সাইদুল হক জুইসের চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
সাইদুল হক জুইসের চিত্রকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

প্রদর্শনী

সমকালীন ছাপচিত্রের নতুন ভাষা

সন্ধ্যায় ট্রাফিক জট খুলতে খুলতে পৌঁছে যাই প্রদর্শনীর গ্যালারিতে। প্রবেশ করতেই শান্তির ছোঁয়া, যেন এক দৃশ্য বা অদৃশ্যের জাদুঘরে এসে পড়লাম; যেখানে সময় তাঁর নতুন বাক্স থেকে একঝাঁক ছাপা ছবি মেলে ধরেছে ‘সমকালীন ছাপচিত্র’ নামের প্রদর্শনীতে। আদিম কালে যে হাতের ছাপ গুহার দেয়ালে লেগেছিল নিতান্ত শিকারের লোভে, আবর্তন আর বিবর্তনের ধারায় জ্ঞান–বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সমান্তরাল রেখার মতো এগিয়ে নিয়ে গেছে সে হাতকে নতুনত্বে। বর্তমানে ছবি আঁকার অন্যতম ও জটিল মাধ্যম ছাপচিত্র। সেই ছাপচিত্র নিয়ে যাঁরা শিল্পচর্চা করছেন, এমন ১৬ শিল্পীর কাজ নিয়ে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে কলাকেন্দ্র। শিল্পীদের মধ্যে শহীদ কবির তাঁর ছাপচিত্রগুলো ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করেছেন। সভ্যতার চকচকে শরীরটা টিকে থাকে মুখোশের আড়ালে। এর নোংরা, ভণ্ডামিতে ক্রমশ কালো হতে থাকে নদীর বুক, তলদেশে পড়ে থাকে আসল ইতিহাস। আর আমাদের মন ভোলানোর জন্য কত রকম সার্কাস চলে শহরের রাস্তায়।

‘অলমোস্ট ইমপসিবল’, শহীদ কবির

মিথ্যা হাসির মোড়ক নিয়ে ছুটে চলে উদ্‌ভ্রান্ত মানুষ। এমনটাই চিন্তা হয় তাঁর ‘রাস্তার সার্কাস’ ও ‘প্রায় অসম্ভব’ নামের ছবিগুলোর সামনে দাঁড়ালে।

শিল্পী ঢালী আল মামুন বরাবরই ভিন্ন রকম কাজ করেন। এই প্রদর্শনীতে তাঁর যেসব ছাপচিত্র দেখা যাবে, সেগুলোর মধ্যে ‘আখ্যান’ শীর্ষক ছবিটি বেশ সুন্দর আলাদা স্বাদ নিয়ে হাজির।

‘আখ্যান’, ঢালী আল মামুন

ছবিতে ত্রিভুজের পাশে মানুষ আর পরি কিংবা হতে পারে ভিন্ন কিছু—এসবের কম্পোজিশন দর্শককে নিয়ে যাবে অন্য এক দৃশ্যজগতে।

শিল্পীদের কাজে আত্মানুসন্ধান ও প্রগতিশীল চিন্তার বিচ্ছুরণ চেতনার নতুন নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। প্রদর্শনীস্থল থেকে বের হওয়ার পরও সেসব অনুভূতি দীর্ঘ সময় অনুরণন তোলে। তারপর রং-রেখা-দৃশ্যকল্পের সূত্র ধরে শূন্যতার গভীর থেকে উঠে আসা যায়। কখনো রাজনীতি, কখনো সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়ে উঠে এসবের বহিঃপ্রকাশ।

‘বস’, দিলারা বেগম জলি

প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য হলো সমকালীন শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি বর্তমান শিল্পবাজারকে আরও বেশি প্রসারিত করা। প্রবীণ ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের পাশাপাশি নতুন শিল্পীর কাজ সামনে নিয়ে আসা।

ঢাকার ছাপচিত্রে দীর্ঘদিন তেমন নতুন ধরনের কাজের প্রবণতা দেখা যায়নি। কিন্তু এখন নতুন নতুন পদ্ধতি ও ধরন তৈরির পাশাপাশি অনেক বেশি রঙিন হয়ে উঠেছে ছাপচিত্র, যা আমরা দেখতে পাব এ প্রদর্শনীতে।

‘দ্য স্ট্রিট সার্কাস’, শহীদ কবির

ছাপচিত্র মাধ্যমটি বিশাল আঙিনাজুড়ে রয়েছে। বর্তমানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনেক দূর এগিয়েছে এবং আরও বহুমুখী প্রসারণ ঘটানোর সম্ভাবনা রয়েছে এ মাধ্যমে। ছাপচিত্র চর্চা সহজ নয়, ব্যক্তিগতভাবে স্টুডিও স্পেস ও প্রিন্ট মেশিনের ব্যবস্থা করা ব্যয়বহুল ও কঠিন। তবু এসব প্রতিকূলতা পেরিয়ে শিল্পীরা যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তা নতুনদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

‘ডেলিভারেন্স’, সাইদুল হক জুইস

বুদ্ধের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অষ্টম শতাব্দীতে চীনারা কাঠের পাটাতনে খোদাই করে কাগজে মুদ্রণ করত। এ পদ্ধতি পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ভারতবর্ষে রঙিন ছাপার প্রযুক্তি না থাকলেও ছাপচিত্রের মাধ্যমেই একসময় রঙিন বইয়ের প্রচলন ঘটে, যার উজ্জ্বল নিদর্শন আঠারো শতকের বটতলার বই।

ভারতীয় ছাপচিত্রে নতুনত্বের অভাব ছিল—এ কথা বলা কঠিন।

‘লা ভিদা এস উন সিরকো’, শহীদ কবির

বিশেষ করে মোহাম্মদ কিবরিয়ার মিনিমালিস্ট ধারায় ফর্মের সীমাবদ্ধতা কমে গেলেও স্পেসের বিস্তৃতি এবং টেক্সচারের ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করে, যা বাংলার চিত্রকলা ও ছাপচিত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সে ধারাবাহিকতায় ছাপচিত্র চর্চা বেশ উল্লেখযোগ্য। নিরীক্ষা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে ছাপচিত্র চর্চা দিনে দিনে আরও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। প্রদর্শনীর শেষ দিন ২২ মে। দর্শকদের জন্য খোলা থাকছে বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।