অলংকরণ: এডগার ভালতের
অলংকরণ: এডগার ভালতের

এস্তোনিয়ার শিশু–কিশোর গল্প

পোকুদের দেশ

লেখা ও আঁকায় ছোটদের জন্য অদ্ভুত এক কল্পনার জগৎ তৈরি করেছেন এডগার ভালতের (১৯২৯–২০০৬)। এস্তোনিয়ার এই গল্পকার ও শিল্পীর অমর সৃষ্টি ‘পোকু’। গহিন বনে থাকে এই ছোট্ট মিষ্টি প্রাণীরা।

 অনুবাদ: নিজাম বিশ্বাস

পোকুরা খেয়াল করল, ওদের পা জ্বালাপোড়া করছে। মাটিতে কিছুতেই পা ফেলা যাচ্ছে না। সন্ধ্যাবেলা একটু বসে যে আরাম করবে, সে উপায়ও নেই। পোকুরা দেখতে অবিকল ঘাসের মতো। নরম স্যাঁতসেঁতে মাটিতে চলাফেরা করতে পছন্দ করে ওরা। কিন্তু আগের মতো সেই ভেজা মাটি আর নেই। মাটি শুকিয়ে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। শান্ত পোকুরা তাই শুকনা খড়ের মতো বাতাসে উড়ছে।

‘না, এভাবে আর চলতে পারে না।’ সবচেয়ে ছোট পোকুটাও ঘাড় নেড়ে সায় দিল। তারপর ওরা ঠিক করল, নতুন দেশ খুঁজতে হবে, যেখানে নরম স্যাঁতসেঁতে মাটি আছে।

এক বিকেলে নতুন দেশের খোঁজে দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ল সব পোকু। এমনিতে পোকুরা খুব একটা নড়াচড়া করতে চায় না, কিন্তু দরকার হলে বেজায় জোরে হাঁটতে পারে। দূর থেকে পোকুদের দলটিকে দেখে ছায়ার মতো মনে হচ্ছে। দিন ফুরিয়ে রাত নেমে এল। দিনের চেয়ে রাতের অন্ধকারে ওরা ভালো দেখে। পথে হরিণ, বুনো শূকর আর হরেক রঙের পাখির দেখা পেল। কিন্তু একটুও ভয় পেল না পোকুরা। কারণ, পোকুদের কোনো শত্রু নেই। সবাই পোকুদের ভালোবাসে।

‘না, এভাবে আর চলতে পারে না।’ সবচেয়ে ছোট পোকুটাও ঘাড় নেড়ে সায় দিল। তারপর ওরা ঠিক করল, নতুন দেশ খুঁজতে হবে, যেখানে নরম স্যাঁতসেঁতে মাটি আছে।

হাঁটতে হাঁটতে পোকুরা অনেক দূর চলে এল। পেরিয়ে এল অনেক জলাভূমি, মাঠ, বনজঙ্গল। কিন্তু কোথাও বসবাস করার মতো জায়গা খুঁজে পেল না। অবশেষ এক বনের শেষ প্রান্তে এসে থামল।

বন পেরিয়ে একটা সবুজ মাঠ। চারপাশে উঁচু উঁচু গাছ, বাতাসে পানির মিষ্টি ঘ্রাণ। পোকুরা নিঃশব্দে এগিয়ে চলল। মাঠ পেরিয়ে দেখল, একটা বাড়ি। তারপর আরও কয়েকটি বাড়ি। অবশেষে এক বাড়ির সামনে এসে থামল তারা।

সেই বাড়ির পাশে একটা মস্ত বড় হ্রদ। কৌতূহলী হয়ে চারপাশটা দেখতে শুরু করল। এমন দেশ কখনো দেখেনি পোকুরা। সবচেয়ে বড় পোকুটা বলেন, ‘হ্রদটা দেখেছ? পানিতে হাঁসের দল কেমন করে ভাসছে! কলমিলতায় দেখো ফুল ফুটেছে। কী সুন্দর কাদামাখা তীর। আহা, কী নরম মাটি! এ যেন আমাদেরই বাড়ি।’

একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল সব পোকু, ‘বাড়ি! এটাই আমাদের বাড়ি!’

ওরা হেসে উঠল। নেচে উঠল। অবশেষে ওরা নতুন ঘর খুঁজে পেয়েছে।

ঠিক তখনই একটা কাশির শব্দ শোনা গেল। সব পোকু একযোগে তাকাল। একটা জানালার ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ‘আগুন’, ‘আগুন’ বলে পোকুরা ফিসফিস করতে থাকল। অমনি এক পোকু বলল, ‘না, ওটা মানুষ! এক বুড়ো পাইপে ধোঁয়া টানছে।’

দিনভর সেই বাড়ির সামনেই ঘোরাফেরা করল পোকুরা। একসময় রাত নামল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পোকুরা ভাবল, এই মানুষটা যেন তাদেরই একজন! বৃদ্ধ লোকটিও পোকুদের কাছে এসে বললেন, ‘ভেতরে চলে এসো সবাই।’

বৃদ্ধ লোকটি দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। মুখভরা দাড়ি। হাসিমুখে বললেন, ‘শুভ সকাল, ছোট্ট বন্ধুরা!’

এক পোকু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘শুভ সকাল!’

বৃদ্ধ অবাক হয়ে মুখ থেকে পাইপ নামালেন, ‘তুমি কথা বললে?’

‘হ্যাঁ, কারণ, আপনি আগে বলেছেন।’

বৃদ্ধ ফিক করে হেসে ফেললেন। অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখতে ঘাসের মতো, কিন্তু ঘাসও তো নও!’

‘না, আমি পোকু। আমরা সবাই পোকু।’

তারপর দিনভর সেই বাড়ির সামনেই ঘোরাফেরা করল পোকুরা। একসময় রাত নামল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পোকুরা ভাবল, এই মানুষটা যেন তাদেরই একজন!

বৃদ্ধ লোকটিও পোকুদের কাছে এসে বললেন, ‘ভেতরে চলে এসো সবাই।’

সব পোকু দুলে দুলে ঘরে ঢুকে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটা ভরে গেল, যেন খড়ের গাদা। বৃদ্ধ লোকটি তেলের বাতি জ্বাললেন। হেসে বললেন, ‘আরে, এ তো একেবারে জাদু!’

ওরা গল্প করল, হাসল, ছড়া বানাল। এক পোকু বলল, ‘আমরা জলাভূমিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কবিতা বানাতাম। একজন বলত এক লাইন, অন্যজন মেলাত ছন্দ।’

বৃদ্ধ হাসলেন, ‘দারুণ মজা তো!’

সব পোকু হেসে উঠল, ‘হা হা হা!’

বৃদ্ধও যোগ দিলেন, ‘হে হে হে!’

তারপর বললেন, ‘তোমরা এখানে থাকো। এখানে খরা নেই, মাটি শুকাবে না। সবুজ–শ্যামল প্রকৃতি।’

পোকুরা বলল, ‘ধন্যবাদ!’

পরদিন সকাল হতেই হ্রদের ধারে ছুটল পোকুরা। ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে দাঁড়াল। শান্ত, চুপচাপ। এখন ওরা নিশ্চিন্ত।

এভাবেই পোকুরা পেল নতুন এক দেশ।