গ্রাফিকস: এআই/প্রথম আলো
গ্রাফিকস: এআই/প্রথম আলো

সাক্ষাৎকার

শংকরের সঙ্গে একদিন

এক বসন্তসন্ধ্যায় কলকাতায় কথাসাহিত্যিক শংকরের সঙ্গে হাবীব ইমনের এই সাক্ষাৎ ছিল সময়ের ভেতর আরেক সময়ের দরজা খোলা। চৌরঙ্গীর স্রষ্টা, নগরজীবনের অনন্য কথক শংকর তাঁর জীবনসংগ্রাম, সাহিত্যভাবনা ও মানুষ দেখার দৃষ্টিকে অকপটে মেলে ধরেছিলেন এ আলাপে। সম্প্রতি তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেই পটভূমিতে এই সাক্ষাৎকার শুধু স্মৃতিচারণাই নয়, শংকরের মানসজগতের এক অন্তরঙ্গ দলিল।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ফুল না ফুটলেও বসন্তের আবাহন তখন। গাছে গাছে নতুন পাতা, সদ্যোজাত কুঁড়ি ফুটেছে। প্রায় তিন বছর পর কলকাতায় এলাম এবার। বিধাননগরে একটি সামাজিক মিলনোৎসব ও বারাসাতে ভালো লাগার একজন প্রকাশকের আমন্ত্রণে তাঁর বার্ষিক সম্মিলনে অংশগ্রহণ করি। ওই দুটি অনুষ্ঠান ছিল একই দিনে। আয়োজনগুলো ছিল গতানুগতিকের আলাদা আঙ্গিকে। এর মধ্যে একটি ছিল আনুষ্ঠানিক আর অন্যটি লেখক-প্রকাশক-সম্পাদকের আড্ডা। অভিভূত ও মুগ্ধতা লেগে ছিল এসব আয়োজনে। অনেক চেনা-অচেনা মানুষের ভালোবাসা-আলিঙ্গন এবং তাঁদের তালাশ আমাকে বিস্মিত করেছে।

গল্পটা এখানে শেষ হলে ভালো হতো। তবে শেষ যে হলো না, এর পেছনে রয়েছেন কথাসাহিত্যিক শংকর। এবার তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ভাবি। তাঁর পুরো নাম মণিশংকর। কিন্তু চৌরঙ্গী, আশা আকাঙ্ক্ষা, বিত্তবাসনাসহ বহু জনপ্রিয় উপন্যাসের স্রষ্টা পশ্চিমবঙ্গের এই লেখক। পাঠকের কাছে তিনি শংকর নামে পরিচিত।

নিজের পুরো নামটা ব্যবহারে দ্বিধা ছিল; কারণ, আইনজ্ঞের চেয়ারে বসে যাদের দেখবার সুযোগ পেয়েছি, তাদের পরিচয় জানাজানি হোক, তা অভিপ্রেত ছিল না।
শংকর

কথায়–কথায় বলছিলেন শংকর, ‘নিজের পুরো নামটা ব্যবহারে দ্বিধা ছিল; কারণ, আইনজ্ঞের চেয়ারে বসে যাদের দেখবার সুযোগ পেয়েছি, তাদের পরিচয় জানাজানি হোক, তা অভিপ্রেত ছিল না। পুরো নামটা চিরকালই পোশাকি নাম, বাড়িতে সবাই শংকর বলেই ডাকত, বারওয়েল সাহেব এই নামটা কর্মক্ষেত্রে চালু করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আর পুরো নামে ফিরে আসার সুবিধা হয়নি। দিল্লিতে একবার জিজ্ঞেস করল, মণিশংকর মুখার্জী কী করে শংকর হলো? আত্মরক্ষার জন্য উত্তর দিলাম, কলকাতার কাঁটামাছের বাজারে ল্যাজা-মুড়োর দাম অনেক, সবচেয়ে দামি জিনিসটাই আমি পাঠক-পাঠিকাদের দিতে চেয়েছি।’

এর আগে ২০১৪ সালে কলকাতায় গিয়েছি। ওই সময় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছি। দুই দিন লেগে থাকার পর আধঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন তিনি। স্বল্প সময়ের এ সাক্ষাৎকারে বেশ ঝাঁজ ছিল। পশ্চিমবঙ্গের যোধপুর পার্কে তাঁর বাসায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক ঘণ্টার বৈঠকি আলাপে কথা হয়েছে। কথা ছিল, আমাদের আলাপ হবে আধঘণ্টা, সেটি গিয়ে ঠেকল ঘণ্টার কাঁটায়। এ আলাপে তাঁর শৈশব, নকশাল আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, লাতিন আমেরিকার লেখা, হুমায়ূন আহমেদ, আধ্যাত্মিকতা, প্রেমসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা উঠে এসেছে। শীর্ষেন্দু সম্পাদিত প্রশ্নের মুখোমুখি বইয়ে সাক্ষাৎকারটি সংকলিত হয়েছে।

