হাসনাত আবদুল হাইয়ের (জন্ম: ১৭ মে ১৯৩৭) আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
হাসনাত আবদুল হাইয়ের (জন্ম: ১৭ মে ১৯৩৭) আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

হাসনাত আবদুল হাইয়ের ৯০তম বর্ষে পদার্পণে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাংলা সাহিত্যের এক নিরলস নির্মাতা

কলকাতার রানাঘাটের সেই ছোট্ট জানালার ধারে দাঁড়িয়ে যে শিশু একদিন পৃথিবী দেখত, সে-ই পরে হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিক। তাঁর শৈশবের গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল, একজন লেখকের জন্ম আসলে খুব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা থেকে হয়। জানালার বাইরে মানুষ দেখা, সমাজ দেখা, বৈষম্য দেখা—এসবই হয়তো তাঁর ভেতরে তৈরি করেছিল সেই দৃষ্টি, যা পরে সাহিত্যে রূপ নিয়েছে।

তিনি হাসনাত আবদুল হাই। যে সাহিত্যিক দেখেছেন দুর্ভিক্ষের মানুষ, যক্ষ্মারোগী, স্বদেশি আন্দোলনের মিছিল। দেখেছেন যুদ্ধের আতঙ্কে কলকাতা থেকে পালিয়ে আসা মানুষের ভিড়। ছোটবেলাতেই বুঝতে শুরু করেছিলেন, মানুষের জীবন কেবল ব্যক্তিগত নয়, ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

পুলিশ কর্মকর্তা বাবার বদলির চাকরির কারণে তাঁর শৈশব কেটেছে নানা শহরে। কখনো মক্তবে পড়েছেন, কখনো হাইস্কুলে। পরে যশোরে গিয়ে বইয়ের জগৎ তাঁকে গভীরভাবে টেনে নেয়। পাড়ার ছোট ছোট লাইব্রেরি আর বন্ধুদের মধ্যে কে কত বই পড়েছে, সেই প্রতিযোগিতা থেকেই শুরু হয় তাঁর পাঠাভ্যাস। প্রথমে মোহন সিরিজ, পরে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, মনোজ বসু, সুশীল জানা—ক্রমে সাহিত্য হয়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব জগৎ।

ফরিদপুর জিলা স্কুলের সেই ঘটনাটিও মনে রাখার মতো। মাঝপথে ভর্তি হতে এসে তিনি প্রধান শিক্ষককে বলেছিলেন, ‘আমি আগের স্কুলে ফার্স্ট বয় ছিলাম। এখানেও ফার্স্ট হব।’ আত্মবিশ্বাসের সেই দীপ্তি তাঁর পুরো জীবনেই দেখা যায়।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস—একটি দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা। শিক্ষকতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সমগ্র পাকিস্তানে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে প্রশাসনে যোগ দেন।

হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘কলকাতা রানাঘাট’ বইয়ের প্রচ্ছদ

সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে গভীর করেছে—এ কথা তিনি নিজেই বলেছেন। প্রশাসনের কাজে তিনি কাছ থেকে দেখেছেন মানুষের জীবন, ক্ষমতার বাস্তবতা, গ্রাম ও শহরের ভিন্ন জগৎ। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে দিয়েছে একধরনের বাস্তব শক্তি।

আজও তিনি লিখে চলেছেন। ৮৯ বছর বয়সেও নতুন উপন্যাসের পরিকল্পনা করছেন। বলছিলেন, ‘চার পুরুষ’ নামে একটি বড় কাজে হাত দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে তখনো একজন সৃষ্টিশীল মানুষের উদ্বেগ—কাজটি মনের মতো করে শেষ করতে পারবেন কি না।

এই অস্থিরতাই একজন প্রকৃত লেখকের লক্ষণ। লেখালেখি তাঁর কাছে কখনো অভ্যাসমাত্র নয়, বরং একধরনের দায়।

তরুণদের জন্য তাঁর পরামর্শও গুরুত্বপূর্ণ—লেখক হতে হলে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হবে। শুধু নিজের ভাষা নয়, অন্য ভাষার সাহিত্যও পড়তে হবে। কারণ, সাহিত্য শেষ পর্যন্ত মানুষের অভিজ্ঞতার ভান্ডার।

আজ ৯০তম বর্ষে পদার্পণে তাঁকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। তিনি সুস্থ থাকুন, লিখে চলুন। বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে ঋণী।

  • আনিসুল হক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক