
মেঘ কিংবা চোখের জল—কোনোটাই কি আমরা বেঁধে রাখতে পারি? ঝরনা কিংবা বানের জলও তেমনই। তাকে বাঁধতে গেলেই সে শক্তি হয়ে ওঠে, প্রবাহের স্বভাব হারায়। সেই জল দিয়েই টিউবের শক্ত রং গুলে তৈরি হয় জলরং। তাই জলরঙের ছবির স্বভাবও জলের মতোই—স্বচ্ছ, প্রবহমান ও স্বতঃস্ফূর্ত। বলা যায়, জলের স্বভাব ধারণ করেই জলরং নাম।
জলরঙের প্রকৃত পরিচয় তার স্বতঃস্ফূর্ততায়। এ যেন মা ও শিশুর নিবিড় মেলবন্ধন। শিশুর সরল হাসি কিংবা স্বাভাবিক চলনের মতোই দক্ষ শিল্পীর হাতে জলরঙের ছবি নির্মল আনন্দে বিকশিত হয়। আবার শিশুকে যেমন স্নেহ ও যত্নে লালন করতে হয়, তেমনি জলরংকেও আলতো স্পর্শে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সামান্য অতিরিক্ত হস্তক্ষেপেই তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তখন জলরং আর জলরং থাকে না; কখনো পোস্টার রং, কখনো তেলরং কিংবা অ্যাক্রিলিকের ঘনত্ব ধারণ করে।
ইদানীং জলরংচর্চায় এই দুই প্রবণতারই প্রভাব লক্ষ করা যায়। খুব কম শিল্পী আছেন, যাঁরা জলরঙের স্বাভাবিক চলনকে ধারণ, গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আর যখন তা সম্ভব হয়, তখন ফল হয়ে ওঠে বিস্ময়কর।
এই কথাগুলো মনে আসে গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের আয়োজনে লালমাটিয়ার দ্য ইল্যুশন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত ‘জি–৭ (গ্রুপ সেভেন)’ শীর্ষক দলীয় জলরং প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন সাতজন শিল্পী—আজমির হোসেন, আনিসুর রহমান, এম এম মাকছুদ বিপ্লব, এম এম ময়েজউদ্দিন, আল আখির সরকার, ওয়ারিয়র রহমান সামি এবং মংমংসো। তাঁদের অধিকাংশ কাজের মূল বিষয় বর্ষার বাংলার নগর ও গ্রামের রূপ ও সৌন্দর্য।
ওয়ারিয়র রহমান সামির কাজগুলো প্রকৃতি ও জলাভূমিকে কেন্দ্র করে নির্মিত। প্রকৃতির নীরবতা, ঋতুর পরিবর্তন এবং আলোর চলমান রূপ তিনি সংবেদনশীল রঙের ব্যবহারে ধারণ করেছেন। তাঁর প্রতিটি কাজই হৃদয় ছুঁয়ে যায়। জলরঙের স্বচ্ছতা ও স্বভাব চোখ পেরিয়ে সরাসরি অনুভূতিতে পৌঁছে যায়। ‘দুপুরের জলাভূমি’ চিত্রে সূক্ষ্ম অঙ্কনের বাহুল্য নেই; বরং রঙের আবেশেই তিনি নির্মাণ করেছেন পরিপ্রেক্ষিত, নিসর্গের বাস্তবানুভূতি এবং নিজস্ব শিল্পসত্তা। ‘বর্ষার আগমন’ চিত্রে মেঘের রূপ ও ভাব যেন হাতে ছেনে বসিয়েছেন। মেঘরাশি আর হাঁসের জলকেলি দৃশ্যের সীমা অতিক্রম করে এক অপূর্ব অনুভূতির জন্ম দেয়। বর্ষার মেঘের বিচিত্র রূপ যেন নাট্যশাস্ত্রের অষ্টরসের আবহ সৃষ্টি করেছে।
আনিসুর রহমানের ‘বর্ষা–৮’ একই ভাবধারার ছবি। রং ও জলের সরলতা সেখানে রূপের মাধুর্যের সঙ্গে একাকার হয়েছে। যেমন গ্রামের মাটি ও জলাশয়ের দৃশ্য ধরা পড়েছে, তেমনি ‘বর্ষা–৭’ ছবিতে উঠে এসেছে শহরের অলিগলির বর্ষণমুখর পরিবেশ। বর্ষা সিরিজের প্রতিটি কাজে তিনি আলো, বায়ু ও বৃষ্টির ক্ষণস্থায়ী মুহূর্তকে অনুসন্ধান করেছেন।
আল আখির সরকারের ঘরানাটি স্বতন্ত্র। রং লেপন, ঘন আস্তরণে রঙের ব্যবহার এবং কম্পোজিশনের দক্ষতায় তাঁর কাজ সহজেই চেনা যায়। রসসৃষ্টির ক্ষেত্রেও তাঁর নৈপুণ্য অনস্বীকার্য, যা ‘শহরের ভেজা সন্ধ্যা’ চিত্রে সুস্পষ্ট।
এ দেশের অধিকাংশ তরুণ শিল্পীর কাজে আলোকচিত্রের প্রভাব লক্ষ করা যায়, যা অনেক সময় অতিরিক্ত বর্ণনার জন্ম দেয়। আল আখির সেই পথের শিল্পী নন। বর্ষা যেমন অল্প স্পর্শেই শরীর ও মন ভিজিয়ে দিতে পারে, তেমনই জলরংও ইঙ্গিত, আভাস এবং সংযমী রঙের ব্যবহারে গভীর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে সক্ষম। তাঁর ছবিতে শহর উপস্থিত, কিন্তু রাস্তাঘাট কিংবা স্থাপত্যের অতিরিক্ত বর্ণনা নেই। তবু দর্শকের মনে সম্পূর্ণ শহরটি জেগে ওঠে। সামান্য দেখানোর মধ্য দিয়ে অদেখার বিশাল জগৎকে অনুভব করানোর মধ্যেই তাঁর শিল্পের সার্থকতা। তাঁর ছবি মনে করিয়ে দেয়—অদেখাকে দেখিয়ে তোলাই শিল্পসৃষ্টির অন্যতম রহস্য।
আজমির হোসেনের ছবিতে ভিন্ন মেজাজ। অঙ্কনের মধ্য দিয়ে তিনি যেন তাঁর সাধনার প্রকাশ ঘটাতে চান। তাঁর ‘সাকরাইন’ ও ‘বর্ষা’ সিরিজে একধরনের ধ্যানমগ্নতা রয়েছে। শিল্পীদের মধ্যে নিজস্ব শৈলী ও স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার এক নীরব প্রতিযোগিতা চলে। সেই প্রতিযোগিতায় আজমির হোসেন নিজের স্বকীয় ভাষা নির্মাণে সফল। জলরঙের স্বাভাবিক প্রবাহকে সংযত নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করাই তাঁর বিশেষত্ব। আলোর সূক্ষ্ম পরিবর্তন এবং বায়ুমণ্ডলীয় গভীরতা তাঁর ছবিকে কেবল প্রকৃতিচিত্রের সীমায় আবদ্ধ রাখেনি; বরং অনুভূতির বিস্তৃত পরিসরে নিয়ে গেছে।
তরুণ শিল্পী মংমংসোর চিত্রে ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্যের সামনে উড়ন্ত মাছের নীরব কথোপকথন দেখা যায়।
মহেশখালী থেকে বিশ্বভ্রমণের শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও আত্মজিজ্ঞাসা যেন এই চিত্রভাষায় প্রতীকী রূপ লাভ করেছে। এখানে মাছের উড্ডয়ন কেবল লম্ফ নয়; এটি এক জগৎ থেকে আরেক জগতে উত্তরণের প্রতীক। জলের প্রাণী আকাশে উড়ে এসে পাথরের স্থির ভাস্কর্যের সামনে উপস্থিত হয়েছে। ফলে প্রকৃতি ও শিল্প, প্রাণ ও জড়, বাস্তব ও কল্পনার মধ্যে এক অলৌকিক মিলনের মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছে। দেবীমূর্তির শান্ত, স্থির দৃষ্টি এবং মাছের গতিশীল উপস্থিতির মধ্যে এক কাব্যিক বৈপরীত্য গড়ে উঠেছে। মনে হয়, সময়ে স্থির হয়ে থাকা প্রাচীন ঐতিহ্যের সামনে জীবনের নতুন স্পন্দন এসে দাঁড়িয়েছে। এই সাক্ষাৎ কোনো সংঘর্ষ নয়; বরং নীরব সংলাপ।
এই সিরিজে শিল্পী মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন তাঁর দেখা অতীত এবং যাপিত বর্তমানকে। ডানা মেলা নীল উড়ন্ত মাছটি যেন শিল্পীরই আত্মপ্রতিকৃতি। প্রাচীন শিল্পকলার স্থির সৌন্দর্য এবং সমকালীন জীবনের স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে সে এক জীবন্ত সেতুবন্ধ রচনা করেছে। তাই মংমংসোর জলরং কেবল একটি মাধ্যম নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র চিত্রভাষা, যা দর্শককে ব্যাখ্যার চেয়ে অনুভবের জগতে প্রবেশের আহ্বান জানায়।
সব মিলিয়ে এই প্রদর্শনী বাংলাদেশের সমকালীন জলরংচর্চার একটি ইতিবাচক দলিল। প্রকৃতি, ঋতু, আলো ও অনুভূতির বহুমাত্রিক প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রদর্শনীটি সমকালীন বাংলাদেশে জলরঙের সম্ভাবনা ও বিকাশের একটি তাৎপর্যপূর্ণ শিল্প-উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের আয়োজনে লালমাটিয়ার দ্য ইল্যুশন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত ‘জি–৭ (গ্রুপ সেভেন)’ প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ১৭ জুলাই, চলবে ২৫ জুলাই পর্যন্ত।