
শিল্পী যখন প্রকৃতির ছবি আঁকেন, তখন সাধারণত ধরে নেওয়া হয় তিনি চোখে দেখা কোনো দৃশ্যকে ক্যানভাসে পুনর্নির্মাণ করছেন। কিন্তু শিল্পী শামছুল আলম আজাদের শিল্পকর্মগুলো সেই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে আঁকা। তাঁর ছবি আঁকার ভাবনায় প্রকৃতি কোনো প্রাথমিক বিষয় নয়; বরং রং, রেখা, আলো, টেক্সচার ও চিত্র-উপাদানের স্বতঃস্ফূর্ত বিন্যাস থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় প্রকৃতির মতো এক দৃশ্যজগৎ।
মানুষের বাইরে পাখি, মৌমাছি, উইপোকার নিজস্ব নির্মাণশৈলী কিংবা পিঁপড়ার খাদ্য সংগ্রহের চলনের রেখাচিত্র ছেলেবেলায় শিল্পীকে ভাবতে শিখিয়েছে।
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি প্রকৃতিকে কেবল দৃশ্য হিসেবে নয়, একটি সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে শেখেন। সেই ভাবনা তাঁর শিল্পচর্চার মূল ভিত্তি।
প্রদর্শনীতে শিল্পীর সঙ্গে আলাপচারিতায় তাঁর কাজের পদ্ধতি আরও স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, শিল্পের সূচনা হয় আনন্দ থেকে। যেমন সংগীত প্রথমে স্বর, ধ্বনি ও কম্পনের মধ্য দিয়ে রাগ-রাগিণীর রূপ পায়, তেমনি তাঁর ছবিও শুরু হয় রঙের একটি বিন্দু, একটি দাগ কিংবা টেক্সচারের খেলা থেকে।
সেই রং নিজস্ব গতিতে বিস্তার লাভ করে, পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, নতুন কাঠামো নির্মাণ করে। অনেক পরে শিল্পী আবিষ্কার করেন—সেই গঠনের মধ্যে যেন পাহাড়, নদী, ভূমি কিংবা আকাশের কোনো স্মৃতি জেগে উঠেছে। ফলে তাঁর চিত্রে প্রকৃতি অনুকরণ নয়; বরং রঙের আত্মবিকাশের এক পরিণতি। কখনো ক্যানভাস, কখনো কাগজে অ্যাক্রিলিক ও জলরঙে এই পরিণতিতে নির্মিত চিত্রগুলোকে তিনি তিনটি সিরিজ চিত্রে নামকরণ করেছেন।
নামগুলো হচ্ছে কাঠামোর বৈভব, রঙের বৈভব ও ভূদৃশ্যের বৈভব। দৃশ্যত তিনটি সিরিজের কাজই একই সূত্রে গাঁথা। কারণ, ভূদৃশ্যের দু-একটি ছবি বাদে নাম বদল করলেও সিরিজের ধারণার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ রং, ফর্ম, টেক্সচারের বিন্যাসই ছবির মূল উপাদান। আর এগুলো তৈরি হয় তার মনের আনন্দ থেকে। বিন্দু বিন্দু রং কিংবা রঙের স্তরায়নের অনুভূতির খেলা থেকে। সে খেলায় মন এবং তার চোখে তৃপ্তি কোনো পরিকল্পিত দৃশ্য থেকে আসে না।
‘কাঠামোর বৈভব’ সিরিজে রঙের স্তর, ক্ষয়, ঘর্ষণ, খসখসে টেক্সচার এবং ঘন-পাতলা পেইন্টের বিন্যাস ছবির প্রধান ভাষা। কোথাও ধূসর-কালোর স্তব্ধতা, কোথাও হঠাৎ লাল বা সাদার বিস্ফোরণ—এগুলো দৃশ্যের চেয়ে বেশি মনে হয় কোনো অন্তর্গত শক্তির প্রকাশ। ছবিগুলো দর্শককে নির্দিষ্ট কোনো বিষয় জানায় না; বরং ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে প্রবেশ করতে আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে ‘ভূদৃশ্যের বৈভব’ সিরিজে সেই বিমূর্ত কাঠামোই একসময় পরিচিত প্রকৃতির ইঙ্গিত ধারণ করে।
সবুজের ভেতর জেগে ওঠে কৃষিজমির বিভাজন, কোথাও নীল-ধূসরের ভেতর নদী কিংবা পাহাড়ের আবহ।