দুই

শংকরের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো সুযোগ ছিল না। খুব বেশি মানুষের সামনে আসেন না তিনি। তিনি যে কতটা ‘আত্মমগ্ন’ ও ‘আত্মনিভৃত’, বোঝা যায় তাঁর নিজের ভাষায়, ‘কেউ আমাকে টেনে না আনলে কিংবা ধাক্কা না দিলে আমি আসলে নড়ি না।’ কলকাতার অনুজ একজন শুভার্থীর কাছ থেকে শংকরের ফোন নম্বর নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি।

দিনটি ছিল ১ ফাল্গুন। আমাদের দেশে সে সময় ফাল্গুন বরণ করার জন্য নানা আয়োজন চলছে। প্রতিটি অলিগলিতে বাসন্তী সাজ। কলকাতায় তার ছিটেফোঁটা কিছুই পেলাম না।

শংকরদাকে ফোন করলাম। ভেবেছিলাম, তিনি অপরিচিত নম্বর রিসিভ করবেন না বা করলেও এড়িয়ে যাবেন। আগে তো কখনো তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়নি। তিনি আমাকে চেনেন না, জানেন না। আর এত বড় লেখক! এত জনপ্রিয় লেখক! ব্যস্ত মানুষও তিনি। না, আমার ভাবনাটা ঠিক ছিল না। তাঁর কোনো অহংকার পেলাম না। আমার পরিচয় শোনার পর মনে হলো তিনি কিছুটা আবেগতাড়িত হলেন। তাড়াতাড়ি যেতে বললেন আমাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়বেন। আমারও পরদিন ঢাকায় ফেরার তাড়া। হাতে সময় ভীষণ কম।

ভেবেছিলাম, তিনি ফোন রিসিভ করবেন না বা করলেও এড়িয়ে যাবেন। আগে তো কখনো তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়নি। তিনি আমাকে চেনেন না, জানেন না। আর এত বড় লেখক! এত জনপ্রিয় লেখক! ব্যস্ত মানুষও তিনি। না, আমার ভাবনাটা ঠিক ছিল না।

সফরসঙ্গীদের সঙ্গে সন্ধ্যাবেলায় সিনেমা দেখার কথা। ওখানকার একটি সিনেপ্লেক্সে টিকিটও কাটা হয়। ওটা বাদ দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে শংকরের দেওয়া ঠিকানা নিয়ে এগোতে থাকলাম। ঠিকানাটা সহজ। আমার আবাসস্থলের কাছেই। গন্ডগোলটা লাগল ওখানে, কলকাতার সবকিছুকে আত্মস্থ করতে পারিনি। ফলে ঠিকানা খুঁজে পেতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। এর মধ্যে তিনি বেশ কয়েকবার ফোন করেন। তিনি এদিকে নয় ওদিকে আসো বলে আমাকে ঠিকানা বোঝালেন। কিছুটা বিলম্বে বেশ বড়সড় অফিসে গিয়ে হাজির হই। সিকিউরিটি-রিসেপশনে আমার আসার কথা তিনি বলে রেখেছিলেন। তাঁরা আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন। ওটাকে যে চৌরঙ্গী মোড় বলে, তা জেনেছি অনেক পরে।

অনেকগুলো রুমের মধ্যে শংকরের রুম খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি। তিনি আমাকে দেখে বেশ উচ্ছ্বসিত হলেন। মুখের কোণে একচিলতে হাসি টেনে নিলেন। বিনয়ী-হাস্যোজ্জ্বল। ওই রুমে আরও কয়েকজন ছিলেন, সম্ভবত তাঁরা তাঁর অফিসের স্টাফ। তাঁদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথা বলে বিদায় দিচ্ছেন। আমি এই ফাঁকে তাঁর অনুমতি নিয়ে কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম।

অনেক কথা চলল। একের পর এক প্রশ্ন করলাম তাঁকে। বিরক্ত হলেন না। খুব সহজভাবে, বিনয়ের সঙ্গে তিনি প্রশ্নগুলোর উত্তর দিলেন। কোনো রাখঢাক ছিল না তাতে। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলার চালাকিও ছিল না তাঁর মধ্যে।

