পাথর পৃথিবীর আদিম রূপ ও আমূল পরিবর্তনের স্বাক্ষী। প্রাণহীন হলেও পাথর যেন সময়প্রবাহের কঠিন পাণ্ডুলিপি কিংবা পরিবর্তনশীল শরীর, যা এখন পর্যন্ত এই নক্ষত্রের তাপ ও চাপ সইয়ে নিয়ে প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করে বিবিধ আকারে। শিল্পী ময়নুল ইসলাম পল তাঁর ‘পাথরের বৈভব’ শীর্ষক একক প্রদর্শনীতে এ পাথরেই ঠাঁই দিয়েছেন প্রকৃতির স্বরূপকে কখনো মূর্ত বা কখনো বিমূর্ত রূপে। তাঁর আশপাশের ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা অবজেক্টগুলোকে পাথরে আকার দিয়ে জীবন্ত করে তুলেছেন, সাধারণ পাথরকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে তার অসাধারণ বৈভবকে তুলে ধরেন এই নিষ্প্রাণ নগরীতে।
কোনো শিল্পী যখন কিছু সৃষ্টি করেন, সে সময়ে তিনি আর সাধারণ মানুষ থাকেন না। ‘মানুষ’ শব্দটা যে ধারণা বহন করে, হয়তো তার থেকেও উঁচু স্তরে অবস্থান করেন তিনি। সেই স্তরে নিছক আনন্দ লাভের আশায় সাধারণ কিছু নিয়েই তৈরি করেন অসাধারণ উপস্থাপনা। এ ক্ষেত্রে শিল্পী মইনুল ইসলাম পল বেশ চ্যালেঞ্জিং কাজ করেছেন। কারণ, তাঁর উপস্থাপনার মূল উপাদান পাথর। সাধারণত এ দেশে পাথর নিয়ে কোনো রকম আর্থিক উদ্দেশ্য ছাড়াই শুধু নিজের জন্য শিল্পচর্চা করা খুবই সাহসিকতার কাজ। আর সেই সঙ্গে এ ধরনের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ করা আরও কঠিন, ব্যয়বহুল। তাই ব্যক্তিগত তাড়না বা শিল্পের প্রতি দায় থেকেই শিল্পী মইনুল ইসলাম পল একনিষ্ঠ ও নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে গেছেন পাথর নিয়ে। প্রায় ২০ বছর পর এই একক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, যা নাগরিক শিল্পচর্চায় এক নতুন সংযোজন তৈরি করে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুবাদে সেখানে অবস্থানগতভাবে পাথরের সহজপ্রাপ্যতা কিছুটা সহজ করে দিয়েছে শিল্পীর পাথরের ভাস্কর্যচর্চা। বিভিন্ন আকারে পাথরের ভাস্কর্যগুলো দেখে মনে হবে, আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে এমন চেনা, কিন্তু আবার অচেনা কিছুর বিমূর্ত অবয়ব। অমসৃণ পাথর কেটে কেটে তৈরি করেছেন মসৃণ দেহ। এর দর্শন ও স্পর্শ দর্শককে নিয়ে যাবে চিন্তার সুগভীর জলে। আমাদের মস্তিষ্কে স্মৃতির স্তূপগুলো জমাট হয়ে ফসিল বা পাথরে পরিণত হয়, সেই চিন্তার ফসিলকে জাগ্রত করে তোলে শিল্প। কোনো নতুন রূপ তৈরি করাই তো শিল্পের কাজ, যা দেখে আমরা বিস্মিত হই, নতুন চিন্তাচর্চায় মস্তিষ্ক উন্নত হয়। শিল্পীও তাঁর যাপিত জীবনের অস্থিরতা, সুখ-দুঃখের চক্র থেকে বেরিয়ে আত্মসমর্পণ করেন তাঁর শিল্পের উপাসনালয়ে, শান্তি খুঁজে পান। মুক্তির পথে হেঁটে যান, পাশাপাশি আমাদেরও সেই পথ দেখান।
এ পর্যন্ত শুধু পাথরকেন্দ্রিক প্রদর্শনী খুব কমই হয়েছে বাংলাদেশে। শিল্পীর মতে, কাজের শুরুতেই মিনিমালিস্টের মতো কম সময়ে ও পরিশ্রমে শিল্পকর্ম সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। তবে এমন কাজের ফলে কখনো পাথর দ্বারা তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রিত হন, কখনো–বা পাথরকেই নিয়ন্ত্রণ করেন। এই দুই প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে শিল্পসৃষ্টি। এসব সৃষ্টিতে প্রাণীর বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। কখনো মাছ, পাখি, কখনো মানুষের সরব উপস্থিতি থাকে, কখনো জলের মতো নরম সুরে প্রভাবিত হয় কঠিন পাথর। প্রদর্শনীতে পাথরের শিল্পকর্মে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল রূপ তাঁর দৃষ্টিতে যেমনভাবে ধরা পড়েছে, তিনি তেমনভাবেই প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন আকৃতিতে। ভাস্কর্যের মসৃণ ত্বক যেন মনে হবে নরম, কোমল কোনো প্রাণীর নমনীয় রূপ। কোনো কোনোটিতে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের রূপান্তর ফুটিয়ে তুলেছেন। আবার কোনোটি পাথরের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য শক্ত চরিত্র নিয়ে বসে আছে কঠিনভাবে। প্রকৃতির সব রকম রূপেই শিল্পী পাথরক নিয়ে খেলেছেন সাবলীল ভঙ্গিমায়। দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ভাস্কর্যচর্চার মধ্য দিয়ে শিল্পী এ সময়ের ভাষাতেই প্রকাশ করেছেন তাঁর শিল্পকর্ম, তাতে রয়েছে আধুনিকতা ও ব্যক্তির শিল্পজগতে একক ভ্রমণ। এ ছাড়া রয়েছে লোকজ ফর্মের নানা অভিপ্রকাশ, উপকরণ আবিষ্কার, পুনরাবিষ্কার ও অনুশীলনের আত্মমগ্ন খেলা।
প্রকৃতির সহজ–সরল বিষয়গুলো প্রকাশের জন্য শিল্পী পাথরের মতো এত ব্যয়বহুল ও দুষ্প্রাপ্য উপাদান কেন নির্বাচন করলেন, এ প্রশ্ন দর্শকের মাথায় আসতে পারে। তবে নবীনদের ভাস্কর্যচর্চায় এই পাথরের কাজগুলো অনেক অনুপ্রেরণার জোগান দেবে। যদিও পাথরের সংকট বা দুষ্প্রাপ্যতা তাঁদের কাজের পথটিকে অমসৃণ করে তুলতে পারে। তবে যেকোনো কঠিন পথ শিল্পীর ইচ্ছাশক্তির কাছে নমনীয় হয়ে ওঠে।
ঢাকায় লালমাটিয়ায় কলাকেন্দ্রে প্রদর্শনীর উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন ড. নাসিমা হক মিতু, সহযোগী অধ্যাপক, ভাস্কর্য বিভাগ, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং লেখক ও সাংবাদিক ইমতিয়ার শামীম। আর পুরো প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন নাসিমা হক মিতু।
প্রদর্শনী চলবে ১৮ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।