
জন লেননকে নিয়ে মাতামাতি বাংলাদেশি হিসেবে আমাদের জন্য কিছুটা কষ্টকর, খানিকটা অযৌক্তিকও হতে পারে। কথাটি বললাম এ কারণে যে জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্করের উদ্যোগে ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের সাহায্যের জন্য নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার চত্বরে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ তিনি শুধু অনুপস্থিতই থাকেননি, বরং পরবর্তীকালে সেই সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে নানা রকম কটুকথাও বলেছেন। ফলে সেই দিক দিয়ে দেখলে এমনও কেউ কেউ মনে করতে পারে, গানে গানে আমাদের সবার প্রতি শান্তির যে আহ্বান জানিয়েছেন জন লেনন, সম্ভবত সেটাও ছিল তাঁর একধরনের লোকদেখানো চাল।
‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নিয়ে লেননের উষ্মার কারণ এবং এ-সংক্রান্ত কটু বাক্যালাপ নিয়ে গত বছরের শেষে দীর্ঘ এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে শো বিজ সাময়িকীতে। কনসার্টের আয়োজন নিয়ে বিটলসের সাবেক সদস্যদের মধ্যে যে তিক্ততা দেখা দিয়েছিল, সে বিষয়ে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য উঠে আসে ওই প্রতিবেদনে। উল্লেখ্য, ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ অংশ নেওয়ার জন্য জর্জ হ্যারিসনসহ উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও বিটলসের নেতৃস্থানীয় দুই সদস্য জন লেনন ও পল ম্যাককার্টনি এতে অংশ নেননি।
জর্জ হ্যারিসন অন জর্জ হ্যারিসন নামে প্রকাশিত বইয়ে কনসার্ট আয়োজন নিয়ে উল্লেখ করা মন্তব্যে হ্যারিসন অবশ্য বলেছেন, বাংলাদেশের দুর্দশাকবলিত মানুষের সাহায্যের জন্য কনসার্ট আয়োজনের পেছনে জন লেনন তাঁকে পরোক্ষভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। লেনন সেই সময়ে শান্তি আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সেই রাজনৈতিক অবস্থানকে ইতিবাচক বিবেচনা করেই এ রকম মন্তব্য করেন হ্যারিসন। তবে লেনন অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান থেকে সেই ধারণার মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর মূল্যায়ন ছিল সম্পূর্ণ নেতিবাচক। পরবর্তী সময়ে করা এক মন্তব্যে লেনন বলেছিলেন, সেই পুরো আয়োজন ছিল অর্থ উপার্জনের প্রতারণামূলক পাঁয়তারা।
জর্জ হ্যারিসন অবশ্য তাঁর বইয়ে লেননের করা ওই মন্তব্য খারিজ না করে নিজের অতীতের সেই বন্ধুর পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছিলেন, লেনন ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি কিনা নিজের তাৎক্ষণিক কোনো অনুভূতি কড়া ভাষায় বলতে দ্বিধা করতেন না। ফলে এ মন্তব্যকেও সে রকম অবস্থান থেকে দেখেছেন জর্জ। এটা অবশ্যই ছিল তাঁর চারিত্রিক উদারতার একটি দিক। জর্জ হ্যারিসন তাঁর বইয়ে এ রকম উল্লেখ করেছেন বলে বলা হয় যে কনসার্টের ধারণাটাও তিনি অনেকটা লেননের কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
জন লেনন পরেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে হ্যারিসন আর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা থেকে থেমে থাকেননি। তিনি এমনও বলেছেন, প্রচারভিত্তিক কনসার্টের আয়োজন না করে বরং দাতব্য উদ্যোগ গ্রহণ করে সেই একই উদ্দেশ্যে অর্থ দান করা তিনি বেছে নিতেন। ১৯৮০ সালে প্লে বয় সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেনন বলেছিলেন, ‘মঞ্চে উঠে বিশ্বকে রক্ষা করার ব্যবসায় নিজেকে জড়িত করতে আমি রাজি নই। সে রকম আয়োজন সব সময় হয়ে থাকে বিশৃঙ্খল এবং এর থেকে যাঁদের সবচেয়ে খারাপ প্রাপ্তি হয়, তাঁরা হলেন শিল্পী।’
এমন মতামতের সঙ্গে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’কেও তিনি যুক্ত করছেন কি না, প্রশ্নটির উত্তরে আরও যে কদর্য মন্তব্য লেনন করেছিলেন, তা হলো—‘বাংলাদেশ ছিল কাকা’।‘ কাকা’ শব্দটি ইংরেজিতে স্ল্যাং হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যার অর্থ বিষ্ঠা। শিল্পীদের যে সেখানে কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি, সে প্রসঙ্গে তিনি এমন তিক্ত মন্তব্য করেন।
দ্য বিটলস ডায়েরি বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডেও ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ সম্পর্কে লেননের একই ধরনের মন্তব্য দেখা যায়। এখানে তাঁর বক্তব্য, ‘সবাইকে সেখানে অর্থ দেওয়া হচ্ছে শুধু শিল্পীদের ছাড়া। এটা নির্ভেজাল প্রতারণা হলেও শিল্পীদের তা ভালো মানুষ হিসেবে তুলে ধরে।’
যে সময়ে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজন করা হয়েছিল, বিটলস তত দিনে ভেঙে গেছে। দলের সাবেক সদস্যদের মধ্যে চলছিল সম্পর্কের সংকট। তা সত্ত্বেও জর্জ হ্যারিসন বিটলসের অন্য তিন সদস্যের সবাইকে কনসার্টে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানান। পল ম্যাককার্টনি শুরুতেই নিজের অপারগতার কথা জানিয়ে দেন। এতে অবশ্য আশ্চর্যের কিছু ছিল না। কেননা, বিটলসের সদস্যদের মধ্যে তিনি ছিলেন আর্থিক প্রাপ্তি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি সচেতন। ফলে লাভের দেখা যেখানে নেই, এমন সবকিছু থেকে তিনি দূরত্ব বজায় রাখতেন। অন্যদিকে লেনন শুরুতে ইতিবাচক অবস্থান নিলেও এ রকম শর্ত আরোপ করেছিলেন, ইয়োকো ওনোকে গান গাওয়ার সুযোগ দিলে কনসার্টে তিনি যোগ দেবেন। হ্যারিসন অবশ্য সেই শর্তে রাজি হননি। উল্লেখ করা যেতে পারে, বিটলসের অন্য সদস্যরা দল ভেঙে যাওয়ার জন্য লেননের দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়োকো ওনোকে অনেকাংশে দায়ী করেন।
বিটলসের একমাত্র যে সাবেক সদস্য কোনো রকম আপত্তি না তুলে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ যোগ দিতে তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হয়েছিলেন, তিনি ড্রামবাদক রিঙ্গো স্টার। হ্যারিসন আর রিঙ্গো স্টার ছাড়া বিটলসের বাইরের যেসব বিখ্যাত সংগীতশিল্পী কনসার্টে অংশ নিয়েছিলেন, সেই দলে ছিলেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেসটন ও লিওন রাসেল।