপক দেশ; আর অডিসিয়ুসকে সব মানুষের রূপক মানুষ, যার কাছে দীর্ঘ-ক্লান্তিকর দিনের শেষে স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের নিকটে ফেরাটাই জীবনের সার।
হোমারের ‘অডিসি’তে ভর করে গত শতাব্দীতে সৃষ্টি হয়েছে তিন বিশাল মাপের সাহিত্যকর্মের: প্রথমটি জয়েসের উপন্যাস ‘ইউলিসিস’; দ্বিতীয়টি গ্রিক ঔপন্যাসিক নিকোস কাজানৎজাকিসের দীর্ঘ মহাকাব্য ‘দি অডিসি’, আকারে যা হোমারের ‘অডিসি’র তিন গুণ বড়; এবং শেষে, ১৯৯০ সালে, ক্যারিবিয়ান কবি ডেরেক ওয়ালকটের ‘ওমেরস’। এর দুই বছর পরেই, ১৯৯২ সালে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ওয়ালকট; নোবেল কমিটি তাদের ঘোষণায় জানাল, ‘ওমেরস’ বিশ্বসাহিত্যের এক ‘প্রধান কীর্তি’।
হোমারের ‘অডিসি’র মতো কোনো বীরের সবকিছু জয়-করা বীরত্বগাথা নেই ওয়ালকটের ‘ওমেরস’-এ। মহাকাব্য মানেই বীরের কাহিনি; সেই অর্থে বীর তো দূরের কথা, সত্যিকারের কোনো একরৈখিক কাহিনিও নেই এতে। ৩২২ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ কবিতাটি ওয়ালকট সাজিয়েছেন মোট সাতটি খণ্ডে, তাতে সব মিলে ৬৪টি অধ্যায়। ‘ওমেরস’-এর কাহিনির নায়ক দুই ক্যারিবীয় জেলে অ্যাকিলে ও হেক্টর, এরা দুজনেই তাদের দ্বীপের এক সুন্দরী হেলেনের প্রেমপ্রত্যাশী। অ্যাকিলির সঙ্গে হেলেনের বিচ্ছেদ হলে হেলেন যায় হেক্টরের কাছে, হেক্টর জেলে থেকে হয়ে যায় ট্যাক্সিচালক, হেলেন খুঁজে ফেরে করার মতো কোনো কাজ, অ্যাকিলি ভুগতে থাকে হেলেনের বিচ্ছেদ-বেদনায়। অ্যাকিলি স্বপ্ন দ্যাখে ধনী হবার, স্বপ্নেই সে ফেরে পশ্চিম আফ্রিকায়, ক্রীতদাস হিসেবে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে আসার আগে যা ছিল তার পূর্বপুরুষের দেশ। শেষে আমরা জানি, হেক্টর মারা গেছে গাড়ি দুর্ঘটনায়, হেলেন এখন অন্তঃসত্ত্বা, আর সে ফিরে যাচ্ছে অ্যাকিলির কাছে। কাহিনির এই প্রথম প্লটের পাশাপাশি আছে দ্বিতীয় এক গল্প—এর নায়ক মেজর প্লাংকেট ও তার আইরিশ স্ত্রী মড্। মেজর চেষ্টা করছে হেলেনের রূপ ও সৌন্দর্য নিয়ে এক ক্যারিবীয় ইতিহাস লিখতে; মড্ চাইছে আয়ারল্যান্ডে ফেরত যাবে; এরপর মডের নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি আর তার মৃত্যুতে মেজর প্লাংকেটের শোক। এই মহাকাব্যের তৃতীয় প্লট গ্রিক বীর ফিলোকেটটেসকে নিয়ে (হোমারে সাপের কামড়ে আহত ফিলোকেটটেসকে এক নির্জন দ্বীপে ফেলে রেখে ট্রয়ে এসেছিল অডিসিয়ুস ও অন্যরা)। এই ফিলোকেটটেসকে এখানে তার অসুস্থতা থেকে সারিয়ে তোলে মা কিলমান, সৈকতের কাছে পানশালা চালানো এক নারী। মা আফ্রিকায় ফিরে যায় ফিলোকেটটেসকে সারানোর গোপন ওষুধ আনবে বলে। ফিলোকেটটেসেরই আরেক সঙ্গী সেভেন সিজ (Seven Seas), এক অন্ধ চারণকবি। আমরা বুঝতে পারি, এই ‘সেভেন সিজ’ই ওয়ালকটের হোমার।
