‘অস্থির সময়: বাংলাদেশের প্রথম চার বছর’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
‘অস্থির সময়: বাংলাদেশের প্রথম চার বছর’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বইপত্র

নতুন রাষ্ট্রে স্বপ্নভঙ্গের আখ্যান

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান: অ্যান্ড দ্য আফটারম্যাথ গ্রন্থের মাধ্যমে। ১৯৮১ সালে জিয়াউদ্দিন ছিলেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। ওই বছরের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি অসাধারণ গ্রন্থটি রচনা করেছেন, যা রষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকাণ্ডের একটি বস্তুনিষ্ঠ, প্রামাণ্য দলিল।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে জিয়াউদ্দিনের মাত্র ৯২ পৃষ্ঠার বইটি বহু পাঠককে সমৃদ্ধ করেছে। এ ছাড়া তাঁর লেখার ধরন ও ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সততা ও নিরপেক্ষতা সত্যিই অনন্য। অনেকটা পেশাদার ইতিহাস–গবেষকের মতো। সেই প্রেক্ষাপটেই হাতে নেওয়া তাঁর নতুন গ্রন্থ অস্থির সময়: বাংলাদেশের প্রথম চার বছর। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটিও ইতিহাসভিত্তিক স্মৃতিকথা ও বিশ্লেষণ। স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে জিয়াউদ্দিন ছিলেন একজন তরুণ সরকারি কর্মকর্তা। সে সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পরের দিকে কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই সে সময়ে নবীন একটি রাষ্ট্রের গঠনপ্রক্রিয়া ও নানা সংকট তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ঐতিহাসিক বহু ঘটনার তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী। একজন সংবেদনশীল ও ইতিহাসসচেতন সাক্ষী হিসেবে এই গ্রন্থে তিনি মাত্র ২৪টি ছোট ছোট স্মৃতিকথায় সেই সময়ের বর্ণনা দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ, উত্তরবঙ্গের দুর্ভিক্ষ ও বাকশাল গঠনসহ নানা ঘটনাপ্রবাহ। যদিও তথ্য ও বিশ্লেষণে এই ছোট অধ্যায়গুলো বেশ সমৃদ্ধ।

গ্রন্থটির ব্যাপ্তি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ পর্যন্ত। যে সময়টিতে রক্তস্নাত নবীন রাষ্ট্রের ভিত্তি রচিত হয়েছিল। যদিও একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে এই সময় নিয়ে লেখকের রয়েছে গভীর আক্ষেপ।

‘অস্থির সময়: বাংলাদেশের প্রথম চার বছর’ বইয়ের প্রচ্ছদ
ভূমিকায় যে একদলীয় রাষ্ট্রের কথা লেখক তুলে ধরেছেন, সে বিষয়ে ‘বাকশাল’ শিরোনামে অধ্যায় রয়েছে বইটির ৮২ পৃষ্ঠায়। একদলীয় বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট ও নানা বিষয় নিয়ে পাঠক হয়তো আগেই অবগত আছেন। কিন্তু বাকশাল গঠনকে একজন সংবেদনশীল সরকারি আমলা কীভাবে দেখেছিলেন, সেটির একটি চিত্র এই স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়।

গ্রন্থটির ভূমিকায় তিনি লিখছেন, ‘এই সময়টা ছিল বাংলাদেশকে একটি মজবুত খুঁটির ওপর দাঁড় করানোর সময়। কিন্তু তা না হয়ে সময়টা হয়ে গেল এক অস্থিরতার সময়। যে দেশ ১৯৭১ সালে জাতি-ধর্ম-রাজনীতির ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে রুখে দাঁড়িয়েছিল দেশকে স্বাধীন করতে, সে দেশ এক বছরের মাথায় বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হয়ে পড়ল। দেশটি পরিণত হলো চৌর্যবৃত্তি, খুনখারাবি আর দুর্নীতির আখড়ায়। তিন বছর যেতে না যেতেই একটি দেশ, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে, রূপান্তরিত হয়ে গেল এক গণতন্ত্রবিহীন একদলীয় রাষ্ট্রে।’ (গ্রন্থের ভূমিকার খণ্ডাংশ)

ভূমিকায় যে একদলীয় রাষ্ট্রের কথা লেখক তুলে ধরেছেন, সে বিষয়ে ‘বাকশাল’ শিরোনামে অধ্যায় রয়েছে বইটির ৮২ পৃষ্ঠায়। একদলীয় বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট ও নানা বিষয় নিয়ে পাঠক হয়তো আগেই অবগত আছেন। কিন্তু বাকশাল গঠনকে একজন সংবেদনশীল সরকারি আমলা কীভাবে দেখেছিলেন, সেটির একটি চিত্র এই স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়। জিয়াউদ্দিন লিখেছেন, বাকশাল নিয়ে ডামাডোলের মধ্যে প্রতিদিন সংবাদ আসতে থাকল দেশের বিভিন্ন সংস্থা ও সমিতি কীভাবে বাকশালের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছে। এর মধ্যে আবার ঘোষণা এল, দেশের সব পেশাজীবী, এমনকি সরকারি কর্মচারীদেরও অচিরেই বাকশালে যোগ দিতে হবে। এবার আমি সত্যি প্রমাদ গুনলাম। তাহলে কি আমাদের আর পেশাগত স্বাধীনতা থাকবে না? আমাদের সবাইকে কি বাকশালের সদস্য হতে হবে? (পৃষ্ঠা: ৮৩)

স্বাধীনতা–পরবর্তী বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যতম আলোচিত চরিত্র ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ ও যুবনেতা শেখ মনি।

এ বই একটি ইতিহাস সমৃদ্ধ স্মৃতিকথা। এর তথ্য ও বিশ্লেষণ পাঠকে চমৎকৃত করতে পারে। এ ছাড়া স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগে একটি সরকার কীভাবে এবং কী কী কারণে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিল, তার সংবেদনশীল বর্ণনা রয়েছে গ্রন্থটিতে।

গ্রন্থটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে শেখ মনির সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে লেখকের একটি বিশ্লেষণ রয়েছে, যা ইতিহাস নিরীক্ষণে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন: শেখ মনি ও তাজউদ্দীন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রায়ই তাজউদ্দীন সম্পর্কে শেখ মনির অভিযোগ আর দেশের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য তাঁকে দায়ী করার ফলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাজউদ্দীন ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে ইস্তফা দেন। তাঁর সরে যাওয়ায় মুজিবের পক্ষে একদলীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হলো। কারণ, তাজউদ্দীন আহমদ একদলীয় শাসনের পক্ষপাতী ছিলেন না। (পৃষ্ঠা: ৮২)

এ বই একটি ইতিহাস সমৃদ্ধ স্মৃতিকথা। এর তথ্য ও বিশ্লেষণ পাঠকে চমৎকৃত করতে পারে। এ ছাড়া স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে চার বছর পূর্ণ হওয়ার আগে একটি সরকার কীভাবে এবং কী কী কারণে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিল, তার সংবেদনশীল বর্ণনা রয়েছে গ্রন্থটিতে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। জিয়াউদ্দিন কয়েক বছর আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামানের একান্ত সচিব ছিলেন। উত্তরবঙ্গে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি ও একদলীয় শাসনব্যবস্থা কার্যকরের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই সন্তানের বিয়ের অনুষ্ঠান চলার সময় মন্ত্রী কামারুজ্জামানের সঙ্গে আলাপচারিতার একটি ঘটনা উল্লেখ করে জিয়াউদ্দিন লিখেছেন, ‘ফিরে এলে [শেখ মুজিবুর রহমানের দুই পুত্রের গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান থেকে] আমি দেখি তাঁর [এ এইচ এম কামারুজ্জামান] আপাদমস্তক লাল আর হলুদ রঙে রঞ্জিত। তাঁর সাদা পাঞ্জাবি-পাজামাও একইভাবে রাঙানো। আমি একটু অবাক হলে তিনি হেসে বললেন, ‘ঘাবড়িয়ো না, হাজার হলেও এটা রাজপুত্রদের বিয়ে। আমরা সভাসদেরা গায়ে রং না মাখলে কি হয়?’ এরপর তিনি আমাকে বললেন, ‘সোনার মুকুট না হলে কি বিয়ে হয়?’ বুঝলাম, বিয়ে নিয়ে যে মহোৎসব চলেছে, তাতে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন।’ (পৃষ্ঠা: ৯২)

মাত্র ১০৩ পৃষ্ঠার এই স্মৃতিকথা একজন ইতিহাসসচেতন পাঠককে নিঃসন্দেহে সমৃদ্ধ করবে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদে লাল কালির মূল নামের ব্যাকগ্রাউন্ডে শিল্পী মাসুক হেলাল যে ধূসর চিত্র তুল ধরেছেন, তা সত্যিই অনন্য।

  • অস্থির সময়: বাংলাদেশের প্রথম চার বছর
    জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী

    প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
    প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২০২৫
    প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
    পৃষ্ঠা: ১০৩; মূল্য: ৩০০ টাকা