‘মৃত হয়ে যাওয়া একটি জীবন্ত পরিসরে আবার প্রাণের স্ফুরণের ইশারা। সেটাই আমার এই শিল্পযাত্রা।’ ‘আলো’ শীর্ষক তাঁর প্রদর্শনী সম্পর্কে শিল্পী মাহবুবুর রহমানের উপলব্ধি এমনই। গত বছর ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলোর নিজস্ব ভবনে হামলা ও আগুন ধরিয়ে দেয় উগ্রবাদী সন্ত্রাসীরা। এতে ভস্মীভূত হয় ভবনটি। এই স্থান, স্থাপনা ও পুড়ে যাওয়া উপকরণ নিয়ে এ শিল্পায়োজন করেছেন মাহবুবুর রহমান।
‘শিল্প তা নয় যা আপনি দেখেন, বরং শিল্প হলো তা যা আপনি অন্যকে দেখান।’ ফরাসি চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর এডগার ডেগাসের এ কথা অনুযায়ী মাহবুবুর রহমান দর্শকদের দেখাচ্ছেন প্রাণের স্ফুরণ। অবশ্য দর্শকের শিল্পকে উপভোগের যে অধিকার, তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার যে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে, সেটির মাধ্যমে শিল্পকে গ্রহণ ও পাঠ করতে উৎসাহিত করে অবধারিতভাবে। তবে ‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনী যতটা না শিল্প বা ভিজ্যুয়ালের প্রতি দায় তৈরি করে, এর থেকে অনেক বেশি দায় তৈরি হয় অভিজ্ঞতার কাছে। যার ফলে শরীর, মন, স্মৃতি আর অর্জিত বিদ্যা একাকার হয়ে মুখোমুখি করে বিলীন হওয়া সভ্যতার অবশিষ্ট স্মারকের দিকে।
প্রথম আলো গণমাধ্যম হিসেবে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি দায়িত্বশীল, বাক্স্বাধীনতার প্রতিও দায়বদ্ধ। হামলার ঘটনায় পুড়ে যাওয়া ভবনে ছিল তাদের প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া প্রশাসনিক বা হিসাবসংক্রান্ত অফিসও ছিল। আর ছিল ডিজিটাল বিনোদন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অফিস। সবার জন্য উন্মুক্তও ছিল না পুরো ভবনটি। আধুনিক সুবিধা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল এতে। ছিল কর্মরত ব্যক্তিদের যাঁর যাঁর ব্যক্তিগত পরিসর। গুটেনবার্গের ধারাবাহিকতায় ডিজিটাল সময়ের সব উপাদানই ছিল এই ভবনে। বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য ও বিদ্যাকে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছানোর কাজটি হতো এই ভবন থেকে।
ধ্বংস হওয়া এই ভবনটির ‘প্রাইভেট স্পেস’ উন্মোচিত হলো ‘পাবলিক স্পেসে’ শিল্পী মাহবুবুর রহমানের মাধ্যমে। এই কাজটি ছিল তাঁর কাছে অনেকটা ১৯৯৪ সালে করা ‘স্বর্গে যাওয়া’ ভাস্কর্যের মতো। সবাই মিলে একটা কফিন ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে—এই ছিল ভাস্কর্যটির বিষয়। এরপর ৩০ বছরের বেশি সময় পার হয়েছে এই বিশ্বের। দৃশ্যশিল্পের পরিধি ও বৈশিষ্ট্যের বৈশ্বিক প্রবণতা পরিবর্তিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রবলভাবে। শিল্পী মাহবুবুর রহমানও এই যাত্রার অংশীদার। শৈল্পিক প্রকাশ থেকে বরং অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে প্রকাশিত হওয়াই এই সময়ের শিল্পের ভাষা।
অঙ্গার হয়ে যাওয়া প্রথম আলো ভবন শিল্পী মাহবুবুর রহমানের কাছে তাই উপাদান ও উপকরণের কোনো অবশিষ্ট অংশ নয়। তাঁর কাছে সবকিছুই জোসেফ বয়েসের ভাঙা ছুরির মতোই অমূল্য। হয়তো এ কারণেই পুড়ে যাওয়া প্রযুক্তির নানা উপকরণের ওপর স্থাপন করলেন প্রকৃতির নিবেদিত নির্দশন। প্রযুক্তিকালে, যন্ত্রনির্ভরতার যুগে প্রকৃতির প্রতি নিষ্ঠাই হয়তো সভ্যতার নিরাময়ের পথ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া পরিসরকে আবার গড়ে তোলার শক্তি। এ জন্যই হয়তো একঝাঁক জ্যান্ত কবুতর প্রাণের ইঙ্গিত হয়ে আসে।
মাহবুবুর রহমান এ শিল্পায়োজন করতে গিয়ে অনেক বেশি নির্ভর করেছেন ইঙ্গিতে, চিহ্নে, অনুভূতিতে, ভাষায়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মতো একের পর এক আগুনে পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষকে সাজিয়েছেন অভিজ্ঞতাকে জীবিত রাখতে—স্মৃতির কোটরে যেন এগুলো হারিয়ে না যায়। সৈয়দ শামসুল হকের নূরলদীনের সারাজীবন-এর পঙ্ক্তিতে থাকা অভাগা মানুষ আবার জেগে ওঠার মতো আশা করেন তিনি। হাজারেরও বেশি বইকে বন্দী করে রাখার কাঠামোতে নিয়ন আলোতে লেখেন এই কবিতা। নূরলদীনের সারাজীবন-এ কবি লিখেছেন, ‘কে একা নিঃসঙ্গ বসে অশ্রুপাত করে? সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপুত্রে মেশে।’ মাহবুবুর রহমানের ‘আলো’ও সবার সঙ্গে মিশে যাওয়ার একের পর এক দৃশ্যপট তৈরি করে অবশ্যই। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রদর্শনীটির শেষ দিন।