তিন

শংকর (৭ ডিসেম্বর ১৯৩৩—২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

শংকরের জীবনযুদ্ধ ও সাহিত্যজীবনের কথা কারও অজানা নেই নিশ্চয়। তাঁর একটি গুণ রয়েছে, সাধারণ মানুষের প্রতি অসীম সমবেদনা। সাফল্যের শিখরে উঠেও নিজের জীবনযুদ্ধের কথা ভুলে যাননি। অকপটে স্মরণ করেন তিনি।

শংকরের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর পথের পাঁচালীর দেশ বনগাঁওয়ে, তদানীন্তন যশোর জেলায়। বিভূতিভূষণও জন্মেছিলেন এখানে। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগেই চলে যান কলকাতার ওপারে হাওড়ায়। সেখানেই শংকরের বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা ও সাহিত্য সাধনার শুরু।

শংকর বলেন, ‘বাবার অকালমৃত্যুর পর সেই ১৪ বছর বয়স থেকে উপার্জনের সংগ্রামে নেমে পড়েছি, তারপর সারা জীবন দুনৌকায় পা দিয়ে জীবনসমুদ্রে ভেসে চলেছি।’ তাঁর বাবা একসময় বিডন স্ট্রিটের কোহিনূর থিয়েটারের জন্য নাটক লিখতেন। দাদু ক্ষীরোদ মুখোপাধ্যায় মার্চেন্ট অফিসে এক ইংরেজ সাহেবকে চড় মেরে চাকরি হারিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হন।

বাবার অকালমৃত্যুর পর সেই ১৪ বছর বয়স থেকে উপার্জনের সংগ্রামে নেমে পড়েছি, তারপর সারা জীবন দুনৌকায় পা দিয়ে জীবনসমুদ্রে ভেসে চলেছি।
শংকর

শংকেরর মা একদিন আড়ালে ডেকে বললেন, ‘তোমাকে উপার্জন করতে হবে।’ তখন তাঁর বয়স ১৫। সেই বয়সেই টুকটাক পার্টটাইম রোজগার শুরু করলেন। উকিলের ছেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে টুকটাক জিনিসপত্র বিক্রি করে, সেটা ভালো দেখায় না। তার পরের বছর লেখাপড়ায় ইস্তফা দিতে হলো তাঁকে। শিয়ালদহ সুরেন্দ্রনাথ কলেজে বেতন বাকি। ছোট্ট একটা অঘটন ঘটে যায় তখন। কলেজের সাহিত্য সভায় একটা রম্য রচনা কাম গল্প দুম করে শুনিয়ে দিলে ভাইস প্রিন্সিপালের নজরে পড়ে যান শংকর। তিনি সব দেনা-পাওনা মওকুফ করে দিয়ে আইএ পরীক্ষায় বসার পথ সুগম করে দিলেন।

অল্প বয়সে বাবার পেশার সূত্রে কলকাতার হাইকোর্টে করণিক হিসেবে চাকরি পান। জীবনের শুরুতে কখনো ফেরিওয়ালা, টাইপরাইটার ক্লিনার, কখনো টিউশনি, কখনো শিক্ষকতা অথবা জুট ব্রোকারের কনিষ্ঠ কেরানিগিরি করেছেন। বঙ্গবাসী নৈশ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি হাইকোর্টের ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েক ফ্রেডরিক বারওয়েল সাহেবের সঙ্গে যুক্ত হন।

চার

বারওয়েল সাহেবই শংকরকে সাহিত্য রচনায় অনুপ্রাণিত করেন। বারওয়েলের মৃত্যুতে তিনি কিছুটা শোকাচ্ছন্ন হন। তাঁকেই উৎসর্গ করলেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ কত অজানারে। শংকরের প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। অল্প বয়সে কত অজানারে বইটি লিখে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সেই থেকে শংকর লিখছেন।

পাঁচ

সেই শংকর চলে গেলেন। তাঁর প্রয়াণে যেন বাংলা উপন্যাসের এক পরিচিত শহর হঠাৎ আলোহীন হয়ে পড়ল। অথচ তিনি আমাদের যে শহর, যে মানুষ, যে জীবন দেখিয়েছেন, তা কোনো দিন নিভে যাবে না। তাই তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়তো একটু ফিরে দেখা—শংকর আমাদের জীবনকে কীভাবে দেখতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর লেখায় কলকাতা কখনো ঝলমলে, কখনো নির্মম। তবু সব সময় জীবন্ত।

এই জীবন্ত শহরের প্রথম বড় চেহারা আমরা দেখি তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাস কত অজানারে-তে। এক সাধারণ যুবকের চাকরির অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তিনি যে অফিস-জীবনের জগৎ তুলে ধরেছেন, তা শুধু গল্প নয়, এক প্রজন্মের বাস্তবতা। বড় দালান, বড় সাহেব, ছোট কর্মচারী—এই শ্রেণিবিন্যাসের ভেতরে কীভাবে মানুষ তার আত্মসম্মান বাঁচিয়ে রাখে, কীভাবে অপমান গিলে নিয়ে পরদিন আবার কাজে যায়, শংকর তা দেখিয়েছেন একেবারে ভেতর থেকে।

তার গল্পে নায়ক কোনো বীরপুরুষ নয়, সে আমাদের মতোই দ্বিধাগ্রস্ত, স্বপ্নবান, কখনো ভীত, কখনো আশাবাদী। শংকর প্রমাণ করেছেন, সাহিত্যের নায়ক মানেই অসাধারণ কেউ নয়, অতি সাধারণ মানুষও উপন্যাসের কেন্দ্র হতে পারে।

কত অজানারে লেখার সময় সবচেয়ে অবহেলা পেয়েছেন বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের দু-একজন সহকর্মীর কাছ থেকে, তাঁরা পাণ্ডুলিপি পড়ে বলেছিলেন, কিসসু হয়নি। সবচেয়ে সাহায্য করেছিলেন শঙ্করীপপ্রসাদ বসু। আর বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ ও সাগরময় ঘোষ। অন্নদাশঙ্কর রায়কে শান্তিনিকেতনে কত অজানারে পাঠিয়েছিলেন তিনি। অন্নদাশঙ্কর তাতে লিখে দেন, ‘আপনার জীবনের প্রথম সাফল্যটি যেন জীবনের শেষ সাফল্য না হয়।’

শংকরের প্রকাশিত গ্রন্থ শতাধিক। কত অজানারে, চৌরঙ্গী ছাড়া রয়েছে নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি, মানচিত্র, পাত্রপাত্রী, রূপতাপস, এক দুই তিন, যোগ-বিয়োগ গুণ-ভাগ, নগরনন্দিনী, বিত্তবাসনা, মরুভূমি, কামনা বাসনা, ঘরের মধ্যে ঘর, সম্রাট ও সুন্দরী, পটভূমি, সীমান্ত সংবাদ, বাংলার মেয়ে, মুক্তির স্বাদ, সোনার সংসার, চরণ ছুঁয়ে যাই, জন অরণ্য, আশা আকাঙ্ক্ষা, যেখানে যেমন ইত্যাদি। আরও অনেক বই লিখেছেন, এগুলোর মধ্যে ভ্রমণরসসিক্ত কয়েকটি রচনাও রয়েছে।

পাঠকেরা যেমন ঢেলে দিয়েছেন, সমালোচকেরাও তেমনই ঢেলে আক্রমণ করে গেছেন। মানুষ বলে কেউ মনে করেনি। কোনো পুরস্কার দেয়নি। ভুল বললাম, একটা পুরস্কার চৌরঙ্গী পেয়েছিল। শ্রেষ্ঠ বাইন্ডিংয়ের জন্য।
শংকর

শংকরের কয়েকটি বই চলচ্চিত্রেও রূপ পেয়েছে। বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর সীমাবদ্ধজন অরণ্য উপন্যাসের কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁর চৌরঙ্গী উপন্যাস অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এতে মুখ্য চরিত্র স্যাটা বোসের ভূমিকায় উত্তমকুমার অভিনয় করেছিলেন। সে প্রসঙ্গে শংকর বললেন, ‘সত্যজিৎই আমাকে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওরা বলে, এসপ্ল্যানেড। আমরা বলি, চৌরঙ্গী। সেই চৌরঙ্গীরই কার্জন পার্ক। সারা দিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত শরীরটা যখন নড়তে চাইছিল না, তখনই ওইখানেই আশ্রয় মিলল। ইতিহাসের মহামান্য কার্জন সাহেব বাংলাদেশের অনেক অভিশাপ কুড়িয়েছিলেন। সুজলা-সুফলা এই দেশটাকে দুভাগ করার বুদ্ধি যেদিন তাঁর মাথায় এসেছিল, আমাদের দুর্ভাগ্যের ইতিহাস নাকি সেই দিন শুরু হয়েছিল।’

শংকরের সঙ্গে তাঁর কর্মস্থলে

চৌরঙ্গী বই প্রকাশের প্রথম দিন থেকেই শক্তিমানদের নাক-উঁচু কান্না। শংকরের ভাষায়, ‘প্রথম দিন থেকেই সমালোচনা, যে রেস্টুরেন্ট আর রেস্তোরাঁর তফাত বোঝে না, সে লিখেছে হোটেল নিয়ে বই! এক নামী লেখিকা দেশ সম্পাদককে চিঠি পাঠালেন অশিক্ষিতের উপন্যাস অভিযোগ করে। বললেন, “যে লোকটা ব্রেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্টের সঙ্গে বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্টকে গুলিয়ে ফেলতে পারে, সে লিখেছে হোটেল নিয়ে বই।” পাঠকেরা যেমন ঢেলে দিয়েছেন, সমালোচকেরাও তেমনই ঢেলে আক্রমণ করে গেছেন। মানুষ বলে কেউ মনে করেনি। কোনো পুরস্কার দেয়নি। ভুল বললাম, একটা পুরস্কার চৌরঙ্গী পেয়েছিল। শ্রেষ্ঠ বাইন্ডিংয়ের জন্য।’

২০২২ সালে পেরিয়ে গেছে চৌরঙ্গী উপন্যাসের ৬০ বছর। যে উপন্যাস অনূদিত হয়েছে হিন্দি, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, রুশ, জাপানিজ, চায়নিজ ভাষাতেও। ‘স্যাটা বোস’-এর আকর্ষণ কিন্তু কমেনি। কে তিনি, সেই প্রশ্নও হারায়নি। কিন্তু বাস্তবে এই নামে আদৌ কি কেউ ছিলেন? শংকরের কথায়, ‘১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল। ওই সময়ে আমি দুই “স্যাটা বোস”কে চিনতাম। প্রথম জন ইস্টার্ন রেলওয়ের পদস্থ কর্মী। অবসরের পরে দাস কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কথায়–কথায় আলাপ। তখনকার দিনের গড়পড়তা বাঙালির মতো ছিলেন না। সাহেবি কেতার মানুষ। সব সময় টিপটপ থাকতেন। স্কাউটও করতেন। তিনি নিজের নাম নিজেই ছেঁটে “স্যাটা বোস” হয়েছিলেন!’

শংকরের দ্বিতীয় ‘স্যাটা বোস’ স্পেনসেস হোটেলের এক কর্মী। শংকর প্রথম জীবনে যাঁর অধীনে চাকরি করতেন, সেই ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল স্পেনসেস হোটেলে থাকতেন। কর্মসূত্রে সেখানেও শংকরের অবাধ যাওয়া-আসা। ‘স্যাটা বোস’ নামে পরিচিত সেই ভদ্রলোকও রীতিমতো সাহেব। এই দুই ব্যক্তিকে এক ছাঁচে ঢেলেছিলেন শংকর। যদিও তাঁর দাবি, প্রকৃত ‘স্যাটা বোস’ ওই প্রথম ব্যক্তি, সত্যচরণ বোস।

উত্তমকুমার কি ‘স্যাটা বোস’ হতে পেরেছিলেন? এ প্রশ্নে শংকরের জবাব, ‘আমি আর উত্তমবাবু পাশাপাশি বসে ছবিটা দেখেছিলাম। শেষ হতেই ওর প্রশ্ন, “কেমন দেখলেন? ঠিকমতো ফোটাতে পেরেছি?” সেদিন তৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলাম, আপনার অভিনয় আমার লেখাকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। আপনার হাতে পড়ে আমার “স্যাটা বোস” জীবন্ত!’