কিছুই হয়তো বোঝানো গেল না এই ছোট পরিসরের কাহিনি বর্ণনায়। এত দীর্ঘ ও বহু স্তরবিশিষ্ট এক মহাকাব্যের প্লটের বয়ানও আসলে সম্ভব না। এর অধ্যায় থেকে অধ্যায়ে কাহিনি বর্ণনা নেইও তেমন। কাব্যিক শক্তির দ্যুতি ও গতিময়তা এই মহাকাব্যে এমনই যে কাহিনির সুতো ধরার ইচ্ছেটাও আপনার মধ্যে তীব্র হবে না কখনোই। শুধু বারবারই এই বোধ আসবে যে ওয়ালকট হোমারের বীরদের কাহিনি বাদ দিয়ে এখানে বলছেন এক আধুনিক, প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশের মানুষদের অতি নগণ্য সব গল্প, তাদের জীবনের বীরত্বহীনতার উপেক্ষণীয় সব সাদামাটা ঘটনার কথা। হোমার, ভার্জিল, দান্তে বা মিল্টনের বিশাল নায়কদের বিশাল ও আধিপত্যবাদী পৃথিবী এখানে অনুপস্থিত; ওয়ালকটের পৃথিবী মূলত শোষিতদের, পরাজিত ও ভগ্নহূদয় সব সাধারণ মানুষের, পশ্চিমের কাছে যারা স্রেফ ‘দ্বীপের ওরা’ কিংবা ‘ওসব কালোরা’ নামে পরিচিত। ক্লাসিক্যাল হোমেরিক বীরত্বগাথার যে ইতিহাস, তা এখানে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ওয়ালকট। আর এ কারণে তাঁর এই কীর্তি ‘মহাকাব্য’ হয়ে ওঠার মর্যাদা হারাল কি না, তা নিয়ে তাঁর কোনোই মাথাব্যথা নেই। ‘মহাকাব্য’ বা ‘এপিক’ পশ্চিমেরই সৃষ্ট এক সাহিত্যকলা, হোমারের হাতে যার শুরু এবং কাজানৎজাকিসে যার আপাতত সমাপ্তি। ওয়ালকটের ‘ওমেরস’-এ পশ্চিম ‘বিজয়ীদের দেশ’ এবং সেখানের মানুষেরা ‘নিষ্ঠুর নিপীড়ন করেছিল মা কিলমানের ভাই ও বোনদের’ বহুদিন ধরে দাস বানিয়ে রেখে। সেই পশ্চিমের কাছে তিনি সাহিত্যের নানা প্রকরণ শিখেছেন বলে ঋণী, কিন্তু তাঁর রক্ত কালো আফ্রিকার বলেই সেই ‘ঋণের রাজনীতি’কে ভুলতে অসমর্থ তিনি। ‘ওমেরস’-এর শেষ দিকে হঠাৎ ওয়ালকট তাঁর গতিমান কাব্যকীর্তি থামিয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করছেন যে তিনি (অর্থাৎ আমি) কি ‘পাঠ করিনি আর আবার লিখিনি যত দিন সাহিত্য/ হয়ে উঠছে ইতিহাসের সমান অপরাধী?’ তার আরও জিজ্ঞাসা: ‘কখন আমার দৃষ্টি থেকে সরে যাবে নৌকার পাল/ কখন থামবে আমার দু’ জেলের গালাগালির মাঝে/ অবিরত ট্রোজান যুদ্ধের কাহিনি শুনতে পাওয়া?/ কখন থামবে গলার কাছে এই প্রতিধ্বনি/ যা বারবার জোর দিয়ে বলছে ‘‘ওমেরস”;/ কখন ঢুকব আমি রূপক পেরিয়ে সেই আলোর ভুবনে?’ আমাদের সবার প্রশ্নই যেন তার কণ্ঠে—কবে আমরা বর্তমানে বাস করতে পারব নিষ্ঠুর অতীতের হাতে আর তাড়িত না হয়ে? দশ বছর সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো হোমারের অডিসিয়ুসের মতোই, এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের সফরসঙ্গী হতে হবে ডেরেক ওয়ালকটের, যিনি ‘ওমেরস’-এ শুরু করেন এক যন্ত্রণাপীড়িত যাত্রা: ‘অনেক মানুষের অনেক শহর দেখব বলে/ তাদের মনের কথা জানব বলে।’ শুরুই করেন শুধু, ৩২২ পৃষ্ঠাতেও শেষ করেন না।