সুকান্ত ভট্টাচার্য

বাংলা কবিতার হারানো সম্ভার?

>
সুকান্ত ভট্টাচার্য: (আগস্ট ১৫, ১৯২৬—মে ১৩, ১৯৪৭), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
সুকান্ত ভট্টাচার্য: (আগস্ট ১৫, ১৯২৬—মে ১৩, ১৯৪৭), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
একসময় বাঙালির ঘরে ঘরে ছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার বই। এখনো কি সেই অবস্থা বর্তমান? এই কবির মৃত্যুদিন উপলক্ষে তাঁর সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজেছেন এই সময়ের এক কবি

স্মৃতি আর বিস্মৃতির দ্বিমেরু চলাচলে আমাদের জীবন বয়ে চলে। যা ভুলে যেতে চাই, তাই ‘খেনে-খেনে’ মনে পড়ে আমাদের বিরক্ত করে যেমন, আর যা মনে করার কোশেশ করি, তাই এমন ভুল মেরে থাকি যে, নিজেও পস্তাই, পস্তায় আমাদের ‘পরকাল’ পর্যন্ত! রবীন্দ্রনাথ বাংলা মুল্লুকের জন্য কত কী যে চিন্তা করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। এমনকি স্মৃতি আর বিস্মৃতি যদি কোনো জাতির মধ্যে সমানভাবে কার্যকর না থাকে, তবে যে সেই সমাজ যথেষ্ট হিতকর হয়ে উঠবে না, তা-ও আমাদের জানিয়ে রেখেছেন।