তবে জলরঙের কাজগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বচ্ছ স্তর, পানির প্রবাহ এবং রঙের স্বাভাবিক বিস্তার ছবিগুলোকে একধরনের ধ্যানমগ্ন কোমলতা দিয়েছে। কয়েকটি ছবিতে পাহাড়, নদী, আকাশ কিংবা আলোর পরিবর্তনে ভূমির রূপান্তর তুলনামূলকভাবে প্রত্যক্ষ; তবে সেখানেও অনুকরণের বদলে অনুভবই মুখ্য।
প্রদর্শনীর কাজগুলোর আকার নিয়ে ভাবনার রয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে নির্মিত অধিকাংশ কাজই ছোট মাপের ক্যানভাস বা কাগজে আঁকা।
বাংলাদেশে টেক্সচারনির্ভর বিমূর্ত চিত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৃহৎ ক্যানভাসে নির্মিত হলেও আজাদের অধিকাংশ চিত্র জমিন ছোট পরিসর। ফলে প্রতিটি চিত্র যেন ব্যক্তিগত সংলাপের মতো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। মনে হয়, শিল্পী ক্যানভাসকে সামনে রেখে নয়, কোলে নিয়েই রঙের সঙ্গে খেলেছেন। সে খেলায় হয়তো কিবরিয়ার রংচিন্তা ও সফিউদ্দীনের গঠনশৃঙ্খলার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা অনুভূত হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের স্বতন্ত্র ভাষা খুঁজে পাওয়া যায়।
‘দৃশ্যমান কাঠামো’ এমন এক প্রদর্শনী, যেখানে শিল্পী প্রমাণ করেছেন প্রকৃতি কেবল চোখে দেখা বাস্তবতা নয়; প্রকৃতি রঙের মধ্যেও জন্ম নিতে পারে। একটি বিন্দু, একটি রেখা কিংবা টেক্সচারের ক্ষুদ্র আন্দোলন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান জগতের রূপ ধারণ করতে পারে। সেই জন্মপ্রক্রিয়াই শামছুল আলম আজাদের শিল্পের মূল বিস্ময়। তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালে দর্শক শেষ পর্যন্ত কোনো ভূদৃশ্যই শুধু দেখেন না; বরং প্রত্যক্ষ করেন রঙের নিজের ভেতর থেকে দৃশ্য হয়ে ওঠার রহস্য।
নারায়ণগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টসের অধ্যক্ষ শামসুল আলম আজাদের একক চিত্র প্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ ৪ জুলাই গ্যালারি চিত্রকে শুরু হয়েছে। প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য ১৮ জুলাই পর্যন্ত খোলা থাকবে।
যেখানে রং, রেখা, টেক্সচারের দৃশ্যমান কাঠামোয় কখনো নিসর্গ, কখনো ভূদৃশ্য দেখা-অদেখার ঐশ্বর্য, দীপ্তি, মহিমার আনন্দে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তবে এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে কিবরিয়া পরবর্তী বাংলাদেশের বিমূর্ত ধারার শিল্পীদের মধ্যে রং, ফর্ম, টেক্সচারের বিন্যাসগত দৃষ্টিনন্দন ধারায় যেন একই ঐক্যের সুর বাজে।
নারায়ণগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টসের অধ্যক্ষ শামসুল আলম আজাদের একক চিত্র প্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’ ৪ জুলাই গ্যালারি চিত্রকে শুরু হয়েছে। প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য ১৮ জুলাই পর্যন্ত খোলা থাকবে।