
আনন্দ ও সুখের মধ্যে যেমন সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে, তেমনি পার্থক্য রয়েছে মূর্ত ও বিমূর্ত চিত্রকলার মধ্যেও। মূর্ত চিত্র আমাদের চেনা জগতের রূপ, আকৃতি ও অনুভূতিকে দৃশ্যমান করে তোলে; দর্শক সেই পরিচিত জগতের ভেতর দিয়েই নতুন করে ভ্রমণ করেন। কিন্তু বিমূর্ত শিল্পের পরিসর ভিন্ন। সেখানে দৃশ্যমান বাস্তবতার প্রত্যক্ষ উপস্থিতি থাকে না; থাকে তার নির্যাস, স্মৃতি কিংবা অনুভূতির রূপান্তরিত ভাষা। এক অর্থে বিমূর্ত শিল্প হলো দৃষ্টির সীমানা অতিক্রম করে মনের জগতের রূপ নির্মাণ। তবে সেই নির্মাণও শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো গঠন বা ফর্মের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়। কথাগুলো বলা শিল্পী বিপ্লব বিপ্রদাসের সাম্প্রতিক একক চিত্রকলা প্রদর্শনী প্রসঙ্গে। তিনি তাঁর কাজকে কেবল ‘বিমূর্ত’ বলতে রাজি নন; বরং একে বিমূর্ত ও আধা বিমূর্তের সংমিশ্রণ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
সুন্দরবনের নদী, খাল, মাটি, জল, ম্যানগ্রোভ অরণ্য, ঋতুবৈচিত্র্য ও উপকূলীয় আবহের মধ্যে শিল্পীর বেড়ে ওঠা।
বাগেরহাটের রামপাল অঞ্চলে কাটানো শৈশব ও কৈশোর তাঁর শিল্পসত্তায় গভীর ছাপ রেখে গেছে। সেই স্মৃতির রং, গন্ধ ও আবহই আজও তাঁর ক্যানভাসে ফিরে ফিরে আসে। ঢাকায় এসে নগরজীবনের দৃশ্য ও স্থাপত্যরূপ তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীতে তিনি নগরের রূপকেই আধা বিমূর্ত ভাষায় ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই অনুসন্ধান তাঁকে পরিপূর্ণ তৃপ্তি দেয়নি। ফলে তাঁর শিল্পভাষা আবার ফিরে গেছে শিকড়ের দিকে—স্মৃতি, ভূপ্রকৃতি ও অনুভবের উৎসের দিকে।
বর্তমান প্রদর্শনীর কাজগুলোতে সেই প্রত্যাবর্তনের লক্ষণ স্পষ্ট। যদিও রং, রেখা ও টেক্সচারের ব্যবহারে সম্পূর্ণ নতুনত্বের দাবি করা যায় না। বরং বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পচর্চায় মনিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইউনুস, কিংবা মোহাম্মদ ইকবালের চিত্রভাষার নানা অনুষঙ্গ তাঁর ক্যানভাসে লক্ষ করা যায়। শিল্পী নিজেও তাঁদের প্রভাব স্বীকার করেন। তবু তাঁর কাজ নিছক অনুসরণের পর্যায়ে আটকে নেই। চিত্রপৃষ্ঠে রঙের স্তরায়ণ, উপাদানের সংযোজন-বিয়োজন এবং কোথাও কোথাও ত্রিমাত্রিক বস্তু সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার একটি স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল অভিধান নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।
জলরং, অ্যাক্রিলিক ও মিশ্র মাধ্যমে নির্মিত এসব কাজের ভেতরে উপকূলীয় ভূপ্রকৃতির স্মৃতি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সময়ের ক্ষয় ও স্মৃতির মুছে যাওয়ার প্রক্রিয়াও।
বড় ক্যানভাসে নির্মিত প্রদর্শনীর অধিকাংশ কাজই ২০২৬ সালে আঁকা—এ তথ্য বিস্ময় জাগায়। কারণ, কাজগুলোর পরত, টেক্সচার ও নির্মাণপ্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ের ধ্যানমগ্ন শ্রমের ইঙ্গিত বহন করে। শিল্পীর সৃজনপ্রক্রিয়াও স্মৃতির কার্যকারিতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। স্মৃতি যেমন কখনো স্পষ্ট হয়, কখনো আবছা হয়ে যায়, তেমনি তিনি ক্যানভাসে বারবার রূপ নির্মাণ করেন, আবার মুছে দেন; রঙের ওপর রঙের স্তর বসান; টেক্সচারের মাধ্যমে দৃশ্যকে আড়াল ও উন্মোচনের খেলায় মেতে ওঠেন।
এই পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়েই যেন শিল্পী তাঁর হারিয়ে যাওয়া ভূদৃশ্যকে পুনরাবিষ্কার করেন।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিল্পী প্রকৃতিকে সরাসরি অনুলিপি করেন না। তিনি নদী, জল, গাছ কিংবা ভূমিকে দৃশ্যমান বাস্তবতার মতো তুলে ধরতে আগ্রহী নন। বরং সেসব অভিজ্ঞতা তাঁর মনে যে রং, আবহ ও অনুভূতির জন্ম দিয়েছে, তারই চিত্ররূপ নির্মাণ করেন। ফলে দর্শক অনেক সময় পরিচিত দৃশ্যের সঙ্গে সরাসরি মিল খুঁজে পান না। কিন্তু তাতেই কাজগুলোর শক্তি নিহিত। কারণ, এগুলো দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ নয়, অনুভবের পুনর্গঠন।
প্রদর্শনীর বিভিন্ন কাজেও সেই স্মৃতি-অনুসন্ধানের দিকটি স্পষ্ট। কোনো কোনো কাজে রয়েছে স্থাপত্যের আবছা অনুরণন। ‘হারানো ভূখণ্ডের মানচিত্র’, ‘স্মরণের অবয়ব’, ‘কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল’ প্রভৃতি চিত্রে মাটির পাত্র ও ফুলের ক্ষীণ উপস্থিতি যেন বিস্মৃত সময়ের প্রত্নচিহ্ন হয়ে ওঠে। অধিকাংশ কাজেই নদী, জল, মাটি, আবহাওয়া বা প্রকৃতির প্রত্যক্ষ রূপ অনুপস্থিত; কিন্তু তাদের সত্তা ও অনুরণন সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
এই প্রদর্শনী বিমূর্ততার ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করে। কারণ, বিপ্লব বিপ্রদাসের ছবিতে যে রূপ ও রঙের বিন্যাস দেখা যায়, তা শিল্পীর স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও দেখার নিজস্ব পদ্ধতি থেকে উৎসারিত।
সুন্দরবন ও শৈশবের জাজ্বল্যমান প্রকৃতিকে তিনি হয়তো একধরনের বাস্তবতাতেই অনুভব করেন, কিন্তু সেই অনুভবের ভাষা আমাদের পরিচিত দৃশ্যরীতির সঙ্গে মেলে না। ফলে যা শিল্পীর কাছে স্পষ্ট ও বাস্তব, তা দর্শকের কাছে বিমূর্ত বলে মনে হতে পারে। এ অর্থে বিমূর্ততা কেবল শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য নয়, দর্শকের উপলব্ধির সীমা ও অবস্থানেরও প্রতিফলন। অর্থাৎ শিল্পীর দেখা সেই বাস্তব দর্শকের চোখে হয়ে ওঠে বিমূর্ত।
প্রদর্শনীর আরেকটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের অনুপস্থিতি। কোথাও ফুলের টব, কোথাও গাছপালা বা উদ্ভিদের ইঙ্গিত থাকলেও মানব আকৃতি নেই। প্রকৃতি এখানে কেবল দৃশ্য নয়; বরং একধরনের অন্তর্গত সংগীতে পরিণত হয়েছে।
রূপ, রং ও টেক্সচারের বিন্যাস যেন দৃশ্যের চেয়ে বেশি সুরের অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। দর্শক সেই সুরের ভেতর দিয়ে স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, বিস্মৃতি ও সৌন্দর্যের নানা স্তরে প্রবেশ করতে পারেন।
বিপ্লবের এই প্রদর্শনীকে তাই কেবল সুন্দরবন-স্মৃতির পুনরাবৃত্তি বলা যাবে না। বরং এটি স্মৃতি, ভূদৃশ্য ও বিমূর্ত ভাষার মধ্যকার এক জটিল সংলাপ। শিরোনামগুলো শিল্পীর ভাবনার দিকনির্দেশনা দেয় বটে, কিন্তু সেগুলোর বাইরে গিয়েও কাজগুলো নিজস্ব নান্দনিক শক্তিতে দর্শককে আকর্ষণ করে। পরিচিত দৃশ্যের পুনর্নির্মাণ নয়, বরং স্মৃতির অন্তর্লৌকিক ভূগোল নির্মাণই এ প্রদর্শনীর প্রধান অর্জন।
আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার ‘লা গ্যালারি’-তে ‘আর্থ অ্যান্ড মেমোরি’ শিরোনামে শিল্পী বিপ্লব বিপ্রদাসের তৃতীয় একক প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ৫ জুন, দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে আজ বুধবার পর্যন্ত।