
‘অন্যস্বর’ শিরোনামে ৩৭ জন নারী শিল্পীর সৃজনভাষা মিলিত হয়ে নারীত্ববাদের বহুমাত্রিক অভিব্যক্তিকে সংবেদনশীল ও চিন্তাশীল রূপে উন্মোচিত করেছে আয়োজক বেঙ্গল শিল্পালয়। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পচর্চার প্রান্তে থাকা নারীকণ্ঠগুলো এখানে নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, মাধ্যম ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে নতুনভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যা সমকালীন শিল্পভাষায় নারীর অবস্থান, অবদান ও প্রতিরোধকে নান্দনিক দৃঢ়তায় চিহ্নিত করে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অমর পঙ্ক্তি, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি, চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। নারীর সৃজনশীল শক্তিকে কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং সভ্যতার মৌলিক নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। অন্যস্বর প্রদর্শনীর নারী শিল্পীদের কাজ এই ঘোষণাকে কাব্যিক সত্য থেকে দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ দেয়। এখানে নারীত্ব কোনো পরিপূরক পরিচয় নয়। এটি নিজস্ব ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নান্দনিক বোধ নিয়ে শিল্পের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করে।
প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলোতে প্রতীকী অন্তর্লিখন নারীর অভিজ্ঞতাকে কেবল আবেগের স্তরে সীমাবদ্ধ রাখে না, বরং তা রূপ নেয় সমালোচনামূলক বয়ানে। দেহ, স্মৃতি, গৃহ, প্রকৃতি কিংবা ভাঙা কাঠামো—এসব মোটিফ নারীর শ্রম, অবদমন ও সৃজনশীলতার দ্বৈত বাস্তবতাকে উন্মোচিত করে। নজরুলের কবিতায় যে সমতা উচ্চারিত, এই শিল্পীরা তা প্রশ্ন, প্রতিরোধ ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন অর্থে নির্মাণ করেন। তাঁরা দেখান, ‘মহান সৃষ্টি’ কেবল ঐতিহাসিক ক্যাননে স্বীকৃত কাজ নয়, বরং নীরব, প্রান্তিক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাও শিল্পের উৎকর্ষে রূপ নিতে পারে।
অন্যস্বর তাই নারীত্ববাদকে প্রতিনিধিত্বের সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এটি শিল্পের মানদণ্ড নির্ধারণে নিহিত পিতৃতান্ত্রিক পক্ষপাতকে উন্মোচন করে এবং প্রমাণ করে—নজরুলের উচ্চারণ আজও প্রাসঙ্গিক, তবে তাকে নতুন চোখে দেখা জরুরি। এই প্রদর্শনীতে নারী শিল্পীরা কেবল ‘অর্ধেক’ নন, তাঁরা শিল্পভাষার পূর্ণ বিস্তারে সমান, স্বতন্ত্র ও অপরিহার্য নির্মাতা।
গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর বেঙ্গল শিল্পালয়ে কামরুল হাসান এক্সিবিশন হলে শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি গতকাল ৩১ জানুয়ারি শেষ হয়েছে।