শামীম সুব্রানার শিল্পকর্ম
শামীম সুব্রানার শিল্পকর্ম

প্রদর্শনী

ফ্রেম ভাঙার ভেতর দিয়ে শিল্পযাত্রা

শামীম সুব্রানার কাজকে মৌলিক বলা যায় এ কারণে যে তিনি হঠাৎ কোনো আন্তর্জাতিক ভাষা ধার নেননি, আবার নিছক স্থানীয় অলংকারেও আটকে থাকেননি। তাঁর কাজের ভাষা গড়ে উঠেছে ধীরে ধীরে—শৃঙ্খলা, ছন্দ ও নিয়ন্ত্রণের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সে শৃঙ্খলাকেই প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে। এ যাত্রাপথ বোঝা না গেলে ‘আনফ্রেমড’ সিরিজকে কেবল একটি সমসাময়িক বিমূর্ত অনুশীলন হিসেবে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

এই সিরিজে শিল্পী ক্যানভাস ব্যবহার করেছেন, কিন্তু ক্যানভাস প্রিপেয়ার করেননি। কোনো কাজেই ফ্রেম নেই। ক্যানভাস ভাঁজ করে রাখার ফলে যে দাগ পড়েছে, সেগুলো ঢাকার চেষ্টা করা হয়নি। ফলে ক্যানভাস এখানে নিছক পৃষ্ঠ নয়; এটি সময়, ব্যবহার ও অবহেলার চিহ্ন বহনকারী এক দেহ। এই দেহগত উপস্থিতিই সুব্রানার কাজকে আলাদা করে তোলে।

‘আনফ্রেমড ২’-এ ঝুলন্ত ক্যানভাস ও ভাঁজের রেখা ক্যানভাসকে অবজেক্ট হিসেবে সামনে আনে; এখানে স্যাম গিলিয়ামের আনফ্রেমড ক্যানভাসের স্মৃতি মনে পড়লেও সুব্রানা রঙের উদ্‌যাপনের বদলে সংযম ও ক্ষয়ের ভাষা বেছে নেন। ‘আনফ্রেমড ৫’-এর তীব্র লাল পৃষ্ঠে আঁচড় ও দাগ অস্কার মুরিলোর শ্রমচিহ্নিত ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনীয়, যদিও এখানে একটি সচেতন নিয়ন্ত্রণ লক্ষ করা যায়।

এ প্রদর্শনীর ‘আনফ্রেমড ৮’ ও ‘আনফ্রেমড ২১’ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলো দেখলে শিল্পীর পূর্ববর্তী একক প্রদর্শনীর কথা মনে পড়ে। সেই সময়ের চিত্রকর্মগুলো ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে মনে হয়েছিল। তখন কাজগুলো ছিল প্রথাগত ফ্রেমে আবদ্ধ। আজ সেই ফ্রেম নেই, কিন্তু রেখার ছন্দ, পুনরাবৃত্ত গতি ও শ্বাসপ্রশ্বাস পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। পার্থক্য হলো, তখন শৃঙ্খলা ছিল কাঠামোর ভেতরে; এখন সেই শৃঙ্খলাই ভেঙে দাগ, ভাঁজ ও অসম প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।

এ ভাঙন কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ নয়; বরং এটি দীর্ঘ অনুশীলনের ফল। শামীম সুব্রানার কাজ তাই কেবল ফ্রেম ভাঙে না; এটি আমাদের শেখানো দৃষ্টির অভ্যাসকেও অস্বস্তিতে ফেলে। ‘আনফ্রেমড’ দেখার অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত এ প্রশ্নই সামনে আনে—একটি চিত্রকর্ম কোথায় শেষ হয়, আর তার ইতিহাস কোথা থেকে শুরু হয়?

‘আনফ্রেমড’ শিরোনামের এ একক প্রদর্শনীতে মোট ১৮টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। ঢাকার ইস্ট বেঙ্গল ক্যাফে রোস্টারে আয়োজিত প্রদর্শনীটি গত ২৪ জানুয়ারি শুরু হয়ে আজ ৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে।