গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বইপত্র

পরিচিত গণ্ডির বাইরে নতুন সত্য সাহা

এক.

জমিদারবাড়িতে জন্ম নেওয়া একটি শিশু দেড় বছর বয়সে মাকে হারায়। শুরুতে রাজি না থাকলেও একটি দুর্ঘটনার পর শিশুটির মায়ের অভাব পূরণ করতে তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কিন্তু সেই নতুন মা তো তার মায়ের অভাব পূরণ করলেনই না, বরং বাবাকেও দূরে সরিয়ে নিলেন। পিতা-মাতার স্নেহবঞ্চিত একটি শিশু, যাকে তার বাবা চেয়েছিলেন মেডিকেলে পড়াতে, পরিবারের অমতে গিয়ে তিনি গাঁটছড়া বাঁধলেন সংগীতের সঙ্গে। তাঁর মাথায় ঢুকল সিনেমার পোকা। সমগ্র জীবন তাঁর কেটে গেল সংগীত আর সিনেমার সঙ্গে।

শিশুটির নাম সত্য সাহা, পরবর্তীকালে খ্যাতিমান সংগীত পরিচালক। তাঁকে আমরা সবাই চিনি তাঁর গানের মাধ্যামে। ‘চেনা চেনা লাগে’, ‘দুঃখ আমার বাসর রাতের পালঙ্ক’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’, ‘আমার মন বলে তুমি আসবে’, ‘রুপালি নদীরে’, ‘তুমি কি দেখেছ কভু’, ‘নীল আকাশের নিচে আমি’, ‘যার ছায়া পড়েছে’সহ অজস্র জনপ্রিয় গানের সুর করেছেন তিনি। ষাট থেকে নব্বই—এই তিন দশক ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় অধিকাংশ গানের সুর তাঁর করা। এমনও সময় গেছে, সত্য সাহার সুর মানেই ছবি হিট। আজও নতুন শিল্পীরা তাঁর সুর করা গান করেন। নতুন শ্রোতারাও গভীর আগ্রহে সেই গান শোনেন। পুরোনো শ্রোতারা ভোগেন নস্টালজিয়ায়। যাঁরা আরও বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন সত্য সাহাকে নিয়ে, অথবা বাংলা সিনেমার ইতিহাস যাঁদের নখদর্পণে, তাঁরা হয়তো জেনে থাকবেন যে সত্য সাহা একাধারে গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও চিত্র প্রযোজক। কিন্তু এর বাইরে? এর বাইরের সত্য সাহাকে কতটা জানেন?

দুই.

‘অশিক্ষিত ছবির সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই আমরা আবারও ছবি বানানোর উদ্যোগ নিলাম। ঠিক হলো বাস্তব কাহিনিভিত্তিক একটি গল্প।…আজিজ ভাইয়ের (চলচ্চিত্র পরিচালক আজিজুর রহমান) এক সহকারী পরিচালক মতিন রহমান, চিত্রনাট্যন ও সংলাপ রচয়িতা রফিকুজ্জামান ও তাঁর পরিবারসহ আমরা সবাই কাপ্তাই চলে গেলাম।…কাপ্তাইয়ে ওরা তিনজন একটা রুমের দরজা বন্ধ করে সকাল থেকে রাত অবধি স্ক্রিপ্টের কাজ করত। অন্যতদিকে আমি আর মিসেস রফিকুজ্জামান—দুই মহিলা বসে বসে দারুণ বোর হচ্ছিলাম।’

ষাট থেকে নব্বই—এই তিন দশক ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় অধিকাংশ গানের সুর তাঁর করা। ‘চেনা চেনা লাগে’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’, ‘তুমি কি দেখেছ কভু’, ‘নীল আকাশের নিচে আমি’সহ অজস্র জনপ্রিয় গানের সুর করেছেন তিনি।
(বাঁ থেকে) রমলা সাহা, লতা মঙ্গেশকর ও সত্য সাহা; এফডিসি, ঢাকা, ১৯৭২

গত বছর বইমেলায় প্রকাশিত আমার সত্য আমার জীবন বইয়ের উদ্ধৃতাংশের এই ‘আমি’টি হলেন রমলা সাহা—অমর সুরস্রষ্টা সত্যহ সাহার স্ত্রী। যে সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে কাপ্তাই যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বিখ্যাত সিনেমা ছুটির ঘণ্টা। রমলা সাহা এ সিনেমার প্রযোজক। আরও অনেক সফল সিনেমার প্রযোজক তিনি। এ সিনেমাযাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বামী সত্য সাহা।