তার গল্পে নায়ক কোনো বীরপুরুষ নয়, সে আমাদের মতোই দ্বিধাগ্রস্ত, স্বপ্নবান, কখনো ভীত, কখনো আশাবাদী। শংকর প্রমাণ করেছেন, সাহিত্যের নায়ক মানেই অসাধারণ কেউ নয়, অতি সাধারণ মানুষও উপন্যাসের কেন্দ্র হতে পারে।

বোধোদয় উপন্যাস প্রকাশের পর শংকরকে উৎসাহ-বাণী পাঠান শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘ব্রাইট বোল্ড বেপরোয়া।’ ভাবনা বা প্রকাশভঙ্গিতে এ উপন্যাস নিজের অন্য লেখালেখি থেকে অনেকটাই অন্য রকম হওয়ায় তখন তা পড়তে দিয়েছিলেন মুম্বাইবাসী শরদিন্দুকে, পড়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমার এই লেখায় জননী-জন্মভূমিকেই আমি সারাক্ষণ উপলব্ধি করলাম।’ এই বই সম্পর্কে শংকর বলেন, ‘পাঠকমহলের নিন্দা ও প্রশংসার ডালি নিয়ে আমি নিজেও একসময় বোধোদয়–কে ভালোবাসতে শুরু করেছি।’ সত্তরের দশকের অশান্ত কলকাতা নিয়ে তাঁর বোধোদয়, স্থানীয় সংবাদসুবর্ণ সুযোগ—এই তিনটি উপন্যাস মিলিয়ে তাঁর যে উপন্যাস-সংগ্রহ জন্মভূমি, প্রকাশিত হলো এর ১০২তম সংস্করণ।

স্মরণীয় উপন্যাস নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি রচনার পেছনে কোনো কাহিনি আছে? এমন প্রশ্নে শংকর বলেন, ‘সে এক মস্ত গল্প! বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানকে সিরিয়াস স্থান দেওয়া যায়, এই বাজি ধরে লেখা। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে টানা তিন দিনের সাধনায় মহাভারত থেকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে গল্পটা পাওয়া গেল, তা একসময় বলা যেতে পারে। সাহিত্যের অবলম্বন হলো বাঁশের ভারার মতোন, বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে ভারা খুলে ফেলতে হয়, এই উপন্যাসেও মহাভারতকে সরিয়ে দেওয়া গিয়েছে সসম্মানে।’

ছয়

সংবাদপত্রের নামীদামি লোকেরা নাক বেঁকিয়েছেন, উকিলের মুহুরি সে আবার কী লিখবে? বহুপঠিত হতে পেরেছি, এই অপরাধে বেশ কিছু শাস্তিও জুটেছে।
শংকর

শংকরের জীবন–অভিজ্ঞতা বিপুল। ছোট-বড় নানা অবস্থা ও অবস্থানে তিনি ছিলেন, নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছে। সেসব অভিজ্ঞতার রসরূপ তাঁর কথাসাহিত্যে। কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি তাঁকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানাই। তিনি বললেন, ‘আমি বাংলাদেশে আসতে চাই। আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু আমি যেতে পারি না। আমার শরীরের কারণে যেতে পারি না। আমার ইচ্ছা আছে যাওয়ার। দেখা যাক কী হয়!’

লেখকজীবনের কিছু আক্ষেপ আছে কি না, জানতে চাইলে শংকর বললেন, ‘মানুষমাত্রেই আক্ষেপ থাকে। সংবাদপত্রের নামীদামি লোকেরা নাক বেঁকিয়েছেন, উকিলের মুহুরি সে আবার কী লিখবে? বহুপঠিত হতে পেরেছি, এই অপরাধে বেশ কিছু শাস্তিও জুটেছে। যা সবাই বুঝতে পারে এবং বুঝে আনন্দ পায়, তা নাকি সাহিত্য পদবাচ্য নয়। কখনো শুনেছি, আগের বইটা ভালো লিখেছে, এখন যা লিখছে তা অপাঠ্য। হেডমাস্টার মশায় বলতেন, সবার কথা মন দিয়ে শুনবে, কিন্তু নিজে যা ভালো বুঝবে, শেষ পর্যন্ত তা–ই করবে। ইদানীং আক্ষেপটা ভীষণ কমে গিয়েছে। মনে হয়েছে, সমকাল যেমন সোহাগ করে, তেমন অবজ্ঞা কিংবা শাসনও করতে পারে। যে সহ্য করতে পারে না, তার জন্য তো লেখার লাইন নয়। যারা প্রকাশ্যে চিৎকার করে, আমার অমুক জিনিস পাওনা ছিল পেলাম না, তারা বোধ করি বোকামি করে। মা বলতেন, নিজে যা পাওনি, তা আগে অপরকে দেবে।’

শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য এক মহিরুহ হারাল। কিন্তু তিনি যে জীবনদর্শন রেখে গেলেন—মানুষকে কাছ থেকে দেখা, ক্ষমতার আড়াল সরিয়ে ফেলা, সাধারণ মানুষের সংগ্রামকে মর্যাদা দেওয়া, তা দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে।