>মীনা, রাজু, মিঠু—এই নামগুলো শুনলেই মনে আসে মীনা কার্টুনের মধুর স্মৃতি। এ মাসেই মারা গেছেন জনপ্রিয় কার্টুনটির পরিচালক রাম মোহন। ভারতীয় অ্যানিমেশনের জনক রাম মোহনের হাতে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল মীনা। ১৯৯০–এর দশকে জনসচেতনতামূলক এই কার্টুনটি দারুণভাবে সাড়া ফেলেছিল বাংলাদেশে। রাম মোহনকে স্মরণ করে মীনার দিকে ফিরে তাকাতেই এ আয়োজন।

‘মীনার তিনটি ইচ্ছা’ নামের সেই পর্বটির কথা হয়তো মনে আছে অনেকের। যেখানে জাদুর প্রদীপ থেকে দৈত্য বেরিয়ে এসে মীনার কাছে জানতে চায়, ‘তুমি কি সিনেমার নায়িকা হতে চাও?’ মীনার হাসিমুখ জবাব, ‘না, আমি চাই, সবাই ছাই বা সাবান দিয়া হাত ধুইব।’ দৈত্যের আক্কেলগুড়ুম, এ আবার কেমন ইচ্ছা! তবে সিনেমার নায়িকা হতে না চাইলেও মীনা ঠিকই নায়িকা হয়ে উঠেছে; যাকে বলে বাস্তবের নায়িকা। একটি কার্টুন চরিত্র আবার কী করে বাস্তবের নায়িকা হয়ে ওঠে? ছোট্ট একটি তথ্য শুনুন, বাংলাদেশের শহুরে শিশু–কিশোরদের মধ্যে প্রায় ৯৭ ভাগ মীনাকে চেনে। আর গ্রামে চেনে ৮১ শতাংশ শিশু–কিশোর। ইউনিসেফের এ তথ্যই বলে দেয়, মীনার জনপ্রিয়তা ‘সিনেমার নায়িকা’র চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এত জনপ্রিয়তার পেছনে বেশ কিছু কারণ আছে। মোটাদাগে দুটি—এক. মীনা সিরিজটি আগাগোড়া আনন্দদায়ক। অন্য সবকিছু পাশে রেখে স্রেফ কার্টুন সিরিজ হিসেবে দেখলেও মীনা দশে আট পাওয়ার যোগ্য। দুই. মীনা মুশকিলের আসান। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গবৈষম্যসহ সামাজিক নানা সমস্যার সহজ সমাধান দেখিয়ে দিয়েছে ও।
সব দিক বিচারে মীনাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র বললে মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পর্দায় তার প্রথম আবির্ভাব। তার প্রায় পরপরই কমিকস বইয়ের পৃষ্ঠাতেও দেখা গেছে ওকে। সেই কমিকস দেশের প্রায় সব স্কুলে বিতরণ করা হয়েছে বিনা মূল্যে। মীনার গল্প শোনা গেছে বেতারে। পোস্টার, বুকলেট, স্কুলের দেয়ালেও নজর কেড়েছে মীনার ঝলমলে মুখ। এমনকি রিকশাচিত্রেরও বিষয় হয়ে উঠেছে ও। কেবল বাংলাদেশেই নয়, মীনার যাত্রা একই সঙ্গে শুরু হয় সার্কভুক্ত আরও তিন দেশ—ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে। শুরুতে মীনার বয়স ছিল ৯। ২৬ বছর বাদে ওর বয়স একই আছে। যেমনটা হয় আর দশটি কার্টুন চরিত্রের বেলায়। আর আবেদন? এ প্রসঙ্গে আমরা পরে আসছি।
শুরুর কথা
সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব রিজিওনাল কো–অপারেশন, সংক্ষেপে সার্ক, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল মেয়েশিশুর দশক হিসেবে ঘোষণা করে। এ উপলক্ষে একটি অ্যানিমেটেড সিরিজ তৈরি করে দক্ষিণ এশিয়ায় মেয়েদের আনন্দ ও উৎসাহ দিতে চেয়েছিল জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। মীনা নিয়ে ভাবনার শুরু তখন থেকেই। বাংলাদেশে সে সময় ইউনিসেফের যোগাযোগ কর্মকর্তা ছিলেন নিল ম্যাকি। মীনার ভাবনা আসে তাঁর মাথা থেকেই। নিল ম্যাকির লেখালেখির চর্চা ছিল। বাংলাদেশে কাজ করার সুবাদে দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল তাঁর। ফলে এ অঞ্চলের শিশুদের কাছে আপন হয়ে উঠবে, এমন এক নাম খুঁজে পাওয়ার মতো জ্ঞানগম্যি তাঁর যথেষ্টই ছিল। এবং সেটির প্রমাণ মীনা নামটি। এর পেছনে জরিপ–গবেষণা তো ছিলই। মীনা নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রকল্পটির নামও দেওয়া হয় মীনা কমিউনিকেশন ইনিশিয়েটিভ (এমসিআই)। প্রাথমিকভাবে এর শুরু হয় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের শিশুদের কথা মাথায় রেখে। এতে আর্থিক সহযোগিতা করে নরওয়ে সরকার। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাও ছিল। আর দক্ষিণ এশিয়ার চার দেশের সরকার, বেসরকারি সংস্থা, প্রচারমাধ্যমও এর সঙ্গে যুক্ত হয় আন্তরিকভাবে। ইউনিসেফ চায়নি মীনা কোনো ভুক্তভোগী চরিত্র হোক। বরং পরিকল্পনা ছিল, ও যেন সমাজের আদর্শ হয়ে ওঠে। শিশু অধিকার, বিশেষ করে মেয়েশিশুর অধিকার রক্ষায় সক্রিয় এক চরিত্র হিসেবেই মীনাকে দেখতে চেয়েছিল সংস্থাটি।
মীনার নাম ও চেহারা
ইউনিসেফ মীনার প্রথম পর্বের কাজ হাতে নেয় পরীক্ষামূলক হিসেবে। ‘মুরগিগুলো গুনে রাখো’ নামের ওই পর্বটির গল্প লিখেছিলেন র্যাচেল কার্নেগি। ১৯৯১ সালে মীনা প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। গল্পটি লেখার পর চার দেশের বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা নেওয়া হয়। এর বিনোদন মান, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং উপলব্ধির জায়গাগুলো যাচাই করা হয় মাঠপর্যায়ে গিয়ে। মতামত নেওয়া হয় শহর–গ্রামের ১০ হাজার শিশু ও অভিভাবকের। মূল্যায়ন শেষে গল্পে বেশ কিছু অদলবদলও হয়। তারপর আবারও পর্যালোচনা। মোটকথা, মীনা দক্ষিণ এশিয়ার হাজার হাজার মানুষের মতামত, পর্যালোচনা ও গবেষণার ফল।
র্যাচেলের গল্প চূড়ান্ত হলে পরে আসে মীনার রূপদানের বিষয়টি। কেমন হবে মীনা? গল্পের বিষয় নিয়ে নাহয় জনগণের মত নেওয়া চলে, সুরত নিয়ে তো তা সম্ভব নয়; এর সমাধান শিল্পীদের হাতে। তাই নিল ম্যাকি ও র্যাচেল কার্নেগিরা চার দেশের শিল্পীদের সঙ্গে দফায় দফায় বসেন। বাংলাদেশে এসে বৈঠক করেন প্রখ্যাত তিন চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবী ও শিশির ভট্টাচার্য্যের সঙ্গে। প্রস্তাবিত মীনার নমুনাচিত্র হিসেবে রফিকুন নবী আঁকেন শাড়ি পরা গ্রামীণ এক মেয়েশিশুকে। মুস্তাফা মনোয়ার দেন পরিবেশের ধারণা। শেষমেশ সব দেখেশুনে মীনার রূপ দেন প্রকল্পটির অ্যানিমেশন বিভাগের প্রধান রাম মোহন, যাঁকে বলা হয় ভারতীয় অ্যানিমেশনের জনক। মীনার সঙ্গে তৈরি করা হয় রাজু, মিঠু, মীনার মা–বাবাসহ আরও একঝাঁক চরিত্র। শুরুতে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিল, স্কার্ট পরা একটি মেয়ে কী করে গ্রামের শিশু–কিশোরদের কাছে আপন হয়ে উঠবে? রাম মোহনের জবাব ছিল, ‘দক্ষিণ এশিয়ার সব শিশু–কিশোরের কাছে কমন পোশাক হিসেবেই স্কার্ট বেছে নেওয়া হয়েছে।’ এখন আমরা উপলব্ধি করি, স্কার্ট পরলেও মীনা সবার আপন হয়ে উঠেছে ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের গুণে। একই কথা প্রযোজ্য মীনা সিরিজের পরিবেশ অর্থাৎ, ঘরবাড়ি, ফসলের খেত থেকে শুরু করে মাটির রঙের বেলায়ও। এগুলোও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে গল্পের বিষয়ের কারণে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ায় মেয়েশিশুদের সামাজিক অবস্থান ছিল একই রকম। অর্থাৎ সমস্যা একই ছিল বলে পছন্দের স্রোতও মিলেছিল এক মোহনায়।
মীনা দেশে দেশে
বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি ও উর্দু—এই পাঁচ ভাষায় শুরু হয় মীনার কার্যক্রম। এগুলোই আবার অনূদিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার ১৭টি ভাষায়। প্রথম পর্বটি ডাব করা হয় ৩০টি ভাষায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত অ্যানিমেশন স্টুডিও হান্না–বারবেরার ম্যানিলা কার্যালয়ে হয় এর চলচ্চিত্রায়ণ। সেখানে কাজের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার শিল্পীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়। বাংলাদেশ থেকে তাতে অংশ নেন শিশির ভট্টাচার্য্য। সে সময় প্রথম পর্বের মুরগিচোর চরিত্রটি আঁকেন তিনি।
১৯৯২ সালে মীনা প্রকল্পে গবেষক হিসেবে যুক্ত হন ভারতের মীরা আঘি। আড়াই হাজারের বেশি মানুষের কাছে প্রথম পর্ব সম্পর্কে মতামত নেন তিনি। একই সঙ্গে মীনা প্রকল্পের গবেষণা কাজের প্রশিক্ষণ দেন চার দেশে। পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি সাফল্যের মুখ দেখার পর ইউনিসেফ দ্বিতীয় পর্বের কাজ শুরু করে। এর সময়কাল ১৯৯৩–১৯৯৭। উদ্যোগ নেওয়া হয় আরও ১২টি প্যাকেজ এবং সংশ্লিষ্ট উপাদান তৈরির ব্যাপারে। গবেষণা হয় আরও গভীরে গিয়ে। এতে চিত্রনাট্যকার ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে র্যাচেল কার্নেগি, রিসার্চ ডিরেক্টর হিসেবে মীরা আঘি, অ্যানিমেশন ডিরেক্টর হিসেবে রাম মোহন এবং সহচিত্রনাট্যকার হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের নুজহাত শাহজাদী। বাংলাদেশে বাস্তবায়ন সমন্বয়কারী হিসেবেও দায়িত্ব পান নুজহাত।
দ্বিতীয় পর্বের ধারাবাহিকতায় ইউনিসেফ প্রতিবছর মীনার নতুন গল্প প্রকাশ করে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তানের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের শিশুরা পরিচিত হয় মীনার সঙ্গে। লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের টেলিভিশনেও এটি সম্প্রচার করা হয় নিয়মিত। পরে মীনা পৌঁছে গেছে প্রশান্ত মহাসাগরের নিঝুম দ্বীপ কিরিবাতিসহ আরও কিছু অঞ্চলে। এ পর্যন্ত মীনার ৩৭টি পর্ব প্রচারিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রথম পর্বের কাজ হয়েছে হান্না–বারবেরা স্টুডিওতে। পরের ১৫ পর্ব মুম্বাইয়ে রাম মোহনের স্টুডিওতে। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ১৬টি পর্ব তৈরি হয়। এগুলোর পরিচালক ছিলেন রাম মোহন। তারপর মীনার কাজ হয় বাংলাদেশে, টুনবাংলা নামের স্টুডিওতে। নতুন পর্বের পাশাপাশি মীনাকে ঘিরে বেশ কিছু পণ্যও বাজারে আনে ইউনিসেফ। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমে শিশুবিষয়ক প্রতিবেদন ও উপাদান সৃষ্টিতে উৎসাহ দিতে ২০০৫ সালে চালু করে ‘মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৬ সালে চালু করে স্মার্টফোনের জন্য ‘মীনা গেম’।
শুরুতে মীনার আবেদনের প্রসঙ্গটি এসেছিল। মীনা কি এখনো আগের মতোই জনপ্রিয়? কিংবা এ সময়ে মীনা কতটা প্রাসঙ্গিক? প্রথম প্রশ্নের উত্তর আগেই দেওয়া হয়েছে, কেবল কার্টুন সিরিজ হিসেবে দেখলেও মীনা বেশ উপভোগ্য। এখনো নব্বইয়ের দশকের শিশু–কিশোরেরা মীনা দেখে স্মৃতিকাতর হয়। এ কালের শিশুরাও মীনার ভক্ত হয়ে ওঠে এক দেখায়। মীনা যে সমস্যা সামনে রেখে তৈরি হয়েছিল, তার কিছু হয়তো প্রায় সমাধানের পথে। মেয়েশিশুদের প্রায় শতভাগই এখন স্কুলে যায়। স্বাস্থ্য খাতেও উন্নতি চোখে পড়ে। তবে মেয়েশিশুদের সঙ্গে বৈষম্য ও নির্যাতনের যে চিত্র দেখছি, তাতে কি মনে হয় না মীনা এখনো প্রাসঙ্গিক? মীনার প্রয়োজন এখনো ফুরায়নি!
রাম মোহন
রাম মোহনের জন্ম ১৯৩১ সালে। পুরো নাম রাম মোহন মিয়া। পেশায় ছিলেন কার্টুনশিল্পী। ১৯৫৬ সালে কাজ শুরু করেন ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে। প্রায় এক যুগ চলচ্চিত্রে কাজ করার পর নতুন কর্মজীবন শুরু করেন অ্যানিমেটর হিসেবে। ১৯৭২ সালে চালু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘রাম মোহন বায়োগ্রাফিকস’। এরপর একের পর এক উল্লেখযোগ্য কাজ উপহার দিয়ে ক্রমেই তিনি হয়ে ওঠেন পৃথিবীর এই অঞ্চলে অ্যানিমেশনের পথিকৃৎ। অনেকেই তাঁকে সম্মানিত করে থাকেন ‘ভারতীয় অ্যানিমেশন শিল্পের জনক’ অভিধায়। ১৯৭২ সালে ইউ সেইড ইট ও ১৯৮৩–তে ফায়ার গেমস নন-ফিচার অ্যানিমেশন ছবির জন্য ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন রাম মোহন। ২০১৪ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননায় ভূষিত করে। তবে উপমহাদেশের দর্শক তাঁকে মনে রেখেছে ইউনিসেফ প্রযোজিত জনপ্রিয় কর্টুন চরিত্র মীনার স্রষ্টা হিসেবে। চলতি বছর ১১ অক্টোবর তিনি মারা যান।
সূত্র: ইউনিসেফ, অ্যানিমেশন ওয়ার্ল্ড, ওয়েব ডট আর্কাইভ ডট ওআরজি