এই বই শিল্পী সত্য সাহাকে নিয়ে আরেক শিল্পী রমলা সাহার স্মৃতিকথন। এই বই উন্মোচন করবে সফলতার পেছনে লুকায়িত আনন্দ-বেদনায় পূর্ণ এক সত্য সাহাকে, যে সত্য সাহার জীবনের অনেক কিছু আমাদের অজানা ছিল, অন্ধকারে ছিল।

আমার সত্যে আমার জীবন
রমলা সাহা

প্রকাশক: আগামী প্রকাশনী
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫
প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল
পৃষ্ঠা: ১৭৬
মূল্য: ৭০০ টাকা

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

গত বছর বইমেলায় প্রকাশিত আমার সত্য আমার জীবন বইয়ের উদ্ধৃতাংশের এই ‘আমি’টি হলেন রমলা সাহা—অমর সুরস্রষ্টা সত্যহ সাহার স্ত্রী। যে সিনেমার চিত্রনাট্য লিখতে কাপ্তাই যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বিখ্যাত সিনেমা ছুটির ঘণ্টা। রমলা সাহা এ সিনেমার প্রযোজক। আরও অনেক সফল সিনেমার প্রযোজক তিনি। এ সিনেমাযাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বামী সত্য সাহা।

সত্য সাহাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে রমলা সাহা দীর্ঘজীবন নিবিড় ও গভীরভাবে কাছ থেকে দেখেছেন। কিন্তু জীবনসঙ্গীর বাইরে গিয়ে শিল্পের জায়গা থেকে সত্য সাহাকে দেখতে পারতেন কেবল একজন শিল্পীই। রমলা সাহা সেই জায়গায় ছিলেন। সাধারণ এক গৃহবধূ হিসেবে নয়, নিজের শিল্পীসত্তা দিয়ে আরেক শিল্পীকে কোমল ও তীব্রভাবে বিচার করার সুযোগ পেয়েছেন রমলা সাহা। ফলে আমরা যে সত্য সাহাকে সব সময় চিনি অথবা চিনতাম, সেই পরিচিত গণ্ডির বাইরের এক নতুন সত্য সাহাকে নিয়ে রমলা সাহা হাজির হয়েছেন এ বইয়ে। ফলে বলা যায়, এই বই শিল্পী সত্য সাহাকে নিয়ে আরেক শিল্পী রমলা সাহার স্মৃতিকথন। এই বই উন্মোচন করবে সফলতার পেছনে লুকায়িত আনন্দ-বেদনায় পূর্ণ এক সত্য সাহাকে, যে সত্য সাহার জীবনের অনেক কিছু আমাদের অজানা ছিল, অন্ধকারে ছিল।

ছোট ছোট অধ্যায়ে ভাগ হয়ে বইটি এগিয়েছে। পূর্বপুরুষের পরিচয় থেকে শুরু করে সত্য সাহার শৈশব-কৈশোর-যৌবন, গানের জগৎ হয়ে চলচ্চিত্রজগতে পা রাখা, সংগ্রাম, সফলতা—এভাবে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়েছে অধ্যায়গুলো। সত্য সাহার সঙ্গে রমলা সাহার পরিচয়, সম্পর্ক, বিয়ে, এরপর সংসারজীবন, কাছ থেকে দেখা সত্যকে এবং সত্যের কাজকে—সব মিলিয়ে আমরা এই বইয়ে এক অনুপুঙ্খ সত্য সাহাকে জানব। অন্দরমহলের সত্য সাহাকে। জানব নিবিড়ভাবে সত্য সাহার হাত ধরে রাখা রমলা সাহার জীবনকেও।

বইয়ের শেষে সত্য সাহার সুরারোপিত কিছু গানের তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে, যা বইটির বাড়তি আকর্ষণ। সংগীত বা চলচ্চিত্র নিয়ে যাঁরা গবেষণায় আগ্রহী, তাঁদের জন্য এই বই বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে।

তিন.

সত্য সাহা জমিদারের সন্তান ছিলেন। তবু কুসুমাস্তীর্ণ পথ জোটেনি তাঁর কপালে। বরং পরিবারের অমতে গানের জগতে পা রাখার কারণে তাঁর পা কাঁটায় রক্তাক্ত হয়েছে অনেক দিন। এরপরও কখনো ঘাত-প্রতিঘাতময় কঠিন জীবনকে ভয় না পেয়ে সাহস ও ধৈর্যের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছেন সেই জীবনের। সংগ্রাম করেই হয়েছেন সুরের বরপুত্র। মাথায় পরেছেন সাফল্যের মুকুট।

আমার সত্য আমার জীবন বইটি সেই মুকুটের সামনের ঔজ্জ্বল্য ও পেছনের কাঁটাগুলোকে তুলে ধরবে আমাদের সামনে।