বিশ্বসমাজ তো বটেই, অধুনাতন বাংলাসমাজও দেখি, বর্তমানকাল ছাড়া আর কিছুই ভাবতে চান না। সে-ও নিত্য-বর্তমানকাল নয়, বরং এই মুহূর্ত, যাকে আমরা ‘এখন’ বা ‘পারটিকুলার-নাউ’ বলি। ইতিহাস বা দর্শনশাস্ত্রে ‘এখন’ বা এই ‘পারটিকুলার-নাউ’ প্রত্যয়টির বেশ মূল্য আছে। এ নিয়ে মহামতি হেগেল এবং পূর্বাপর অনেক দার্শনিক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছেন। কিন্তু এই ‘এখন’-এর একটা ভয়াবহ দিকও আছে। যেমন ‘আমাকে এখনই খাবার দাও, নইলে এখনই কিনে দাও দক্ষিণোজ্জ্বল ওই ফ্ল্যাটখানা!’—‘এখন’ যে কখন জরুরি হয়ে পড়ে, তা বলা কঠিন। বহুবিস্তৃত না করে বলব, প্রভুসমাজের স্তরে যেমন একভাবে জরুরি হন তিনি, দাসসমাজের স্তরেও তিনি জরুরি হয়ে ওঠেন আরেক কারণে—এই ‘এখন’ সময়-ধারণাটি। যে প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ইতিহাসে এই ‘হয়ে-ওঠা’ হয়, তার নাম সংস্কৃতি। শাসকগোষ্ঠী এবং শোষিতগোষ্ঠীর প্রতিনিয়ত এই লড়াইয়ের নামই রাজনীতি। এই রাজনীতিই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের জীবনাচরণ কেমন হবে। তবে এই লড়াই খুব সরল নয়। অসরল, অমসৃণ এই রাজনৈতিকতার ভেতর আমাদের বাস্তবতা তৈরি হয়। আমাদের দৈনন্দিনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এই রাজনীতি। তাই জাতির স্মৃতিবোধ অথবা বিস্মৃতিবোধ একটি রাজনৈতিক ঘটনা। কখনো তা ঘটে ছাতার রং উঠে যাওয়ার মতো অতি ধীর গতিতে, কখনো আবার তাকে ঘটানো হয় বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য। বিশেষ বিশেষ শ্রেণি তার নিজের প্রয়োজনেই স্মৃতিকাতর হয় কিংবা বিস্মরণপ্রবণ হয়ে থাকে।
আজকের যে বাংলাদেশ, এখন সেখানে ‘এখন’-এর রাজত্বই প্রকট। পুঁজি-ব্যবস্থাই যেহেতু আজকের বিশ্বব্যবস্থা, তাই সেই অনুযায়ী আজকের সমাজকে বাজারকেন্দ্রিক হতে বাধ্য করা হয়েছে। সহজ কথায়, বাজার যদি কেন্দ্র হয়, তবে তার মূল কাজটি হলো মুনাফার লক্ষ্যে উৎপাদিত পণ্যকে সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া। ‘সকলি ভোগের তরে’—এই কথাটি নানা স্বরে, সুরে প্রচার করা। ভোগ আছে তো মজা আছে। মজা বিনা জীবন নাই। বুর্জোয়া সমাজে তখন মজা মারার নানান সাংস্কৃতিক অছিলা তৈরি হয়। শিল্প-সাহিত্য তা থেকে দূরে থাকতে পারে না। যে সাহিত্য তা থেকে জীবনকে দূরে রেখে মানুষের সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বলতর করার প্রয়াস পায়, তাকেই আমরা ‘প্রতিরোধের সাহিত্য’ বলি। আজকের বাংলাদেশে প্রতিরোধের সাহিত্য আর তেমন চক্ষুনজরে পড়ে না।
সেই মহাসমরের কালে, ভারতবর্ষ যখন দ্বিখণ্ডিত হয়ে-হলেও স্বাধীনতার লড়াই করছে, সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই সময়ে আধুনিক সাহিত্যের নানা রমরমে উপাদান বা মজার সম্ভাবনা ঠেলে প্রতিরোধের শিল্প-সাহিত্যের প্রতি সম্যক ইমান এনেছিলেন এবং তা এতই কম বয়সে, যা আমাদের বিস্মিত করে। সুকান্তের কাব্য-প্রতিভা নিয়ে সেকালের সবাই যদিও তারিফ করেছেন, কিন্তু কমিউনিস্ট বা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে, এমনকি মৃত্যুর অব্যবহিতকাল পরই পাশ্চাত্যবাদী আধুনিক গোষ্ঠীর কাছে কম গালমন্দ শুনতে হয়নি। হয়তো অকালমৃত্যুর কারণে সুকান্তকে তা নিজের কানে শুনতে হয়নি। কিন্তু আমাদের কানে তা পৌঁছিয়েই গেছে। কী সেই অপবাদ? সাদা কথায়—ছেলেটার এ বয়সে এত টনটনে ছন্দজ্ঞান, শব্দের এমন চমৎকার ব্যবহার, কিন্তু পার্টি-পরাধীনতার কাছে শিল্পীসত্তা গছিয়ে দিল! বুদ্ধদেব বসু তো বটেই, এমনকি আরও আরও ঘোর আধুনিকতাবাদীরা সুকান্তকে একহাত নিলেন। সুকান্তকে অপশ্চিমমুখো অনাধুনিক বলা যাবে না, কিন্তু সে সময়ের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-লড়াই এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভেতর দিয়ে নতুন আরেক ভারত তথা দুনিয়ার স্বপ্ন এই কবি দেখেছিলেন। সত্যিকার একটি আধুনিক দুনিয়ার জন্য ওই বয়সের একটি কিশোরের যে স্বপ্নোচ্চারণ, তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টিও তার আবেগকে ‘অরগ্যানিক্যালি’ নিতে পেরেছে কি না, সন্দেহ।
যাহোক, যে মানব-প্রেম আর আকুতি সুকান্তকে কবিতার কাছে নিয়ে গিয়েছিল, তার সঙ্গে জীবনকে জড়িয়ে নিলে তো সেই বিশ্বাসকে দোষ দেওয়া যাবে না। বরং বিশ্বাসের ভিত বা কাঠামো যেভাবে ওই মতাদর্শের নির্মাতারা তৈরি করেছিলেন, দোষ থাকলে সেখানে থাকতে পারে। কিন্তু কোন এক—হয়তো-বা দূরবর্তী সত্যের প্রতি বিশ্বাসের কারণে একটা ঊন-একুশ তরুণের প্রতি যে বাণী তৎকালীন আধুনিক কবিরা দিলেন, সেটি কতটুকু গ্রহণযোগ্য, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্তত, সেই সময়কাল পেরোনোর অনেক দিন পর আমরা যখন ‘এখনবাদী বা তাৎক্ষণিকতাবাদী’ ভোগের বাজারে একটা আয়নামহলের বাসিন্দা হয়ে আছি, তখন, আধুনিকবাদী সাহিত্যের মূল্য সম্পর্কে আমাদের নতুন ধারণা তৈরি হতেই পারে। এবং নতুন কোনো বৈপ্লবিক চিন্তার উন্মেষ না থাকলেও, তাকেই পাতে তুলে নিতে হবে—তেমনটি না-ও হতে পারে। অতি-সাম্প্রতিককালে আমরা কবিতাকে গঠন-সংগঠনে তাই যেন একটু পেছনমুখী হতে দেখি। একটা শুরুর আরম্ভ আমরা দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো খেয়াল করি, যা রবীন্দ্র-আকাশেরও অনেক পেছনের আকাশ থেকে মিটিমিটি স্বাগত জানাচ্ছে। এই যে স্বর পাল্টানোর একটা চেষ্টা, তা সুকান্তের মতাদর্শ অনুযায়ী না হোক, কিন্তু রবীন্দ্রোত্তর আধুনিকের মতো নয়। সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক চিন্তা না থাকলেও বৈপ্লবিক ইচ্ছাকে সম্মান তো জানাতে হবে। ‘কিশোর কবি’ সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রথম ও প্রধান প্রাসঙ্গিকতা আজ সেটাই।
সে যুগের সাহিত্যসভায় বুদ্ধদেব বসু একজন বহুমাত্রিক মানুষ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সুগভীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ। কিন্তু ভারতবর্ষ কি বাংলার সমাজের স্বার্থে তাঁর কোনো বৈপ্লবিক চিন্তা আমাদের বড় পরিসর তৈরি করে দিতে পারেনি। রাজনৈতিক লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে একটি জাতির উত্থানের ভেতর-রসদও খুব একটা লভ্য নয় তাঁর সাহিত্যে। পাশাপাশি বরং জীবননান্দই সেই মহত্তম কবি, যিনি নৈরাশ্যকাতরতা নিয়েও এ সমাজের একটা জটিল ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আধুনিকতাবাদীর সেই ‘ভূত’ তাঁকেও ছাড়েনি, যেখানে ‘কবিতা লোকশিক্ষা’ নয়—এ জাতীয় মন্তব্য তিনি করেছেন—কী ভেবে, কে জানে। ভারতীয় জ্ঞানের জগতের পরম্পরার শিক্ষা তো লোকশিক্ষাই, পরম্পরার শিক্ষাই তো অনাগত ইতিহাসে টানা আর পোড়েন মিলিয়ে তৈরি করে থাকে জীবনের বয়ান। (বয়ান ও বয়নের ফারাক আর কতটুকু। ইংরেজি Text শব্দটির Textile হয়ে উঠতে বেশি দূর যেতে হয় না!) সুকান্ত ভট্টাচার্য জীবনের সেই বয়ানের মধ্যেই মাকুর মতো নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।