ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হয়ে তাকে জীবনের স্মৃতিপটে তুলে ধরার এক ভিন্নধর্মী গ্রন্থ আমার গেছে যে দিন। নূরে আলম সিদ্দিকীর জন্ম থেকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মাতৃভূমির মুক্তি ও তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক নেতা–কর্মী, দলগুলোর উত্থান-পতনের ইতিহাস। অবিচল আস্থা, দেশপ্রেম ও রাষ্ট্রনীতির টানাপোড়েনে সমান গতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
গ্রন্থটিকে ২২টি অংশে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম অংশে নূরে আলম সিদ্দিকী স্বভাবতই জন্ম-পরবর্তী স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা বলেছেন। ষাটের দশকে ঢাকা কলেজে ভর্তি এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক কারণে ফোর্সড টিসি পেয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। জগন্নাথ কলেজ থেকে নূরে আলম সিদ্দিকীর সহস্রাধিক মানুষের সামনে বক্তৃতা দেওয়ার সূচনা। তাঁর দৃষ্টিতে সমকালে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু, শেখ মুজিবুর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর গণতান্ত্রিক অবস্থান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে বাঙালি জাতির মননশীলতার উন্মেষ, ব্যাপ্তির সফলতার কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানকে স্পষ্ট করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও তৎসংলগ্ন আন্দোলন–সংগ্রামকে উল্লেখ করেছেন। সমকালে চার খলিফার একজন হিসেবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জেল-জুলুমের কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে পারেননি। গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বর্ণময় জীবন, কর্ম, রাজনৈতিক দর্শন ও মননশীলতা সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণা করেছেন। এ ছাড়া লেখার মাধ্যমে দেশবাসীর বেদনা বর্ণনায় তফাজ্জল হোসেনের ভূমিকাকে চিহ্নিত করেছেন লেখক। রাজনৈতিক নেতা না হয়েও তাঁর লেখা, চিন্তাধারা আওয়ামী নেতা–কর্মীদের কাছে রাজনৈতিক দর্শন ও নির্দেশ হিসেবে প্রতিভাত ছিল। শেখ মুজিব সম্পর্কেও বিশদ আলোচনা দৃষ্টিগোচর হয়। ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্পৃক্ততা, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের এগিয়ে চলার বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছেন। সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শেখ মুজিবের ছয় দফার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও এর পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা ছিল তাঁর। একসময় শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে ৭ জুনের হরতালকে কেন্দ্র করে জেলে যেতে হয় তাঁকে। একই কারাগারে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে লেখকের সুখস্মৃতির এবং বামদের নিয়ে পৃথক দৃষ্টিভঙ্গির একটা বৃহৎ অংশের বর্ণনা রয়েছে। জেলে থাকাকালীন মায়ের মৃত্যু হলেও প্যারোলে তাঁর মুক্তি মেলেনি। একসময় প্রতিটি জেলার ডেলিগেট–সমর্থিত ছাত্রলীগ সভাপতি হন নূরে আলম সিদ্দিকী। ছয় দফা এবং ’৭০–এর নির্বাচনে জনমত গঠনের লক্ষ্যে বক্তৃতায় জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
১৯৭১ সালের ১ থেকে ২৭ মার্চের ঘটনাবহুল দিনগুলোর সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ দিকের বর্ণনা এই গ্রন্থকে আলাদা মর্যাদা দান করেছে। স্বাধীনতার পক্ষে শপথবাক্য পাঠ এবং ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাঁর বর্ণনা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত।
১৯৭১ সালের ১ থেকে ২৭ মার্চের ঘটনাবহুল দিনগুলোর সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ দিকের বর্ণনা এই গ্রন্থকে আলাদা মর্যাদা দান করেছে। স্বাধীনতার পক্ষে শপথবাক্য পাঠ এবং ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তাঁর বর্ণনা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য ভারতে গেলে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এবং মুক্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল (পরবর্তীতে জেনারেল) আতাউল গণি ওসমানীর সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনসহ বিভিন্ন ক্যাম্প ও শরণার্থীশিবিরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ সময় নাটকীয়ভাবে তাঁর বিয়ে হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিব ও জাতীয় চার নেতার প্রত্যাবর্তনের সাবলীল বর্ণনা পাওয়া যায় বইটিতে। ১৯৭২-৭৫ সময়ে তাঁর মাধ্যমে যুবলীগের সূচনা। ঝিনাইদহের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি শেখ মুজিব ও নিজ দলের নেতাদের সমালোচনা করতেন। তাঁকে কেন্দ্র করে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বাড়তে থাকলে শেখ মুজিবের সঙ্গে দূরত্বও বাড়তে থাকে। এ সময়ের ভুল হিসেবে লেখক অকপটে শেখ মুজিবের দ্বৈততা, প্রশাসনের রদবদল, পরিকল্পনার অভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ক্ষমতা প্রদর্শনের মোহ, শক্ত বিরোধী দলের অনুপস্থিতি, ভ্রান্ত পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করেন।
বাকশাল গঠনের বিরোধিতা করে ১৯৭৫ সালের ১৯ জানুয়ারি সংসদীয় দলের সভায় শেখ মুজিবের উদ্দেশে বলা বক্তব্যে উঠে এসেছে ইতিহাসের নানা বাঁকবদল। তবু ১৫ আগস্টের স্মৃতিকে উল্লেখ করে সে মাসকে হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মাস বলেছেন তিনি। একসময় কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে যুক্ত করেন ব্যবসায়। জিয়াউর রহমানের শাসনব্যবস্থার কিছু নিয়মকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন তিনি। পরে স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে অবসরে যান। ‘জীবনের শেষ’ অংশে স্ত্রী, দুই সন্তান, নাতি-নাতনিকে নিয়ে একজন পরিতৃপ্ত মানুষ হিসেবেই নিজেকে দেখেছেন লেখক। শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ভালো না হলেও ‘তৃতীয় মাত্রায়’ নানা সময়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে চেষ্টা করেছেন যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনকল্যাণমুখী হয়ে ওঠে।
আপাদমস্তক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নূরে আলম সিদ্দিকী। মাতৃভূমিকে অতলান্তিক হৃদয়ে ধারণ করে তার জন্য সৎ সাহসে কাজ করার মানসিকতা খুব কম ব্যক্তিরই রয়েছে। সেদিক থেকে লেখক অগ্রণী। দেশকালের বিকাশধর্মী বাস্তবতায় গ্রন্থটি ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময়কে নতুন করে চেনা এবং দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে ভূমিকা রাখবে।
...
আমার গেছে যে দিন
নূরে আলম সিদ্দিকী
সম্পাদনা: তাহজীব আলম সিদ্দিকী
প্রকাশক: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রচ্ছদ: সব্যসাচী মিস্ত্রী
পৃষ্ঠা: ৩৯৮; মূল্য: ৭০০ টাকা